ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

অধিনায়ক শান্তর রেকর্ডময় সেঞ্চুরি

মো. মামুন রশীদ

প্রকাশিত: ০০:৫৬, ১ ডিসেম্বর ২০২৩

অধিনায়ক শান্তর রেকর্ডময় সেঞ্চুরি

শূন্যে লাফিয়ে সেঞ্চুরি উদ্যাপন করছেন নাজমুল হোসেন শান্ত

সংখ্যাটা অপয়া, দেশের ১৩তম টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তবে অধিনায়ক হিসেবে সেই সংখ্যাটাকেই পয়মন্ত করেছেন এ বাঁহাতি। নেতৃত্বের শুরুটা করেছেন তিনি এবার সফরকারী নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে। আর এই নেতৃত্বের অভিষেকটা রাঙিয়েছেন তিনি সেঞ্চুরিতে। টেস্ট ইতিহাসে ৩৫১ জন অধিনায়ক সেঞ্চুরি করেছেন। এই ৩৫১ অধিনায়ক সবমিলিয়ে ৬৯৯টি সেঞ্চুরি করেছেন টেস্টে। কিন্তু টেস্ট নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচেই শতক পেয়েছেন মাত্র ৩২ জন। তার মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশী শান্ত। বাংলাদেশের আগের ১২ জন টেস্ট অধিনায়ক নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচে শতক হাঁকাতে পারেননি।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চলমান টেস্টের তৃতীয় দিন গুরুত্বপূর্ণ এই শতক হাঁকিয়েছেন তিনি। সর্বশেষ ৪ ইনিংসের তিনটিতেই সেঞ্চুরি হাঁকানোর কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এ বাঁহাতি ওয়ানডাউন ব্যাটার। মাত্র ৪৬ ইনিংসে ব্যাট করে ক্যারিয়ারের ৫ নম্বর শতক পেয়েছেন শান্ত। বাংলাদেশের আর কোনো ব্যাটার এত কম ইনিংস খেলে ৫ সেঞ্চুরি করতে পারেননি। ১৯৩ বলে ১০ চারে ১০৪ রানে অপরাজিত আছেন এখনো শান্ত। উইলিয়ামসনকে দেখেই হয়তো শিক্ষাটা নিয়েছেন শান্ত। প্রথম ইনিংসে অত্যন্ত তাড়াহুড়া করে ব্যাট চালিয়েছেন তিনি। আর তাই ৩৫ বলে ২ চার, ৩ ছক্কায় ৩৭ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেছেন। দ্রুত ব্যাট চালাতে গিয়েই ইনিংসটাকে বড় করতে পারেননি।

কিন্তু অভিজ্ঞ উইলিয়ামসন ছিলেন স্পিন সহায়ক উইকেটে রান করতে সংগ্রামের মধ্যে থাকলেও ধৈর্যের দারুণ প্রতিমূর্তি ছিলেন। ৪ ঘণ্টা ৪৯ মিনিট ক্রিজে থেকে ২০৫ বল খেলে মাত্র ১১ চারে ১০৪ রান করেন তিনি। যদিও সেই ইনিংসটাকে ‘চাঁদে কলঙ্ক’ থাকার মতো ৩ বার আউট থেকে বেঁচে যাওয়ার ঘটনা ছিল। কিন্তু শান্ত একেবারেই নিñিদ্র ইনিংস খেলেছেন। ৭ রানে পিছিয়ে থেকে বাংলাদেশ দল ইনিংস শুরুর পর মাত্র ২৩ রানেই ওপেনিং জুটি ভেঙে যায়। এরপর ক্রিজে আসা শান্ত দলীয় ২৬ রানেই দেখেছেন আরেক ওপেনারের বিদায়। প্রথম ইনিংসে ৮৬ রানের দুর্দান্ত রান করা মাহমুদুল হাসান জয়ও ১৭ করেই বিদায় নেন রানআউট হয়ে। এরপর শান্ত ও অভিজ্ঞ মুমিনুল হক সৌরভ জুটি বাঁধেন। দুজন দেখেশুনে সুস্থির হয়েছেন উইকেটে। আর ধীরে ধীরে দলের অবস্থানটাকেও ভালো করেছেন।

