ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০

পার্বত্য অঞ্চলে শান্তিকল্যাণ

ড. মো. আবদুর রহিম

প্রকাশিত: ২০:৫২, ২ ডিসেম্বর ২০২৩

পার্বত্য অঞ্চলে শান্তিকল্যাণ

ড. মো. আবদুর রহিম

পার্বত্যাঞ্চলে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, হতাশা, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এবং পাহাড়ি-বাঙালি অবিশ্বাস দূর করে অধিবাসীদের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। শান্তিচুক্তি বদলে দিয়ে পাহাড়ের জীবনমান।   
পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। শান্ত নির্মল পরিবেশ মানুষের মনে শান্তি বুলায়। বহু নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষ সেখানে বসবাস করে। প্রকৃতির সরলতায় বেড়ে ওঠে শিশুরা। সর্বদা সংগ্রাম করে জীবন নির্বাহ করে সেখানকার অধিবাসীরা। যুগ যুগ ধরে তারা অধিকার বঞ্চিত অবস্থায় থেকেছিল। তাদের অনগ্রসরতার সুযোগে ব্রিটিশ আমলে অর্থের প্রলোভনে অনেকে ধর্মান্তকরণের শিকার হয়েছিল। অনেকেই আদি ধর্ম নিয়ে এখনো টিকে আছে। পাকিস্তান শাসনামলেও তারা নানা বঞ্চনার শিকার হয়। বিশেষ করে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ফলে অনেকে জমি হারান, অনেকে বাস্তুচ্যুত হন। তাদেরকে অনেক ভরসা দেওয়া হয়েছিল।

কোনো সরকারই সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে এগিয়ে যায়নি। দীর্ঘ বিরোধপূর্ণ এলাকায় হাত দিয়ে কোন বিপদ হয়! এ ভাবনায় সবাই এড়িয়ে গেছে। কিন্তু এগিয়ে যান একজনইÑ তিনি বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তাকে তো যেতেই হবে। কারণ তার দায় অনেক। বাবার তৈরি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষার বিরাট দায়িত্ব যে তাঁর কাঁধে। ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটি ছিল শেখ হাসিনার কূটনৈতিক প্রজ্ঞা আর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ। রীতিমতো বিস্ময়কর ব্যাপার! কেননা, পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম আঞ্চলিক বিরোধ শান্তিপূর্ণ নিষ্পতির নজির খুব কম।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া সরকার ও বিবাদমান পক্ষের সঙ্গে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর এ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে শান্তিচুক্তির অনেক ধারাই বাস্তবায়িত হয়েছে। অনেকে সহিংসতার পথ পরিহার করে চাকরিতে যোগদান করেছে। চুক্তির অন্যান্য শর্তও পূর্ণ বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে উভয়পক্ষেরই সদিচ্ছা প্রয়োজন।

পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর সেখানের জনজীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। বিচ্ছিন্ন পাহাড় আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে রোড নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। সম্প্রতি খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে এর পরিবর্তনের গতি-প্রকৃতি অধিবাসীদের নিজ মুখ থেকেই শুনেছি। দেখেছি মানুষের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য। পাহাড়ি অর্থনীতির গতিধারা পাল্টে যাচ্ছে। পর্যটকদের আনাগোায় মুখরিত পাহাড়। সেখানে গড়ে উঠেছে গেস্ট হাউস, পর্যটন পণ্যের দোকানপাট। পাহাড়ি মানুষরা তাদের পণ্যের সমাহার নিয়ে বসছেন রাস্তার দুইপাশে। পণ্যের ন্যায্যমূল্য পেয়ে খুশি। পাহাড়ি-বাঙালিরা মেলামেশার মাধ্যমে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের দেওয়াল ভেঙে সম্প্রীতির মেলবন্ধন রচনা করছে। তারা পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ অবস্থান করছেন। একে অপরের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ফলে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শান্তিচুক্তির পর রোড নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হয়েছে। এমন সব রুটে পাকা সড়ক তৈরি হয়েছে যা সেখানকার অধিবাসীদের কল্পনাতেও ছিল না এক সময়। সড়ক যোগাযোগ ধীরগতির পাহাড়ি জীবনে গতি এনেছে। প্রকৃতি আর নিয়তির ওপর নির্ভরশীল ছিল যে জীবন তা পাল্টে গেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায়। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনে এসেছে পরিবর্তনের পরশ। এক সময়ের বাঁশ-কাঠ আর ছনের ঘরের সঙ্গে রঙিন টিন, ইট-সিমেন্টের সংযোগ ঘটেছে। অস্থায়ী নিবাস এখন স্থায়ী আবাসিক এলাকায় পরিণত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তির ব্যবহার। ঘরে টিনের চালে শোভা পাচ্ছে রঙিন টিনের আচ্ছাদন। সেখানে রয়েছে সোলার প্যানেল।

