ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

শেখ মুজিব স্বাধীনতা শেখ হাসিনা উন্নয়ন

ডা. কামরুল হাসান খান

প্রকাশিত: ২১:০৬, ২২ জুন ২০২৪

শেখ মুজিব স্বাধীনতা শেখ হাসিনা উন্নয়ন

শেখ মুজিব স্বাধীনতা শেখ হাসিনা উন্নয়ন

আওয়ামী লীগ অনেক চড়াই-উতরাই, সংগ্রাম, সংকট, সফলতা, বাধা-বিপত্তি, ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে ৭৫ বছর পূর্ণ করেছে। এই ৭৫ বছরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দলের কঠিন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অনেকে দল ছেড়ে চলেও গেছেন। কিন্তু যে মানুষটি শত কঠিন সময়ে দলটি আঁকড়ে ধরে রেখেছেন এবং বাঙালির মুক্তি, গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়েছেন এবং দলের মেরুদ- হিসেবে থেকেছেন, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠার ঊষালগ্নে জেলে থেকেই একমাত্র যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। সাহসী, ত্যাগী, লক্ষ্যে অবিচল, দক্ষ সংগঠক শেখ মুজিব অল্পদিনেই কর্মীদের প্রিয় মুজিব ভাই হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন দলের নিয়ামক শক্তি। 
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধিকার আন্দোলন রূপান্তরিত হয় স্বাধীনতা আন্দোলনে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃতে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী এক মহান মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে বাঙালি পায় স্বাধীন বাংলাদেশ, যার নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড় করান বাংলাদেশকে। সামনের দিকে এগোতে থাকে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক-অবকাঠামোগত সকল ক্ষেত্রে। ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতাবিরোধী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ইতিহাসের নৃশংসতম অধ্যায় সৃষ্টি করে। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে পাকিস্তানি রাজনীতির  তিন উপাদান- সামরিক ক্যু- হত্যা ষড়যন্ত্র, ধর্মের অপব্যবহার এবং অহেতুক ভারত বিদ্বেষ।

মুক্তিযুদ্ধের প্রাণের স্লোগান জয় বাংলা পাল্টে হলো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। ভূলুণ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বিকৃতি হতে থাকে গৌরবের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। শুরু হয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা-নির্যাতন, ঘরছাড়া এবং দল ভাঙার এক গভীর ষড়যন্ত্র। কর্মীরা দিশেহারা, পথহারা। কিছু নেতা ক্ষমতার সঙ্গে মিশে গেল। নেতৃবৃন্দ হিমশিম খাচ্ছে ভাঙন ঠেকাতে, নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে। এমন সময়ে ১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা শত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বুকের ভেতর কষ্ট-যন্ত্রণা নিয়ে পিতার হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন এবং বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে ব্যস্ত। কাউন্সিলে অনেক আলাপ-আলোচনার পর জাতীয় ও দলীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তাঁর একটি বার্তা সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক সম্মেলনে পাঠ করে শোনান।

শেখ হাসিনা তাঁর বার্তায়- সর্বপ্রকার দ্বন্দ্ব-বিভেদ ভুলে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে কাউন্সিলর ও নেতাদের বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। কাউন্সিলররা সেদিন এক ধরনের স্বস্তি, আশা এবং আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে, বুকের ভেতর কষ্টের পাথর বেঁধে তিনি পা রাখেন তারই ¯েœহময়ী প্রাণপ্রিয় পিতা-মাতা, ভাই-ভ্রাতৃবধূসহ নিকটাত্মীয়ের রক্তে ভেজা বাংলার মাটিতে, নিজের জীবনের স্বামী-সন্তানÑসংসারের অবশিষ্ট আশ্রয়টুকু পেছনে ফেলে- কেবল পিতার অবশিষ্ট কাজটুকু সম্পন্ন করতে।

সেদিন রাজধানী ঢাকা ছিল মিছিল আর স্লোগানের শহর। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মিছিল আর স্লোগান। ্ওইদিন কালবৈশাখী ঝড়ো হাওয়ার বেগ ছিল ৬৫ মাইল। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে লাখো লাখো মানুষ শেখ হাসিনাকে এক নজর দেখার জন্য রাস্তায় ছিল। বঙ্গবন্ধুর ‘বংশের প্রদীপ, ঐতিহ্যের ধারক ও স্মৃতির প্রতীক’ শেখ হাসিনাকে দেখার জন্য কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধ নির্বিশেষে অগণিত মানুষ বাস, ট্রাক, লঞ্চ, স্টিমার ও ট্রেনযোগে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকা এসে সমবেত হয়েছিল। লাখো জনতা অকৃপণ প্রাণঢালা অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে বরণ করে নেয় তাদের বঙ্গবন্ধুকন্যাকে। 
জনগণের ভোটে নির্বাচিত পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। ৪৩ বছর ধরে উপমহাদেশের অন্যতম, ঐতিহ্যবাহী, রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে তিনি কখনো দেশের প্রধানমন্ত্রী, কখনো বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং কখনো রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। যখন যে অবস্থায় থাকুন না কেন, দেশের এবং দেশের কল্যাণের কথাই ভেবেছেন, প্রয়োজনে বহুবার জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েছেন।

