ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০২ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

বিজয় দিবস-উদ্যাপন হোক অনুভবে

নাহিদা আশরাফী

প্রকাশিত: ০১:২৩, ১৬ ডিসেম্বর ২০২২

বিজয় দিবস-উদ্যাপন হোক অনুভবে

এই আত্মাশ্রয়ী গান শুধু মার্চ ডিসেম্বর কিংবা আগস্টের নয়

‘আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা
কারোর দানে পাওয়া নয়
আমি দাম দিছি প্রাণ লক্ষ-কোটি
জানা আছে জগৎময়’
এই আত্মাশ্রয়ী গান শুধু মার্চ ডিসেম্বর কিংবা আগস্টের নয়। এমন গান যেহেতু হৃদয়তন্ত্রীতে এক শক্তি ও সাহসের সুর হয়ে বাজে সেহেতু এর আবেদন প্রতিদিনের, প্রতি সময়ের।
মহান বিজয় দিবস ২০২২ উদযাপন উপলক্ষে ইতোমধ্যে জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। এই উদযাপনে শামিল হবে দেশের প্রতিটি মানুষ। আমাদের শৌর্যবীর্য এবং বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। শুধু আমাদেরই বা বলি কেন? পুরো বাঙালি জাতির কাছে আত্মপ্রকাশের এক অনন্য দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখ-ের নাম যুক্ত হওয়ার দিন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সাল থেকে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৬ তে ছয় দফা, ’৬৯ এ গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং একই মাসের ২৫ তারিখে গণহত্যা শুরু হলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অগণিত শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এমন অভিভূত করার মতো দৃশ্য, এমন রক্তস্নাত বিজয় এর আগে আসেনি। সেই বিজয় অবশ্যই উদযাপনের।
কিন্তু পাঁচ দশক পরে এসে একটা প্রশ্ন আমাদের সবার চোখেমুখে। স্বাধীনতা বা বিজয় আমরা কী শুধু উদযাপনেই সীমাবদ্ধ করে ফেলছি? শহীদের আত্মদানকে আমাদের চেতনার রঙে না রাঙিয়ে অপরিপক্ব উল্লাসে একটা উপলক্ষ করছি মাত্র! বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যাঁর ডাকে সর্বস্তরের মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন সেই মহানায়ক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা স্টেজ ও ব্যানারবন্দি করে ফেলছি কী?
পঞ্চাশ উত্তীর্ণ বাংলাদেশের কাছে এই প্রশ্ন করা যেতেই পারে। যে দ্বন্দ্ব বাংলাদেশপূর্ব সময়ে আমাদের হানা দিত সেই দ্বন্দ্ব আমরা কতটা মেটাতে পেরেছি তা ভাবার বিষয় বৈকি। দ্বন্দ্ব দূর তো হয়নি শুধু দ্বিধায় পরিণত হয়েছে। এই দ্বিধা ঝেড়ে ফেলতে আমাদের কত সময় লাগবে আমরা জানি না। ঐক্যবদ্ধ থেকে ঐক্য মুছে গেলে শুধু বন্ধতাই থাকে। এতদিনে এ বোধ যদি আমাদের জাগ্রত না হয়ে থাকে তাহলে কালের করাল গ্রাসে আমাদের তলিয়ে যেতেই হবে।
ইচ্ছে ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য চাই একাগ্রতা, নিষ্ঠা এবং সময়। প্রথম দুটি ব্যক্তির নিজস্ব হলেও সময় কারও হাতে বন্দি থাকে না। সে চলে তার নিজ গতিতে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি, দল কিংবা সংগঠনকে সেই স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যেতে বাঁধা দেওয়া উচিত নয়। তাহলে সেই স্বপ্নের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পূর্বাপর সব সময়কেও অবমূল্যায়ন করা হয়।

