২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বর্তমান সংসদ পুতুল নাচের নাট্যশালা ॥ টিআইবি


সংসদ রিপোর্টার ॥ দশম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ অধিবেশনে শুধু কোরাম সঙ্কটেই অপচয় হয়েছে ৩২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ওই সময়ে প্রতিদিনই গড়ে ২৬ মিনিট কোরাম সঙ্কট হয়েছে। পার্লামেন্ট ওয়াচ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে এ তথ্য জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রবিবার দুপুরে রাজধানীর ধানম-ির মাইডাস সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সংসদের কার্যক্রমে হতাশা প্রকাশ করে বলা হয়Ñ বর্তমান সংসদ পুতুল নাচের নাট্যশালায় পরিণত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দশম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ এই পাঁচটি অধিবেশনের ১১২ কার্যদিবসে কোরাম সঙ্কট ছিল ৪৮ ঘণ্টা ৪১ মিনিট। সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করতে প্রতিমিনিটে গড় ব্যয় ১ লাখ ১১ হাজার টাকা। অর্থাৎ কোরাম সঙ্কটে ৩২ কোটি ৪২ লাখ ৩১ হাজার টাকা অপচয় হয়েছে। এ সময়ে সরকার ও বিরোধী দল তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি স্পীকারও শক্তিশালী ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।

প্রতিবেদন উত্থাপন করেন টিআইবির রিসার্চ এ্যান্ড পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ফাতেমা আফরোজ ও মোরশেদা আক্তার। এ সময় টিআইবির উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার জুলিয়েট রোজেটি উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে সংসদীয় গণতন্ত্র সুদৃঢ় এবং সংসদকে কার্যকর ও জবাবদিহিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়Ñ অসংসদীয় আচরণ এবং ভাষার ব্যবহার বন্ধে স্পীকারকে অধিকতর শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিরোধী দলকে বিতর্কিত অবস্থান পরিহার করে প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হবে। জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনার জন্য বেশি সময় বরাদ্দ করতে হবে। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় এমপিদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। সংসদীয় কমিটির সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয়টি পুরোপুরিভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সবকিছু দেখে মনে হয়, বর্তমান সংসদ যেন পুতুল নাচের একটি রঙ্গশালা। তিনি বলেন, সার্বিকভাবে সংসদের কার্যক্রমে আমরা হতাশ। সংসদে সরকারী ও বিরোধী দলের উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়। সংসদীয় আচরণ থেকে ব্যাপক বিচ্যুতি ঘটছে। তিনি আরও বলেন, বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত তথাকথিত বিরোধী দলের কার্যকর কোন ভূমিকা নেই। মূলত ক্ষমতাসীন দলের একছত্র ভুবন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সংসদ। নিয়ম রক্ষার্থে এ সংসদ চলছে। তাই বিতর্ক এড়াতে নতুন নির্বাচন প্রয়োজন।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দশম সংসদের ৫টি অধিবেশনে আইন পাসের জন্য বিলপ্রতি ব্যয়িত গড় সময় ও প্রতি কার্যদিবসের সদস্যদের গড় উপস্থিতির হার তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি ও গড় কোরাম সঙ্কট হ্রাস পাওয়ার মতো কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ প্রধান বিরোধী দলের প্রত্যাশিত জোরাল ভূমিকার ঘাটতি; সংসদের বাইরের রাজনৈতিক জোট নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক সমালোচনা ও অশালীন ভাষার প্রাধান্য, অসংসদীয় আচরণ ও ভাষার ব্যবহার বন্ধে স্পীকারের শক্তিশালী ভূমিকার অনুপস্থিতি, বিধান থাকলেও আন্তর্জাতিক চুক্তি বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠিত না হওয়া, আইন প্রণয়ন, প্রশ্নোত্তর ও জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিসের আলোচনায় সদস্যদের কম অংশগ্রহণ, কমিটির সদস্যদের ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতাসহ স্বার্থের দ্বন্দ্ব, সংসদীয় কার্যক্রমে তথ্যের উন্মুক্ততা ও অভিগম্যতার ঘাটতিÑ ইত্যাদি কারণে সংসদ প্রত্যাশিত পর্যায়ে কার্যকর হয়নি।

আরও বলা হয়, পর্যবেক্ষণাধীন অধিবেশনগুলোতে সংসদীয় আলোচনার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সরকারী দল ও ‘প্রধান বিরোধী দল’ সম্মিলিতভাবে একই সুরে সংসদের বাইরে রাজনৈতিক দলের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। সরকারের মন্ত্রিসভার অংশবিশেষ এই কথিত ‘প্রধান বিরোধী দলের’ সরকারের লেজুড়বৃত্তি ছিল পরিষ্কার। তদুপরি সরকারী দলের পক্ষ থেকেও এই লেজুড়বৃত্তিকে বিভিন্নভাবে দশম সংসদের ইতিবাচক অর্জন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। তবে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন ইস্যুতে জোরাল ভূমিকা রেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকার ও বিরোধী দলকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একটি দল বা জোট যাদের সংসদে উপস্থিতি নেই, তাদের নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। প্রতিপক্ষের সমালোচনা আগের সংসদের চেয়ে ১২ গুণ বেড়েছে। এটা কারও কাম্য নয়। সংসদে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে বিরোধী দল কতটুকু বিরোধী, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সংসদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন কার্যবলীতে এমপিদের অংশগ্রহণ হতাশাজনক। ৩৫০ জন এমপির মধ্যে মাত্র ২৯ জন সদস্য আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। হয়ত এমপিদের আইন প্রণয়ন কার্যাবলী সম্পর্কিত আলোচনায় অংশ নেয়ার যোগ্যতা বা দক্ষতা নেই বা মানসিকতা নেই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিতর্কিত নির্বাচনের দায় এড়াতে গেলে নতুন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রয়োজন। তবে এটা কখন কিভাবে হবে, সেটা রাজনীতির দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সিদ্ধান্তের বিষয়।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: