ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

টরন্টোর চিঠি

দেশের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি

ড. শামীম আহমদে

প্রকাশিত: ২০:৫৬, ১১ জুন ২০২৪

দেশের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি

টরন্টোর বাংলাপাড়া খ্যাত

টরন্টোর বাংলাপাড়া খ্যাত ড্যানফোর্থ দিনকে দিন সাধারণ কানাডিয়ানদের যাতায়াতের অনুপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। গত ছয় মাসে একটা বড় সংখ্যার মানুষ বাংলাদেশ থেকে কানাডায় এসেছেন এবং তাদের অধিকাংশ রিফিউজি বা এসাইলাম স্ট্যাটাস দাবি করেছেন।

শুনতে পাচ্ছি যে কানাডা সরকার ইতোমধ্যে অধিকাংশের দাবি যে অযৌক্তিক এবং অনৈতিক সেটি নির্ধারণ করেছে এবং তাদের অনেককেই দেশে ফিরে যেতে বলা হতে পারে। কানাডায় এসে কেউ যদি রিফিউজি বা এসাইলাম দাবি করে থেকে যেতে পারে, তারা মাসে মাসে সরকার থেকে নির্ধারিত অঙ্কের একটা ভাতা পায়। পরিবার নিয়ে চলার জন্য সেটা যথেষ্ট না হলেও, একা অল্প বয়স্ক মানুষ সেটি দিয়ে চালিয়ে নিতে পারে।

এছাড়াও এখানে বাংলাদেশীদের ‘ক্যাশ টাকায়’ কাজ করার অনেক সুযোগ থাকে। কানাডা সরকারের নিয়ম অনুযায়ী অন্টারিও প্রোভিন্সে ঘণ্টায় কাজের বিনিময়ে কাউকে ১৫ ডলারের কম দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাংলাদেশী, চাইনিজসহ দক্ষিণ এশিয়ার নানা দোকানে ঘণ্টায় ৬-৭ ডলার দিয়ে অনেককে কাজে নেওয়া হয়। যেহেতু এদের অনেকের কাজের অনুমোদন নেই, ফলে তারাও এই অন্যায্য মুজরিতে কাজ করতে রাজি হয়ে যায়।

গত কয়েক মাস ধরে বাংলাটাউনে পরিবার নিয়ে যাওয়া-আসা কমিয়ে দিয়েছেন অনেক বাংলাদেশী কানাডিয়ান। বিকেল থেকেই শত শত মানুষ জটলা পাকিয়ে রাস্তা আটকে দোকানপাটের সামনে চা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতে থাকেন। কাউকে হাঁটাচলার সুযোগ পর্যন্ত দেন না। বিড়ি-সিগারেট ফুঁকতে থাকেন। তাদের ছুঁড়ে ফেলা বিড়ি-সিগারেটের বাট আর চায়ের কাপ-টিসুতে পুরো এলাকা নোংরা হয়ে গেছে।

কেউ কেউ ক্যাসেট প্লেয়ারে উচ্চৈঃস্বরে গান বাজিয়ে মদ্যপান করে থাকে। এই এলাকাটি যে বাংলাদেশী অধ্যুষিত সেটি অন্য জাতি-বর্ণের মানুষরাও জানে, ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে ব্যাপকভাবে। অর্থনীতি-সমাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম মেনে এক দেশের মানুষ অন্য দেশে আসবেন- এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কানাডার আশি শতাংশ মানুষই তো অভিবাসী।

শত শত বছর আগে তারা ইউরোপ থেকে এসে এখানে থেকে গেছে। এমনকি গত ১০ বছরেও লাখ লাখ মানুষ ইউক্রেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান থেকে এখানে এসেছে রিফিউজি আর এসাইলাম হিসেবে, কিন্তু তাদের আচার-আচরণ এখানকার সমাজে মিশে যেতে সাহায্য করেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশীরা নিজের দেশ থেকে যা শিখে আসে, তার সকল বাজে গুণাবলি এখানকার সমাজে প্রয়োগ করে এবং এখানকার সমাজের যা ভালো কিছু তার কোনোকিছুই গ্রহণ করার মানসিকতা তাদের মধ্যে দেখা যায় না।