সময় এই অবহেলা মেনে নেয় না। আর স্রেফ এ কারণেই স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে আমাদের উন্নয়ন অনেকটা গণিতের সেই বানরের মতো হয়ে গেছে। এক হাত এগিয়ে দুই হাত পেছাই। মনোজগতের বিপুল পরিবর্তন ছাড়া এই বানরের হাত থেকে আমাদের মুক্তি নেই।
প্রতিবছর দেশে সাক্ষরতার হার বাড়ছে। আমরা শিক্ষিত হচ্ছি। সত্যিই কী এই কাগুজে শিক্ষিত অনেক ছেলেমেয়েদের আমি প্রশ্ন করেছিলাম, আমাদের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস কিংবা শোক দিবস কত তারিখ এবং কোন তারিখে কী কী হয়েছিল। প্রচুর ভুলভাল উত্তর পেয়ে এতটাই হতাশ হয়েছি যে এখন আর কাউকে জিজ্ঞেস করতেই ভয় পাই।
অবাধ আকাশ সংস্কৃতি আর তথ্য প্রযুক্তির জোয়ার আমাদের ভেতর থেকে মানবিক মূল্যবোধকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের মানবিক বিকাশ গঠনে বাবা-মায়ের ভূমিকাই সর্বোচ্চ বলে মনে করি। পারিবারিক শিক্ষায় নৈতিকতা, পরমত সহিষ্ণুতা, আদর্শিক প্রণোদনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনাসহ আরও বিবিধ মানবিক অনুষঙ্গের যতœ নিতে হবে। পরিবারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত- একজন বিবেকবান ও দেশপ্রেমিক সন্তান, কখনোই নীতিহীন মানুষ তৈরি করা নয়। তবে পরিবারের ভূমিকা সর্বোচ্চ মানেই তো এই নয় যে- সমাজ বা রাষ্ট্র হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। উপযুক্ত নাগরিক গঠনে তাদের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না।
১৯৭১ সালের এই দিনে আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছি। লক্ষ্য করলে দেখবেন এই নয় মাস বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধ করেছে এদেশের বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ এমনকি অক্ষর জ্ঞানহীন মানুষ পর্যন্ত। এই নিরক্ষর মানুষের কাছে কাগুজে সার্টিফিকেট ছিল না কিন্তু হৃদয় ভরা দেশপ্রেম ছিল, নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল, একতা ও সৌহার্দ্য ছিল। আর এসব ছিল বলেই এক বিশাল অস্ত্রধারী পিচাশ বাহিনীর বিরুদ্ধে কী অসীম মনোবল নিয়ে তারা লড়াই করে গেছে।

নিজের জীবন দিয়ে সহযোদ্ধাকে বাঁচাতে তাদের এতটুকু দ্বিধা হয়নি। আর এখন? সন্তান বাবা-মাকে ফেলে যাচ্ছে, বস্তুগত বিষয় নিয়ে ভাই ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করছে। আমাদের যেন কারও দিকে ফিরে তাকাবার অবকাশ নেই। আমরা আমাদের স্বার্থচিন্তায় এতটাই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছি যে পাশে তাকিয়ে দেখার সময় পাচ্ছি না। কিন্তু আমরা জানি না এতটা ছুটে পরিবার, সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা কোথায় পৌঁছাতে চাই। সেখানে আমরা কতটা নিঃসঙ্গ! আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও একই শিক্ষা দিচ্ছি। এই বিচ্ছিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের সন্তানদের একা করে দিচ্ছে।
আমাদের এত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, এত শিক্ষার হার, এত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পরও সভা সেমিনার করে সভ্য মানুষ তৈরির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে মাইকে গলা ফাটানো হচ্ছে। অথচ আমরা প্রাণহীন এক রোবটের মতো জীবনযাপন করছি। যতক্ষণ না আমার শরীর থেকে মাংস কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ততক্ষণ আমরা উহু শব্দটি করছি না। রাষ্ট্রযন্ত্র, ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সমতাভিত্তিক সমাজ, বাক স্বাধীনতা, আইনের শাসন এসব যখন ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহৃত হয় তখন বুঝতে হবে সমাজ বা রাষ্ট্রের মেরুদ- আর সোজা নেই। আর ঠিক এসব কারণেই আমাদের দেশপ্রেম একটা দিনের উদযাপনে এসে ঠেকেছে।
আমাদের পূর্বসূরিরা লড়াই করে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল, পুরো জাতি অভিন্ন এক লক্ষ্য নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সম্মুখ সমরে পরাজিত করে, নিজের জীবনের বিনিময়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, একটি পতাকা ও মানচিত্র এনেছিল। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তারা রেখে যেতে চেয়েছিলো এমন এক গণতান্ত্রিক পরিবেশ যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে।

আমাদের সামাজিক বন্ধন অটুট থাকবে, আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও চেতনায় সুস্পষ্ট রূপরেখা বজায় থাকবে, আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে সর্বোপরি আমাদের মৌলিক চাহিদা ও অধিকারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে। সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। গঠিত হবে অসাম্প্রদায়িক ও সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।

আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে আমাদের হাতেই। বিজয়ের তাৎপর্য যতদিন না অন্তরে ধারণ করতে পারব ততদিন আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঠেকানো যাবে না। হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হবে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সেই উদ্দীপিত মুখ, সেই আত্মত্যাগ। যেদিন এই আত্মোপলব্ধি তৈরি হবে সেদিন হয়তো হৃদয়ের গহীন থেকেই ভেসে আসবে এই গান-

‘মা গো ভাবনা কেন
আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে
তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি
তোমার ভয় নেই মা আমরা
প্রতিবাদ করতে জানি।

×