ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

নারী ফুটবলে চোখ এখন এশিয়ায়

নাসরিন সুলতানা

প্রকাশিত: ০০:২৭, ৩ এপ্রিল ২০২৪

নারী ফুটবলে চোখ এখন এশিয়ায়

সেরা অর্জন সিনিয়র সাফ চ্যাম্পিয়ন নারী ফুটবলারদের ঢাকায় ছাদখোলা বাসে বরণ

কথায় আছে সময় যখন ভালো হয়, তখন সবকিছু নিখুঁত হয়ে যায়। এ হিসেবে সময় এখন বাংলাদেশ নারী ফুটবলের। সবকিছু এগিয়ে যাচ্ছে দারুণভাবে। সঠিক পরিকল্পনার কারণে একে একে ধরা হিচ্ছে সব সাফল্য। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে যে কোনো পর্যায়ে মাঠে নামা মানেই শিরোপা বাংলাদেশের। গত ফেব্রুয়ারি ও চলতি মার্চে ব্যাক টু ব্যাক চ্যাম্পিয়ন তাই প্রমাণ করে। দেশের মাটিতে অনূর্ধ্ব-১৯ ট্রফি জয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই মার্চে নেপালে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৬ আসরের শিরোপা জিতে মহাদেশীয় অঞ্চলের ফুটবলে বাংলাদেশ নারী দল পেঁছে গেছে অনন্য উচ্চতায়।

জাতীয় দল থেকে বয়সভিত্তিক, যে কোনো লড়াইয়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ ভারত নারী দল। মেয়েদের ফুটবলের প্রায় পঞ্চাশ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করা ভারত এখন আর পাত্তা পায় না বাংলাদেশের কাছে। এমনকি ভালো অবস্থানে থাকা নেপালের মেয়েরাও পিছিয়ে পড়েছে লাল-সবুজের দেশের তুলনায়। 
২০২২ সালে মর্যদার ছয় জাতির সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা দল গ্রুপ ম্যাচে ভারতকে ৩-০ গোলে পরাজিত করে। সেমিফাইনালে ভুটানকে হারায় ৮-০ গোলে। আর ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার সেরা আসনে অধিষ্ঠিত হন সাবিনা-সানজিদা-কৃষ্ণারা। বাংলাদেশের এই দলটির কাছে গ্রুপ ম্যাচে পাত্তা পায়নি পাকিস্তান ও মালদ্বীপের মেয়েরাও। যদিও অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলটিকে পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতা, আলোচনা ও ঝুট ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়েছে।  

টাকার কারণে অলিম্পিক বাছাই খেলতে না পাঠানো, ইনজুরি সমস্যা, সর্বোপরি মান-অভিমানে দেশ সেরা ডিফেন্ডার আঁখি খাতুন, তারকা স্ট্রাইকার সিরাত জাহান স্বপ্নসহ আরও দুই একজনের দলত্যাগ এবং সফল কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন দায়িত্ব ছাড়লে একটা শঙ্কার সৃষ্টি হয়। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, সাফ চ্যাম্পিয়ন এই দলটা হয়তো আর টিকবে না। কিন্তু সব জটিলতা, আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে সেই আগের মতোই পরিণত, শানিত দল হয়ে চমক সৃষ্টি করছে ময়দানি লড়াইয়ে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের মেয়েরা দুই ম্যাচে সিরিজে সিঙ্গাপুর জাতীয় নারী দলকে রীতিমতো নাকাল করে ঘরের মাঠে। ফিফা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের প্রথম দেখায় ৩-০ ও পরের ম্যাচে ৮-০ গোলে জয়ী হয় বাংলাদেশ দল। তার আগে কমলপুরের এই ভেন্যুতে মালয়েশিয়ার মেয়োরা পরাস্ত হয় ৬-০ গোলে। যদিও পরের ম্যাচটি কোনোক্রমে গোলশূন্য ড্র করতে সক্ষম হয়েছিল তারা। উল্লেখ্য, নারী ফুটবলে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর দুদলই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। 
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের করুন পরিণতি দেখার পর বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলের বিপক্ষে এখন আর খেলতে চায় না আশপাশের কোনো দেশ। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচ দুটির পর সিরিজ বাতিল করে সৌদি আরব ও ফিলিস্তিন। সৌদি ফুটবল ফেডারেশন সরাসরি জানিয়ে দেয় বাংলাদেশে অনেক শক্তিশালী দল। এমন দলের বিরুদ্ধে ফিফা আন্তর্জাতিক সিরিজ খেলা তাদের পক্ষে সম্ভব না। একই সুর ফিলিস্তিনের।

চলতি বছরের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা সিনিয়র নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। এবারের আয়োজক বাংলাদেশ। শিরোপা সাফল্য অক্ষুণœ রাখার লক্ষ্যে নিবিড় অনুশীলনে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলের ফুটবলাররা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে বিদেশী দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের। জানা গেছে বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে চিঠি চালাচালি চলছে।

তবে সাফ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জাতীয় নারী দলের মিয়ানমার সফর চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের রাজনৈতিক জটিলতার কারণে নারী ফুটবল দলকে মিয়ানমার সফর না করার পরামর্শ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মিয়ানমার জাতীয় নারী দলের বিপক্ষে দুটি ফিফা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা ছিল সাবিনাদের। আমাদের দলটি আগের চেয়ে এখন আরও পরিণত ও শক্তিশালী। বাবু বলেন, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি হিসেবে মিয়ানমারের বিপক্ষে ম্যাচ দুটি আমাদের দলের জন্য বিরাট উপকার হতো।

আত্মবিশ্বাস বাড়তো আমাদের মেয়েদের। এখন মিয়ানমারের বিকল্প চিন্তা করতে হবে। তার কথায়, পুরনো কয়েকজন খেলোয়াড় দল থেকে বাদ পড়া বা চলে যাওয়ায় নতুন যারা যোগ হয়েছে তারা বেশ মেধাবী, পরিশ্রমী ও কুশলী। বয়সে কিছুটা জুনিয়র হলেও সিনিয়রদের সঙ্গে ইতোমধ্যে বেশ মানিয়ে নিয়েছে তারা। সর্বশেষ সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ঘরের মাঠে সে প্রমাণ আমরা পেয়েছি। 
উল্লেখ্য, বয়স ভিত্তিক থেকে জাতীয় দল মেয়েদের ঈর্ষণীয় সব সাফল্যের সঙ্গী আমিরুল ইসলাম বাবু। এতে ম্যানেজার হিসেবে নিজেকে সফল ভাবতেই পারেন তিনি। পুরুষ ফুটবলেও বাবু একজন ভাগ্যবান, সফল ম্যানেজার। ঢাকায় ২০০৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় দল সাফ শিরোপা জয় করে। দলের ম্যানেজার ছিলেন তিনি। নেপালের কাঠমান্ডুতে সাউথ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ যুব দল স্বর্ণপদক জয় করে।

এই দলটিরও তিনি ছিলেন ম্যানেজার। ঘরোয়া ফুটবলে ঐতিহ্যবাহী মোহামেডানের হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের ম্যানেজার তিনি। এতো সাফল্যের সঙ্গী আমিরুল ইসলাম বাবু জানালেন, তার কাছে সব অর্জনই সমান আনন্দের। তবে পুরুষ ও নারী জাতীয় দলের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা একটু বাড়তি গৌরবের। এ দুটি সাফল্যকে তিনি একটু উচুঁতে রাখতে চান।
বাবুর  কথায়, কাজি সালাউদ্দিন সব সময় একটা লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে থাকেন। তার প্রথম টার্গেটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সেরা মঞ্চে আরোহণ। সে আশা আমরা পূরণ করতে পেরেছি। এখন দেশের নারী ফুটবলকে তিনি এশিয়ান লেবেলে দেখতে চান। সাফের মতো বয়স ভিত্তিক থেকেই আমরা এশিয়ান লেবেলে পৌঁছাতে চাই। এই লক্ষ্য সামনে রেখে তৈরি করা হচ্ছে মেয়েদের। তিনি বলেন, মেয়েদের মধ্যে এখন জয়ের নেশা কাজ করছে।

বিশেষ করে জুনিয়রদের মধ্যে। উত্তরাধীকার সূত্রে তারা এটা পেয়েছে। সিনিয়রদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা ভয় পায় না কোনো প্রতিপক্ষকে। ভালো খেলতে হবে, জিততে হবে, শিরোপা নিয়ে দেশে ফিরতে হবে। এই মন্ত্রবলেই তারা বিজয় কেতন উড়াচ্ছে ফুটবলের ময়দানে। আমি মনে করি অগ্রজরা সাফল্য না পেলে এই মানসিকতা তাদের মধ্যে তৈরি হতো না। সবাই মাঠে নামে একটা লক্ষ্য নিয়ে, ধাপে ধাপে উঠতে হবে উপরে। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে  জায়গা করে নিতে হবে জাতীয় দলে।