আমাকে দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, গত দুই-তিন দশকে পয়েন্ট সিস্টেমে যারা কানাডা এসেছেন, তাদের মধ্যে যথেষ্ট মানবিক গুণাবলি দেখা গেছে। কিন্তু গত এক বছরে যারা এসেছেন, তারা কী দ্রুততার সঙ্গে টরন্টোর পরিবেশটাকে অনাবাসযোগ্য বানিয়ে ফেলছে, ভাবলেও কষ্ট হয়। দু’দিন আগে বাংলাটাউনের একটা দোকানের সামনে দেখলাম, তারা পোস্টার লাগিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে যে, এখানে রাস্তায় জটলা পাকিয়ে দাঁড়াবেন না।

আবার ঢাকা কাবাবের সামনে খোলা জায়গায় বেঞ্চিতে কয়েকজন বসার জায়গায় পা রেখে খাবার জায়গায় বসে ছিল দেখে রেস্তোরাঁর মালিককে বলতে হলো, এটা একটা কমার্শিয়াল স্পেস, মানুষ এখানে বসে খায়, আপনারা কোন্ বিবেচনায় এখানে পা রেখে বসে আছেন? নতুন আসা বাংলাদেশীদের নিয়ে অনেক সামাজিক সংগঠন এখানে কাজ করে, তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, নতুন আসা মানুষগুলোর মধ্যে ‘পরারপ ংবহংব’ দেওয়ার চেষ্টা করুন। নতুবা নিউইয়র্ক কিংবা লন্ডনের মতো খুব সহসা টরন্টোকেও আমরা ধ্বংস করে ফেলব!

একই প্রসঙ্গে একটু ভিন্ন আলাপ করা যাক। গত কয়েকদিন ধরে আইসিসি টি২০ ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপের আমেরিকা আর কানাডা দল নিয়ে ফেসবুক সরগরম। দল দুটি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে এবং আলোচনার মূল বিষয়Ñ এই দুটি দলে ভারতীয় উপমহাদেশের বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের আধিক্য। বিশেষত কানাডিয়ান দলের সকল খেলোয়াড়ই সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশের বংশোদ্ভূত।

তবে আলোচনাটি যেভাবে হচ্ছে সেটি এমন যে- কানাডিয়ান ক্রিকেট দলে একজন কানাডিয়ানও নেই। এটি নিয়ে বেশি হুলস্থুল করছে উপমহাদেশের মানুষই। এখানে মানুষের পড়হপবৎহ এর জায়গাটা বেশ বুঝতে পারছি, তারা যে জিনিসটিতে মজা পাচ্ছে, সেটি হচ্ছে কানাডিয়ান দলে কোনো ‘যিরঃব’ প্লেয়ার নেই। আপনি যদি বলেন যে, কানাডিয়ান দলে কোনো ‘হোয়াইট’ প্লেয়ার নেই, তাহলে সেই পর্যবেক্ষণ সঠিক পর্যবেক্ষণ।

কিন্তু আপনি যেই মুহূর্তে বলছেন কানাডিয়ান দলে কোনো কানাডিয়ান নেইÑ সেই মুহূর্তে আপনি আপনার বর্ণবাদী বা ৎধপরংঃ আচরণের বহির্প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। বর্তমান পৃথিবীতে সাদা মানুষকে সাদা, কালো মানুষকে কালো বলা জায়েজ। এতে তেমন কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সাদা না হলে একজন মানুষ কানাডিয়ান হতে পারবে না, এই যে ধ্যান-ধারণা এটি বর্ণবাদী ধারণা।

