ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

বাংলা ভাষার উন্নয়নে খ্রিস্টান মিশনারি

জাস্টিন গোমেজ

প্রকাশিত: ২১:১২, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বাংলা ভাষার উন্নয়নে খ্রিস্টান মিশনারি

লর্ড ওয়েলেসলি

বাংলা ভাষা যে একটি বিবিধ রতন তা কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমাণ করে গিয়েছিলেন বহু বছর আগে। তারও অনেক আগে আমাদের এই বঙ্গে যখন খ্রিস্টান মিশনারিরা আসেন তারাও বাংলা ভাষার গুরুত্ব অনুভব করেছিলেন। তাদের বুঝতে বাকি ছিল না যে, ধর্ম প্রচারে এই ভাষা চর্চার বিকল্প নেই। লর্ড ওয়েলেসলি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (Fort William College) প্রতিষ্ঠা করেন। যার প্রধান ও মূল উদ্দেশ্য ছিল যারা ব্রিটিশ শাসক তাদের বাংলা ভাষা শেখানো।

বাংলা ভাষার বিবর্তনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা পরে বাঙালি সংস্কৃতি ও সাহিত্য সৃজনে অবদান রাখে। এক্ষেত্রে খ্রিস্টান মিশনারি ফাদার উইলিয়াম কেরির মতো স্বপ্নদর্শীদের ভূমিকা ভুলে যাওয়ার মতো নয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকেই ফাদার কেরির পরিচালনায় বাংলা ভাষার পরিমার্জিত লিখিত আকারের রূপ বের হয়। উইলিয়াম কেরি একজন ভিনদেশী খ্রিস্টান মিশনারি হয়েও বাংলা গদ্যপাঠ্য পুস্তকের প্রবর্তক ছিলেন।

১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগ চালু হলে তাকে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি অনুভব করেছিলেন এই ভাষা চর্চার জন্য ব্যাকরণের দরকার। তিনি ইংরেজিতে ‘এ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ (১৮০১) রচনা করেন। তার রচিত ‘কথোপকথন’ (১৮০১) বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ এবং বাংলা ভাষার কথ্যরীতির প্রথম নিদর্শন। উইলিয়াম কেরিকে বাংলা ভাষার গদ্য রচনার কিংবদন্তি বলা হয়ে থাকে। বাংলা ভাষার প্রতি তার যে প্রচুর ভালোবাসা ছিল তার অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়।

অবাক করার বিষয় হলো, কেরি তার বাংলা অনুবাদ, বাংলা ব্যাকরণ রচনা এবং বাংলা ভাষায় ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে উপমহাদেশে প্রথম বাংলা পত্রিকা ‘সমাচার দর্পণ’ ছাপিয়ে বাংলা ভাষাকে দিয়েছেন অনন্য মর্যাদা। কেরিই প্রথম বাংলা ভাষা রক্ষার মহতী আন্দোলন শুরু করেন। উইলিয়াম কেরি প্রথম এদেশে বাংলা ভাষায় শিক্ষা বিস্তার এবং মাতৃভাষা বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
উইলিয়াম কেরিকে যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয় তখন তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বাংলা ভাষা পাঠ্যক্রমে অবহেলিত। তাই বাংলা ভাষা শিক্ষাকে তখনকার হিন্দুস্তানি ও ফার্সির সঙ্গে সমানভাবে রাখার জন্য তিনি নিরলসভাবে সংগ্রাম করেছিলেন।