দ্রুতই দুটি উইকেট যাওয়ার কারণে একেবারেই ভিন্ন মনোভাব নিয়ে ব্যাট চালিয়েছেন শান্ত। আক্রমণাত্মক মানসিকতার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি তার মধ্যে। তাই ৯৫ বলে করেছেন ফিফটি। অপরদিকে মুমিনুলও ফিফটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ২ উইকেটে ১১১ রান নিয়ে চা বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু বিরতির পর প্রথম ইনিংসের মতো এদিনও মুমিনুল ফিফটি পাননি। তিনি ৪৬৮ বলে ৪ বাউন্ডারিতে ৪০ করে অহেতুক দৌড়ে রান আউট হয়েছেন। 

তৃতীয় উইকেটে ৯০ রানের জুটি হয়েছে শান্ত ও মুমিনুলের মধ্যে। এরপর শান্তর সঙ্গে যোগ দেন আরেক অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম। তারা দুজন নিউজিল্যান্ডের বোলারদের হতাশ করেছেন। দিনের শেষভাগ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন থেকেছেন তারা। তৃতীয় দিনের শেষ সেশনে এসেছে ১ উইকেটে ১০১ রান। কিন্তু চতুর্থ উইকেট জুটিতে ৯৬ রান যোগ হয়েছে কোনো বিপদ ছাড়াই। কারণ শান্ত ও মুশফিক দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছেন। ফলে ২ শতাধিক রানের বেশি লিড পেয়েছে বাংলাদেশ। এবার সেটিকে আরও বড় করার সুযোগ। শান্ত ক্যারিয়ারের পঞ্চম সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত ১৯৩ বলে ১০ চারে ১০৪ রানে অপরাজিত থাকেন। দারুণ একটি ধৈর্যশীল ইনিংস খেলে শান্ত দলকেও ভালো অবস্থানে নিয়ে গেছেন। তৃতীয় দিনশেষে তাই বাংলাদেশ এগিয়ে আছে ২০৫ রানের বড় ব্যবধানে।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ যে টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ গত জুনে, সেই ম্যাচের উভয় ইনিংসে সেঞ্চুরি করেন শান্ত। কিউইদের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৩৭ রানেই সাজঘরে ফিরেছেন। তারপর আবার পেলেন সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্বের প্রথম টেস্টেই সেঞ্চুরি পেয়ে রেকর্ড গড়েছেন শান্ত। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গ্রানাডায় সাকিব আল হাসান অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচে করেছিলেন অপরাজিত ৯৬। সেটাই এতদিন ছিল বাংলাদেশী কোনো অধিনায়কের নেতৃত্বের অভিষেকে সেরা ইনিংস। অবশ্য টেস্ট ইতিহাসে অধিনায়কত্ব করার প্রথম ম্যাচেই শতক হাঁকিয়েছেন আরো ৩১ জন। সে তালিকায় ৩২ নম্বর শান্ত। অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরি হাঁকানো প্রথম ক্রিকেটার ছিলেন উইলিয়াম মারডক।

১৮৮০ সালে কেনিংটন ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার এ অধিনায়ক নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচে নেমে দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫৩ রানে অপরাজিত থাকেন। ৩৫১ জন অধিনায়ক টেস্টে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। শান্ত সর্বশেষজন। এই ৩৫১ অধিনায়কের কাছ থেকে মোট ৬৯৯টি সেঞ্চুরি এসেছে। শান্ত অবশ্য ৫ শতক পেয়েছেন টেস্টে, সেটিও মাত্র ৪৬ ইনিংসে। তিনি ছুঁয়েছেন সাকিব ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে। সাকিব ৬৬ টেস্টে ও মাহমুদুল্লাহ ৫০ টেস্টে করেছেন ৫ সেঞ্চুরি। শান্তর খুব কাছেই আছেন মোহাম্মদ আশরাফুল, তিনি ৬১ টেস্টে করেছেন ৬ সেঞ্চুরি। শান্ত হয়তো তাকেও পেছনে ফেলবেন অচিরেই।

×