এটি যে কেবল সাধারণ জ্ঞান থেকে বলছি তা নয়, যেহেতু এই বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করেছি এবং এখন ছাত্রছাত্রী পড়াচ্ছি, তাই এই আলোচনাটি উত্থাপন করা জরুরি মনে করছি। 
আমরা যখন কানাডিয়ান পাসপোর্ট নেওয়ার পর নিজ দেশের ইমিগ্রেশন পার হই, তখন বিদেশী লাইনে দাঁড়াই। অতি গর্বের সঙ্গে কানাডিয়ান পাসপোর্সটি বাড়িয়ে দিই। যখন বিদেশে ঘুরতে যাই, ইউরোপে কেউ কথা প্রসঙ্গে আমাদের জিজ্ঞেস করে আমরা কোথা থেকে এসেছি, তখন আপাদমস্তক বাদামি কিংবা কালো বর্ণের চামড়া নিয়ে আমরা মাথা উঁচু করে ঘাড় নেড়ে উত্তর দিই- ‘আমি কানাডিয়ান, টরন্টো থেকে এসেছি।’

নিজের বেলায় কানাডিয়ান হতে আমাদের গায়ের রং, দুর্বল ইংরেজি, হাস্যকর উচ্চারণ, আকার-আকৃতি, আচরণ, শিক্ষা-দীক্ষা কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু কানাডার জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কেন কোনো সাদা খেলোয়াড় নেই- সেটি আমাদের কাছে বিরাট কৌতুকের বিষয়। ওই সময়ে আমাদের মনে থাকে না, নিজের দেশের সকল সহায়-সম্পত্তি বেচা-বিক্রি করে আমরাই বাদামি বর্ণ নিয়ে কানাডায় থিতু হয়েছি।

এই দেশের গত এক দশকে পাড়ি জমানো মানুষের অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষের গায়ের রং বাদামি বা কালো। এই কারণে কানাডাকে সারা পৃথিবী সম্মান করে যে, তারা পৃথিবীর নানাপ্রান্তের মানুষকে নিজেদের করে নিয়েছে। অথচ যে কারণে কানাডার এত খ্যাতি, সেই একই কারণে যাদেরকে এই কানাডা নিজের বলে আপন করে নিয়েছে, সেই তারাই তাকে নিয়ে ঠাট্টা মস্করা করে! 
একই কারণে বাদামি বর্ণের মানুষের দেশ ভারত-বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’ অর্থাৎ রং ফর্সা করার ক্রিম বিক্রি হয়। এখন নাম পাল্টেছে কিন্তু ঘটনা প্রায় একই আছে। সবচেয়ে বাদামি মানুষের দেশে ছেলের বউকে সবাই ফর্সা (সাদা) দেখতে চায়। কানাডা আসার পর যখন প্রথমবার দেশে যাই তখন যে কথাটি সবচেয়ে বেশি শুনতে হয়েছে সেটি হচ্ছে- ‘তুমি তো দেখি আগের চেয়ে কালো হয়ে গেছ, আগে কী সুন্দর ফর্সা ছিলা। কানাডায় গিয়ে কী লাভ হলো?’

অবাক হয়ে ভাবলাম- কানাডা সরকারের অন্যতম প্রধান মেধাবৃত্তি নিয়ে কানাডায় পড়তে এসেছিলাম, নাকি ফর্সা হতে? গত এক দশকে অনুধাবন করেছি, আমাদের অঞ্চলের মানুষও বর্ণবাদী। আমাদের ড্রাইভাররা বাসার দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, কাজের বুয়ারা মাটিতে বসে খায়, কেয়ারটেকারদের জন্য আলাদা মোড়া থাকে, অথচ আমরাই আবার পশ্চিমা দেশে আসলে ‘সংখ্যালঘু’ কার্ড পেয়ে সুবিধা নিতে চাই।

গত ফুটবল বিশ্বকাপে যখন ফ্রান্স ফাইনালে গেল তখন তাদেরও প্রায় একই ধরনের কথা শুনতে হয়েছে যে, ফ্রান্স ফুটবল দলে কোনো ফ্রেঞ্চ নেই। সব আফ্রিকান। অর্থাৎ তারা বলতে চেয়েছে, ফ্রান্সে এত কালো ফুটবলারÑ কোনো সাদা ফুটবলার নেই। জানি অনেকে হয়তো না জেনেবুঝেই এসব বলেছেন, কিন্তু যে মুহূর্ত থেকে আপনি বিষয়টি বুঝবেন, জানবেন- সেই মুহূর্ত থেকে অমন বর্ণবাদী আচরণ না করা আপনার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। 


১০ জুন ২০২৪

[email protected]

×