এমনকি ছনের চালের ওপরও সোলার প্যানেলের দেখা মিলল। আছে ডিস এন্টেনা। পাহাড়ে বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ। সে কাজও চলছে। বহু এলাকা বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিদ্যুতের খুঁটি পাহাড়ি পথ বেয়ে দূরের কোনো গ্রাম বা একটি মাত্র বাড়িকে সংযুক্ত করছে বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কে। এখনো যেখানে বিদ্যুতায়ন সম্ভব হয়নি, সেখানে বসানো হয়েছে সোলার প্যানেল। নিরাপদ পানির ব্যবস্থাও হচ্ছে ধীরে ধীরে। আগের দিনে পাহাড়ে সন্ধ্যা নামলে ঘন অন্ধকার নেমে আসত। এখন পাহাড়ের গায়ে গায়ে বৈদ্যুতিক বাতিতে চলে আলো-আঁধারের এক অপূর্ব খেলা। শুধু বিদ্যুতের আলো-ই নয় শিক্ষার আলোও পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে।

শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে পাহাড়িদের কোটা চালু থাকায় শিক্ষায় আগ্রহ বাড়ছে পাহাড়ি অধিবাসীদের সন্তানদের। পাহাড়ি উঁচু-নিচু আর আঁকা-বাঁকা পথ বেয়ে দলবেঁধে ইউনিফর্ম পরিহিত ফুটফুটে চেহারার শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও অপরূপ করে তোলে। পর্যটকদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিরাপদ ভ্রমণের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। পাহাড়ি পথে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ি শিশুদের হাত নেড়ে স্বাতগ জানানোর দৃশ্য আত্মীয়ের বাড়িতে আসার অনুভূতি দেয় পর্যটকদের। এরা যখন বড় হবে, তাদের হাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন আর সুদৃঢ় হবে বলে ধারণা করা যায়।    
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের দর্শন হলো সবাইকে যুক্ত করা, ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে/মুক্ত করো হে বন্ধ’। সত্যিই পাহাড়ের মানুষরা বাংলাদেশের মূল অংশের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন নানাভাবে। খুলে যাচ্ছে পাহাড়ের বন্ধ দুয়ার। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকরা নতুন নতুন পর্যটন এলাকায় যেতে পারছেন। খাগড়াছড়ি প্রান্তে বাংলাদেশের সর্বশেষ গ্রাম উদয়পুর। সীমান্ত সড়ক গ্রামটিকে সদরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। গ্রামটির খানিকটা দূরেই দেখা গেল ওপারে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের বর্ডার। এ অঞ্চলের লোকেরা আগে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মিজোরামের বাজার থেকে কেটাকাটা করতে যেতেন বলে জানা যায়। সীমান্ত সড়ককে কেন্দ্র করে  ছোট্ট সেই গ্রামের মানুষের মধ্যে দেখলাম বড় স্বপ্নের জন্ম হয়েছে।