মেয়েদের মধ্যে ফাইটিং স্পিরিট আছে বলেই প্রায় নতুন দল নিয়ে আমরা ব্যাক টু শিরোপা জয় করেছি সদ্য সমাপ্ত অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। ঢাকায় ও নেপালে অনুষ্ঠিত এই দুই আসর থেকে আমরা সাগরিকা, সুরভী ও ইয়ারজানের মতো কুশলী খেলোয়াড় পেয়েছি, যারা আগামীতে মূল জাতীয় দলকে সার্ভিস দিতে পারবে বেশ ভালোভাবে, অস্থার প্রতীক হিসেবে। বাফুফে নারী ফুটবল উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণের মতে, দেশের নারী ফুটবল আজকের এই পর্যায়ে উঠে আসার পেছনে খেলোয়াড়দের পরিশ্রমের পাশাপাশি মাঠের বাইরে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

সারা বছর ক্যাম্পে মেয়েদের থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা, কাপড়-চোপড়, বেতন-ভাতাসহ আনুসঙ্গিক খরচেন পেছনে প্রচুর অর্থ প্রয়োজন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন আর্থিকভাবে ততোটা সচ্ছল নয়। তারপরও নানাভাবে মেয়েদের প্রয়োজনীয় সব চাহিদা আমরা পূরণ করে যাচ্ছি। আর এটা সম্ভব হচ্ছে কাজি সালাউদ্দিন ফেডারেশনের সভাপতি থাকায়। তিনি সভাপতি না থাকলে দেশের নারী ফুটবল এই পর্যায়ে আনা সম্ভব হতো না। সালাউদ্দিন যে কোনো প্রয়োজনে সব সময় আমাদের সহযোগিতা করেন।

স্পন্সর বা নিজেরে পকেট থেকে, যে কোনো উপায়ে তিনি টাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। ফলে সবচেয়ে বড় কৃতিত্বটা আমি বাফুফে সভাপতিকে দিতে চাই। কিরন বলেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে একটা আশা, স্বপ্ন নিয়ে এই মেয়েদের পেছনে শ্রম দিয়ে যাচ্ছি। সামনে আমার  লক্ষ্য হচ্ছে অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা। এ লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি সবার সম্মিলিত চেষ্টায় সফল হতে পারব।

সর্বোপরি মেয়েদের এই সাফল্যের পেছনে একজন নানুর অবদানের কথা না বললেই নয়। তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ্যভাবে একটু বেশি খোঁজ-খবর রাখেন দেশের নারী ফুটবলের। শিরোপা জিতলেই সংবর্ধনা, মাথায় হাত বুলিয়ে অনুপ্রাণিত করা এবং আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি দরিদ্র খেলোয়াড়দের নির্মাণ ঘর-বাড়ি তৈরি করে দিয়ে দারুণভাবে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এটাও সাফল্যের অন্যতম একটা কারণ। নারী ফুটবলারদের সাফল্যে অন্ধকার, প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ, নদী, খাল-বিলের ওপর নির্মিত হয়েছে সেতু।

মেয়েদের এবস আবদারও মিটিয়ে দিচ্ছেন এই ক্রীড়াপ্রেমী নানু। কে এই নানু তা সবারই জানা। কলকাতার বিখ্যাত ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের হয়ে ভারতীয় লিগ খেলার সময় সুদর্শনা চৌকশ ফরোয়ার্ড সানজিদ আক্তারকে সেদেশের একাধিক মিডিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। কলকাতার এক টিভি চ্যানেলে নারী ফুটবলের ক্রমবর্ধমান উন্নতির পেছনে বাংলাদেশ সরকার কি ধরনের ভূমিকা রাখছে সোনজিদাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ক্রীড়াবান্ধব  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের অনুপ্রেরণা।

২০১২ সালে আমরা প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম সাফ অনূধ্ব-১৪ ফুটবলে। নেপাল থেকে দেশে ফেরার তিনি অর্থ পুরস্কারসহ আমাদের সংবর্ধনা দিয়েছিলেন তিনি। আমরা তাকে ম্যাডাম বলে ডেকেছিলাম। তখন তিনি বলেছিলেন, ম্যাডাম না, তোরা আমাকে নানু বলে ডাকবি। তখন থেকে আমরা প্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে নানু বলে ডাকি। আমরা খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগত বা এলাকাভিত্তিক যে কোনো সমস্যার কথা বললে নানু সহযোগিতা করেন। এই আন্তরিকতা আমাদের জন্য বিরাট অনুপ্রেরণা।
প্রসঙ্গত দেশের নারী ফুটবলের পাইপলাইন বেশ মজবুত। ফলে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া এখন খুবই কঠিন। অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় বেরিয়ে আসছে প্রতি বছর। বিদেশের মাটিতে ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে ফুটবলে আগ্রহী হয়ে উঠছে মেয়েরা। সব মিলিয়ে সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ দেশের নারী ফুটবল একদিন এশিয়ার সেরা মঞ্চ ও বিশ্বকাপে খেলার জায়গা করে নেবে এ প্রত্যাশা সবার।

×