১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে বন্ধুর, কণ্টকাকীর্ণ পথ। হয়েছেন গৃহবন্দি, খেটেছেন জেল-জুলুম, সইতে হয়েছে নানা ধরনের নির্যাতন। জননেত্রীর লক্ষ্য, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তবায়ন, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে দলকে, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ঘুরে বেরিয়েছেন যুগ যুগ ধরে বাংলার পথে-প্রান্তরে। ১৯ বার তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরাধিকারী, স্বপ্ন বাস্তবায়নকারী শেখ হাসিনাকে, নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে, ’৭৫-এর ধারায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চিরতরে রুদ্ধ করতে। জননেত্রী শেখ হাসিনা এগিয়ে চলেছেন শত বাধা-বিপত্তি বাধা-বিঘœ অতিক্রম করে। শেখ হাসিনাই বিশ্বের একমাত্র নেতা, যিনি শত প্রতিকূলতার মধ্যে রাজনীতি করে চলেছেন। তাঁর সঙ্গে বিশ্বের অন্য কোনো নেতার তুলনা করা যায় না।

বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, উন্নত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য যা জাতির কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর পর্বত প্রমাণ প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে হতাশ, পর্যুদস্ত, বিক্ষিপ্ত, বিভক্ত দলকে ঐক্যবদ্ধ করে নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। বিশ্বের ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বারবার সংকটাপন্ন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আবহে, হাজার বছরের বাঙালি কৃষ্টি-সংস্কৃতির অবগাহনে ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশের প্রাণ। বাংলাদেশ আজকে বিশে^র বিস্ময়। বিশে^র দরবারে উন্নয়নের রোলমডেল। স্যাটেলাইট-১ এর উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আকাশ বিজয় করেছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আকাশ-সমুদ্র-সীমান্ত বিজয় করেছে। 
বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২৮২৪ ডলার। অর্থনৈতিক অনেক সূচকে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ধাপে ধাপে পূরণ  হয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ বা রূপকল্প ২০২১-এর সকল কর্মসূচি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগসহ সকল ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে জাজ্বল্যমান পরিবর্তন। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ যোগাযোগ ব্যবস্থায় দৃশ্যমান হয়েছে আমূল পরিবর্তন। শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে এবং বাংলাদেশ উন্নয়নের ধারার জন্য অর্জন করেছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এখন বিশে^র অন্যতম সেরা, সৎ, যোগ্য, কর্মঠ, মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক নেতা। 
৭৫ বছরের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাঙালি জাতির স্বাধীনতার ইতিহাস, অধিকার আদায়ের ইতিহাস, উন্নয়নের ইতিহাস। ৭৫ বছরের অধিকাংশ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর সুযোগ্যকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। এই নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁদের বিসর্জন দিতে হয়েছে ব্যক্তিগত জীবন, জীবনের সকল প্রকার সুখ-শান্তি। অন্যদিকে সইতে হয়েছে কারাবরণ, নির্যাতন, জীবনের হুমকি, লাঞ্ছনা, মোকাবিলা করতে হয়েছে জীবনের পরতে-পরতে ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবন দিয়ে বাঙালি জাতির ভালোবাসার ঋণ শোধ করে গেছেন। বাঙালি জাতি কোনোদিন জাতির পিতার ঋণ শোধ করতে পারবে না।
বর্তমানে গোটা বিশ্ব যুদ্ধবিগ্রহ, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বাংলাদেশও নানা জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে চলেছে। বাংলাদেশের সকল সংকট থেকে মুক্তি দিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ যখনই রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছে, তখনই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। পেয়েছে উন্নততর জীবন।

তাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৫ বছর অতিক্রম করার সময় সকল নেতাকর্মীর দায়িত্ব- অতীতের গৌরব, ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা অনুধাবন করে বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা। বিশ্ব সংকট মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ এবং দলকেও সেভাবে প্রস্তুত করা। যার ভিত্তি হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী, বলিষ্ঠ, বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক নেতৃত্ব।

লেখক : অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

×