কেরির তত্ত্বাবধানে বাংলা ভাষায় বেশ কিছু অগ্রগামী লেখকের সৃষ্টি হয়। তারা হলেন- মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামরাম বসু, গোলোকনাথ শর্মা, তারিণীচরণ মিত্র, চ-ীচরণ মুন্সি, রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়, রামকিশোর তর্কচূড়ামণি, মোহনপ্রসাদ ঠাকুর, হরপ্রসাদ ঠাকুর প্রমুখ। সবাই উইলিয়াম কেরির তত্ত্বাবধানে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে নিযুক্ত ছিলেন। 
খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে এসে মিশনারিরা যে বঙ্গ ও বাংলা ভাষাকে ভালোবেসেছেন তার আর এক উদাহরণ হলেন ইতালীয় মিশনারি ফাদার মারিনো রিগন। বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশের এক বন্ধু তিনি। মারিনো রিগন এই দেশকে ভালোবেসে রপ্ত করেছিলেন বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গীতাঞ্জলি, কবি জসীমউদ্দীনের নকশীকাঁথার মাঠ, সুজন বাদিয়ার ঘাটসহ ৪৮টি কাব্যগ্রন্থ, বাউল সম্রাট লালন শাহর ৩৫০টি গান ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ ও সংকলন করে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন।

তিনি তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৭৩ সালে কবি জসীমউদ্দীনকে নিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে ২৮ বছর বয়সে ধর্ম প্রচার করতে ইতালি থেকে বাংলাদেশে আসেন ফাদার মারিনো রিগন।

এরপর বাগেরহাটের মোংলার শেহলাবুনিয়া গ্রামে থেকে তিনি এই এলাকার শিক্ষা বিস্তারে উদ্যোগ নেন। একে একে গড়ে তোলেন ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে তোলেন থাকার হোস্টেল। নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য গড়ে তোলেন সেলাই কেন্দ্র। 
বর্তমানে বিশ্বদরবারে বাংলা ভাষা যেভাবে তার স্বমহিমায় আসীন হয়ে আছে তা এমনি এমনি হয়নি। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত পার হয়ে এসেছে এই অবস্থায়।

ইতিহাসের দিকে তাকালে উপমহাদেশে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম ‘দিকদর্শন’ নাম নিয়ে শ্রীরামপুর থেকে মাসিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে শ্রীরামপুরেই সর্বপ্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশিত হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, উভয় সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল খ্রিস্টভক্তদের উদ্যোগে জেসি মার্শম্যানের সম্পাদনায়। এজন্য ১৮১১ খ্রিস্টাব্দে সংবাদপত্র ও প্রয়োজনীয় পুস্তকাদি ছাপার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে স্থাপিত হয় বাষ্পীয় ইঞ্জিনচালিত কাগজের কল। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অঙ্গে প্রাণ সঞ্চারণের সে প্রচেষ্টা তৎকালীন খ্রিস্টভক্তগণ ও মার্শম্যান আরম্ভ করেছিলেন ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে। 
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালোবেসে সেবায় ব্রতী হয়েছিলেন আরও অনেক খ্রিস্টভক্ত। হলিক্রস সম্প্রদায়ের (পবিত্র ক্রুশ সংঘ) ব্রাদার জেমস সিএসসি বিদেশী হয়েও ছিলেন একজন রবীন্দ্রভক্ত। তিনি ইংরেজিতে রবীন্দ্রনাথের বেশ কটি কবিতাগ্রন্থ ও ভক্তিমূলক গান অনুবাদ করেছেন। ফাদার মারচেল্লো ও ফাদার ওরলান্দো সরল প্রাঞ্জল বাংলায় পবিত্র গ্রন্থ বাইবেলের মথি, লুক ও মার্কের মঙ্গলসমাচার ব্যাখ্যা করেছেন।

আরও একজন বিদেশী মিশনারি ফাদার কার্লো ব্যাখ্যা করেছেন বাইবেলের সাধু যোহন রচিত সুসমাচার ও পত্রাবলি। বাংলা ভাষার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল অসীম। তাদের অবদান সময় ও যুগের ধুলায় মলিন হওয়ার মতো নয়। সবার কাছে আহ্বান, এই মহৎপ্রাণ মনীষীদের আমরা যেন সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারি। তারা বিদেশী হয়ে যদি আমাদের ভাষাকে ভালোবাসতে পারে তাদের সেই স্বীকৃতি দিতে উদার হতে হবে আমাদেরও। 
লেখক :  সাংবাদিক

[email protected]

×