এলাকা ভেদে সেনাবাহিনী ও বিজিবি পাহাড়ের নিজ নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় স্থানীয় ও সীমান্ত সড়ক নির্মাণের কাজ করছে। এ সড়ক পথ জাতীয় হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মূলধারা সঙ্গে যুক্ত করছে মানুষকে। গভীর গীরিখাত এবং সুউচ্চ পাড়াড়ের উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিয়ে এবং স্থানীয় কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নির্মাণ সামগ্রী সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পৌঁছানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সে কাজটিই সেনাবাহিনী করছে। এমন এলাকায় তাঁরা কাজ করছেন সেখানে নিত্যদিনের প্রতিটি সামগ্রী বহুদূরের জনপদ থেকে আনতে হয়। ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক বান্দরবন, রাঙ্গামাটি আর খাগড়াছড়িকে বাঁধবে একসূত্রে। প্রথম পর্যায়ে ২০৫ কি. মি. রাস্তা নির্মাণ প্রায় শেষের পথে। পুরো সড়ক পথ নির্মিত হলে সীমান্ত অপরাধ কমে আসবে।

জনজীবনের নিরাপত্তার শঙ্কা দূরীভূত হবে। সাজেককে বাঁয়ে ফেলে উদয়পুর যেতে নির্মাণ করতে হয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ ফুট উঁচু সড়ক নির্মাণে পাহাড়ের মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রাখা হয়েছে। সীমান্ত সড়কের মাধ্যমে তিনটি পার্বত্য জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। যুক্ত হতে পারবে সারা দেশের মানুষের সঙ্গে। এ পথই বদলে দেবে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ব্যবস্থা। নির্মিত হবে স্থলবন্দর। বিকাশ ঘটবে পর্যটন শিল্পের। পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে তৈরি হবে সামাজিক-সংস্কৃতি আর অর্থনৈতিক মেলবন্ধন। রবীন্দ্রনাথ শিলংয়ের পাহাড়ে বসে লিখেছিলেন, ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি, আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থি’।

সীমান্ত সড়ক ও পাহাড়কে এক সঙ্গে সংযোগের পাশাপাশি পাহাড়ি-বাঙালিদেরও আন্তরিকতার বন্ধনে আবদ্ধ করবে। উদয়পুরগ্রামে ওই গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধ স্নেহকুমোর চাকমা জানান আগে খাগড়াছড়ি শহরে পায়ে হেঁটে যেতে পাঁচ-সাত দিন লেগে যেত, সেখানে এখন গাড়িতে করে কয়েক ঘন্টায় পৌঁছানো যায়। গ্রামের ছোট্ট বাজারে পসরা খুলে বসেছে গ্রামের পাহাড়ি নারীরা। সেখানে রয়েছে ওষুধের দোকান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্তার অফিস এমন কী মৃৎশিল্পের দোকানও। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল সীমান্ত সড়ককে কেন্দ্র করে আগামী দিনের ভাবনার কথা। তারা আশা করছে সেখোনে অতিদ্রুত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে, পর্যটকদের আগমনে এলাকার মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। 
স্থানীয় জনপ্রতিধিদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, শান্তিচুক্তি অধিকাংশ মানুষের মনে আশার আলো জ্বালালেও মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ সেটা এখনো মেনে নিতে পারেনি। অনেকে অশান্তি আর অস্ত্রের ঝনঝনানি জিইয়ে রাখতে চায় নিজেদের স্বার্থে। পাহাড়িদের ব্যবহার করে যারা লাভবান হতে চায় তারাই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। শান্তিপ্রিয় সাধারণ অধিবাসীরা সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে নিরাপদ বোধ করেন কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মহামারির সময় জীবন বাঁচাতে সেনাবাহিনী দ্রুত তাদের পাশে দাঁড়ায়। অল্পবিস্তর মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি জাতিগত বিরোধ নিষ্পত্তিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটির পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাহাড়ে প্রতিষ্ঠিত হোক স্থায়ী শান্তি সেটাই সকলের প্রত্যাশা।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ও  প্রাধ্যক্ষ, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×