ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

সর্বত্র চাই বাংলার ব্যবহার

মো. সাখাওয়াত হোসেন

প্রকাশিত: ২৩:৫৪, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সর্বত্র চাই বাংলার ব্যবহার

.

ভাষার মাসে ভাষাকে উপজীব্য করে আমরা নানাবিধ আয়োজন করে থাকি। এসব আয়োজনের ভাবার্থ অর্থবোধক অভিব্যক্তি নিয়ে যেন অনেকের মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মূল বিষয় হওয়া উচিত, আদৌ আমরা কি ভাষা শহীদদের সম্মান জানাতে অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকি? যদি ভাষা সংগ্রামীদের প্রতি সম্মান জানাতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তাহলে সাধুবাদ প্রদান করা উচিত। কিন্তু দেখা যায় রেওয়াজ হিসেবে আমরা অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকি, প্রকৃত বিষয়গুলো বেমালুম ভুলে যাই। ভাষার মাসে বিভিন্ন আয়োজনে বিদেশী গানের আয়োজন দেখা যায়। এটা কিভাবে আয়োজন হয়? বিশেষ করে ভাষার মাসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিদেশী ভাষার গান কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবার এমন একটি বিষয় দাঁড়িয়েছে যেখানে দেখা যায়, কথা বলা কিংবা লেখার সময় ইংরেজি ভাষা আমরা অবলীলায় ব্যবহার করছি। যারা ব্যবহার করছেন তাদেরকে দোষারোপ করারও কোনো সুযোগ নেই। কেননা, এমন একটি সমাজব্যবস্থায় আমরা উপনীত হয়েছি, যেখানে দেখা যায় কথা বলা কিংবা বাংলা লেখার সময় কিছুটা ইংরেজির আধিক্য না থাকলে তেমন গুরুত্ব পাওয়া যায় না। এটা মূলত আমাদের মধ্যে এক ধরনের দীনতা তৈরি করেছে। পাশাপাশি এক ধরনের মনোবৈকল্য অসুখও বলা চলে।

ভাষার মাসে আমাদের ধরনের চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। কেননা, মাসটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনার আবেগের। ভাষার মাসে মূলত আমাদের আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। সে আন্দোলন টানা রূপ পায় স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিসংগ্রামের বাস্তবতায় সংগ্রাম পরিপূর্ণতা লাভ করে। কাজেই ভাষার মাস আমাদের নানাভাবে উদ্বেলিত অনুপ্রাণিত এবং অনুপ্রেরণা প্রদান করে। ধরনের তাৎপর্যময় মাসে ভাষাকে বিকৃত করে উপস্থাপন কিংবা ভাষাকে খাটো করে উপস্থাপন কোনোভাবেই ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন হতে পারে না। উল্টো শহীদদের অবমাননা করা হয়। ভাষার মাসে বিপুল পরিসরে বাংলা একাডেমি কর্তৃক বইমেলা আয়োজিত হয়ে থাকে। বইমেলার পরিধি বাংলা একাডেমি থেকে অতিক্রম করে বড় পরিসরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জায়গা করে নিয়েছে। বিপুল সংখ্যক স্টল স্থাপিত হয়। বিপুল সংখ্যক জনতা প্রতিদিন বইমেলায় আসা-যাওয়া করে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলা ভাষাকে নিয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে বাংলা ভাষার উপজীব্য বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণ নিয়ে তেমন বই প্রকাশ হচ্ছে না। যে হারে মানুষ মেলায় প্রবেশ করছে, সেই হারে জনতা বই কিনছে না। বিষয়গুলো কিন্তু অত্যন্ত ভাবনাচিন্তার। কেননা, আন্দোলন করে, সংগ্রাম করে আত্মাহুতি দিয়ে ভাষার মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে একমাত্র বাঙালি জাতি বাংলা ভাষার জন্য। তার স্বীকৃতস্বরূপ প্রতিবছর বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়ে থাকে বিশ্বব্যাপী।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যেমন গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তেমনি নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। বইমেলাকে কেন্দ্র করে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন রকমের উত্তর সংগ্রহ করেছেন সংবাদকর্মীরা। বেশিরভাগ নেতিবাচক সংবাদই যোগাযোগ মাধ্যমে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে দেখা যায়, ইতিহাস নিয়ে দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলা ভাষা নিয়ে, ভাষা সংগ্রামী নিয়ে তাদের নিকট সঠিক তথ্য যেমন নেই, ঠিক তেমনি তাদের জানার আগ্রহও নেই। তাছাড়া পঠন-পাঠন কারিকুলামে বাংলা ভাষার ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমে যাচ্ছে। মুখস্থ করে নম্বর বেশি পাওয়ার একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায়। আবার যে সময়টাতে নিজস্ব চিন্তা চেতনা আবেগকে মূল্যায়ন করার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা, সেখানে দেখা যাচ্ছে ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। পাসের চিন্তায় বেশি নম্বর পাওয়ার প্রত্যাশা শিক্ষার্থীরা না বুঝেই ইংরেজি মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় তার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। আবার শিক্ষক সমাজ উচ্চ শিক্ষায় বিদেশী লেখকদের বই পাঠ্য বই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন। যে পুস্তকগুলো আমাদের শিক্ষার্থীদের নিকট দুর্বোধ্য কিংবা সহজভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয় শিক্ষার্থীরা। ভিন্নভাবে এই পুস্তকগুলো যদি অনুবাদের মাধ্যমে বাংলায় পুনর্লিখিত হতো, সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞান সহজলভ্য হতো। নিজ ভাষার প্রতি অপরিসীম দরদ উদারতার প্রতিচিত্রও লক্ষ্য করা যেত।

বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে পাঠদানের সময় বাংলা ব্যবহারে নির্দেশনা থাকলেও কতিপয় শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে পাঠদান করিয়ে থাকেন। একজন শিক্ষকের মূল কাজ শিক্ষার্থীকে একটি সুনির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা প্রদান করা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষায় একটি বিষয় যত সহজে অনুধাবন করতে পারবে, অন্য কোনো কেতাবি ভাষায় সেটি পারঙ্গম হওয়া দুঃসাধ্য। বিষয়টি বিজ্ঞ শিক্ষকদের অবশ্যই প্রতিপালন করা উচিত। আবার যে সকল শিক্ষকরা ইংরেজিতে পাঠদান করান, তারা বাংলায় পাঠদান করানো শিক্ষকদের নানাভাবে অবজ্ঞা করে থাকেন। ধরনের একটি সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে। যেটি বাংলা ভাষার বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি বাধা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। পরবর্তীতে দেখা যায়, ধরনের অবজ্ঞা থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে শিক্ষকরা ইংরেজিতে পাঠদানে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। সমৃদ্ধ ইতিহাসকে জানতে এবং জানাতে আমাদের মধ্যে দীনতা সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন থাকা সত্তে¡ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসকে বিভিন্ন বিভাগের কারিকুলামে এখনো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আপনি যদি নিজ দেশের ইতিহাস সঠিকভাবে জানতে ব্যর্থ হন, তাহলে দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি আপনার দায়িত্ব কেমন হতে পারে- সেটি আপনি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হবেন। বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার, ব্যবহারবিধি, ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস, ভাষা সংগ্রামীদের আত্মাহুতি প্রভৃতি বিষয় সম্বন্ধে পাঠ্যপুস্তকে বিস্তারিত উল্লেখ করতে হবে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্যেকটি জায়গায় বাংলা ভাষার বিশ্বব্যাপী গুরুত্বকে তুলে ধরে কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে। তাহলে ভাষার মাসের মর্যাদা অনুধাবন করতে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হবে। নিজ দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে ধারণ করতে সক্ষম হবে।

তবে অনেক ইতিবাচক দিকও দিনে দিনে উন্মোচিত হয়েছে। একটা সময়ে বিচারের রায় ইংরেজিতে লেখা হতো। যার অধিকাংশ বাদী-বিবাদী বুঝতে ব্যর্থ হতো। পর্যায়ক্রমে বিচারকগণ বাংলায় রায় লেখা শুরু করেছেন। আমাদের অন্য ভাষা শিক্ষার দরকার রয়েছে, তবে সেটি কখনো বাংলাকে অবজ্ঞা করে নয়। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। মায়ের ভাষা খাটো করে পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষাকে কোনোভাবেই অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের দরকার থাকার কথা নয়। তবে আমরা যে বিদেশী ভাষা শিখব না, সেটি নয়। বিদেশী ভাষার প্রতিও আমাদের সম্মান থাকবে। তবে সেটি কোনোভাবেই যেন বাংলাকে হেয় প্রতিপন্ন না করে। ভাষার মাসে সকলের প্রতি অনুরোধ থাকবে, বাংলা ভাষাকে সর্বত্র ব্যবহারের শপথ গ্রহণ করে যার যার জায়গা থেকে সঠিক বাংলার চর্চা অব্যাহত রাখা এবং রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

×