ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০৪ মে ২০২৪, ২০ বৈশাখ ১৪৩১

ন্যাটো কী যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ছাতা হয়েই থাকবে

রায়হান আহমেদ তপাদার

প্রকাশিত: ২০:৪৮, ২০ এপ্রিল ২০২৪

ন্যাটো কী যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ছাতা হয়েই থাকবে

ন্যাটো কী যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ছাতা

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন, যার সংক্ষিপ্ত নাম ন্যাটো। স্নায়ু যুদ্ধের শুরুর দিকে এ ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গঠনের উদ্দেশ্য ছিল সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সমন্বিত সুরক্ষা দেওয়া। ৭৪ বছর পরে এসে একটি পরিবর্তিত বিশ্ব যেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সুরক্ষার অগ্রাধিকারে রয়েছে, সেখানে কি এটি এখনো প্রাসঙ্গিক? সম্প্রতি ন্যাটোর ভেতরকার পরিস্থিতি আর আগের মতো নেই।

খোদ সংস্থাটি কিংবা এর সদস্যভুক্ত অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং তুরস্ক। দাপ্তরিকভাবে ন্যাটো গঠনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও কল্যাণ’ নিশ্চিত করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ‘স্বাধীনতা, অভিন্ন ঐতিহ্য এবং সভ্যতার’ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করা।
চুক্তি অনুযায়ী ন্যাটোভুক্ত যে কোনো দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটি জোটভুক্ত সব দেশের ওপর হামলা বলেই গণ্য হবে এবং সব দেশ একে অন্যের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। বাস্তব ক্ষেত্রে, জোটটি এটা নিশ্চিত করে যে, ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা অবিচ্ছেদ্যভাবে উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সাম্যবাদকে জোটটি তাদের বড় হুমকি মনে করত।

কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে নেটোর সীমান্ত মস্কোর দিকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার অগ্রসর হয়েছে। এছাড়া ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপে বিপ্লব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে জোটটি সাবেক সোভিয়েত স্যাটেলাইট জাতিকে নিজেদের সদস্য হিসেবেই গণ্য করে। স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি আর সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই- তার মানে এই নয় যে, পশ্চিমারা মস্কোকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করা বন্ধ করে দেবে।

কেউই হঠাৎ করে বিশ্বাস করেনি যে, কমিউনিজমের অনুপস্থিতি একটি দুশ্চিন্তামুক্ত পরিস্থিতি, একটি স্বর্ণযুগের সূচনা করেছে, যেখানে মিত্র শক্তিরা কোনো ধরনের সশস্ত্র বাহিনী ছাড়াই থাকবে বা সুরক্ষা ছাড়াই বসবাস করতে পারবেÑ ২০০৩ সালে দেওয়া এক ভাষণে জনপ্রিয় এই উক্তিটি করেছিলেন ন্যাটোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেমি শেয়া। বাস্তবে রাশিয়া সামরিকভাবে শক্তিশালী রয়ে যায়। আর যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর ১৯৯০ সালে খোদ ইউরোপেই যুদ্ধ দেখা দেয়।

এ ধরনের পরিস্থিতির কারণে ন্যাটোর ভূমিকা পরিবর্তিত হয়ে এটি হস্তক্ষেপকারী জোটে পরিণত হয়েছে। যার উদাহরণ মেলে বসনিয়া এবং কসোভোয় সার্বিয়ার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিমান হামলা, নৌপথে প্রতিরোধ এবং শান্তিরক্ষা বাহিনী হিসেবে ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে। ২০০১ সালে ন্যাটো প্রথম ইউরোপের বাইরে তাদের অভিযান চালায়। নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার পর আফগানিস্তানে জাতিসংঘের নির্দেশনায় যৌথ বাহিনীর কৌশলগত নেতৃত্ব নেয় ন্যাটো।

ন্যাটো হলো একটি সাধারণ কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান, যা থেকে সদস্যদেশগুলো সাধারণভাবে উপকৃত হয়। আর এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বও প্রকাশিত হতে থাকে। ট্রাম্পের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি ধারদেনা করে চলা দেশ। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যে সামরিক বাহিনীতে অনেক ব্যয় করি, সেই সামরিক বাহিনী আমাদের জন্য কাজে আসে না। আর যেসব দেশ প্রতিরক্ষা খাতে পয়সা দিতে চায় না, তাদের মধ্যে অনেক দেশ অত্যন্ত ধনী।’

আদতে যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ নাগরিক ন্যাটোকে সমর্থন করে থাকেন। তবে ট্রাম্পের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সেই সব নাগরিকের সঙ্গে মেলে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক দায়দায়িত্বকে তাদের নিজেদের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনৈতিক ভাগ্যের আলোকে দেখে থাকেন। তাদের মতো ট্রাম্পও মনে করেন, এসব সামরিক ব্যয় অহেতুক এবং এই ব্যয়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ঋণগ্রস্ত হচ্ছে ও সেই ঋণের বোঝা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের ঘাড়ে চাপছে।

অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন সামরিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের ঋণগ্রস্ত হওয়ার প্রাথমিক চালিকা শক্তি। যদিও তাদের হাতে তেমন কোনো প্রমাণ নেই এবং তারা এই ধরনের সামরিক ব্যয়ের বিপরীতে যে সুবিধাগুলো পাওয়া যায়, তা বুঝতে ক্রমাগত ব্যর্থ হচ্ছেন। নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) যুক্তরাষ্ট্রের পয়সায় চলে এবং সংস্থাটির বাকি সদস্যদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের খরচে প্রায় বিনামূল্যে সুবিধা নিয়ে থাকে- এমন একটি ধারণার অস্তিত্ব ন্যাটোর ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প আটলান্টিক মহাসাগরীয় মিত্রদের প্রতিরক্ষা খাতে অল্প পরিমাণ ব্যয় করার জন্য বারবার সমালোচনা করেছেন। তাদের প্রতি কটাক্ষ করেছেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, ইউরোপীয় মিত্রদের চাঁদা দেওয়া বাড়ানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শুধু যে ট্রাম্প কথা বলেছেন, তা নয়। এর আগে ডোয়াইট ডি.আইজেনহাওয়ার থেকে শুরু করে জন এফ কেনেডি, রিচার্ড নিক্সন, বারাক ওবামাসহ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয়দের ন্যাটোতে আরও বেশি আর্থিক অবদান রাখার জন্য চাপ দিয়েছিলেন।
জার্মানরা যদি প্রতিরক্ষা খরচ না বাড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে তার মোতায়েন করা সেনার সংখ্যা কমিয়ে ফেলতে পারে। প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট এস ম্যাকনামারা এমন হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি খরচের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে মার্কিন পণ্য কিনতে রাজি হয়।

কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ন্যাটোর বখাটে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে শায়েস্তা করতে বিদেশী হানাদারদের আমন্ত্রণ জানানোর মধ্য দিয়ে ন্যাটো মিত্রদের নিরাপত্তাকে সরাসরি বিপন্ন করেননি। ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক মন্তব্য খুবই বিভ্রান্তিকরভাবে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় লক্ষ্যমাত্রা এবং সরাসরি ন্যাটোকে অর্থ সরবরাহ করার বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নাগরিকের কাছে ট্রাম্পের এই উদ্বেগকে যৌক্তিক মনে হতে পারে।

তারা মনে করতেই পারেন, ভৌগোলিকভাবে প্রধান প্রধান সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে যে মুহূর্তে ন্যাটোর উপস্থিতি সরিয়ে আনা হচ্ছে, সে মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রকে কেন ন্যাটোর গড় মিত্রদের তুলনায় দ্বিগুণ চাঁদা গুনতে হবে? এই প্রশ্নের আংশিক জবাব হিসেবে বলা যায়, শুধু ন্যাটো কোথায় কতটুকু কাজ করছে, তার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বিশাল সামরিক ব্যয় অনুমোদন করে না। দিন দিন বড় বড় শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে নিজের অতুলনীয় সামরিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখার কৌশলগত উদ্দেশ্য থেকেও যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢেলে থাকে।

গ্রিসের মতো, যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থেই জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে ২০০টি ঘাঁটি সক্রিয় আছে, সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের খরচ যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক ব্যয়ের মাত্র ৪ শতাংশ। সত্যি কথা হচ্ছে, ন্যাটো হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার এমন একটি চিপ বা যন্ত্র যা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের যে কোনো জায়গায় হুমকি দেখা দিলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সহায়তা দেয়।
ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অগ্রবর্তী উপস্থিতি দেশটির সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে সংঘাত ও সামরিক চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা হ্রাস করে। এই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কটি মিত্রদেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সুবিধা দেয়, যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয় এবং এ সবের মাধ্যমে চীন ও রাশিয়ার মতো কৌশলগত প্রতিযোগীদের মোকাবিলা করার ক্ষমতা বাড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে সমর্থন করতে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এই শক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং সেটি তারা করেও। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, সোভিয়েত ইউনিয়ন তো নেই। তাহলে কেন ইউরোপে সেনা ঘাঁটি থাকবে। যে কোনো দেশে যদি অন্য দেশের সেনা ঘাঁটি থাকে, তাহলে কি তারা স্বাধীন থাকতে পারে? ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো কি আসলেই স্বাধীন? এই প্রশ্ন তো যৌক্তিক। তারা কেন নিজেরা নিজেদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না?

ইউরোপের দেশগুলো যখন এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে রাশিয়া-চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছে, তখনই যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হলো। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে ন্যাটো কিছুটা স্বস্তি ফেলছে বলে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে ন্যাটোর এই স্বস্তি কতদিন থাকে, তা দেখার বিষয়। বর্তমানে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষায় যুক্তরাজ্যের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে। তাহলে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কী হবে? ন্যাটোর উদ্বেগের একটি বড় বিষয় ভøাদিমির পুতিনের রাশিয়া।

এই প্রশ্নের সবচেয়ে ভালো উত্তর রয়েছে রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে। যতদিন রাশিয়ার আগ্রাসী মনোভাব থাকবে, ততদিন একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা এবং প্রতিরোধের জন্য ন্যাটোর দরকার হবে। কয়েক বছর আগে এনপিআর রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছিলেন ন্যাটোর সাবেক উপমহাসচিব আলেক্সান্ডার ভার্শবো। তাই তো মনে হয়, আরও অন্তত কয়েক দশক এমনকি আরও ৭৪ বছর ধরেও ন্যাটো টিকে থাকতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছাতা হয়ে। 

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবাসী গবেষক 

[email protected]

×