ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০

দৈত্যের দাপট এবং ঐক্যের শক্তি

শাহজাহান কাঞ্চন

প্রকাশিত: ২০:৪৯, ২ ডিসেম্বর ২০২৩

দৈত্যের দাপট এবং ঐক্যের শক্তি

দৈত্যের দাপট ও ঐক্যের শক্তি

অমিতের অকুণ্ঠিত অনুরাগ। অনুভবের অনন্য এক মাধুর্যে মগ্ন লাবণ্য। উচ্ছ্বাস আর গভীর হৃদস্পন্দনে দীর্ঘ সংলাপের ভাঁজে একটি ছোট্ট বাক্য অমিতের- ‘কম্যুনাল রায়টের মধ্যে আমি যেতে নারাজ’। ‘শেষের কবিতা’ দুজন মানব-মানবীর প্রেম ও মনীষায় মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার অভাবনীয় এক আখ্যান। সম্প্রদায়গত বিদ্বেষকে গ্রহণ করে না, বিশ্বাসপ্রবণ মুক্তচিন্তার মানুষ। সুস্থ মানবীয় চেতনার মানুষ ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী-বিবাদকে কখনোই সমর্থন করে না। তারপরও সারাবিশ্ব জুড়ে, এই অশুভ ছায়ার জয়রথ থামাতে পেরেছে কি মানুষ? রবীন্দ্রনাথের অনুপম স্বমহিম এই উপন্যাসটির প্রকাশকাল ১৯৩০ খ্রি.।

তারও অন্তত এক শতাব্দী আগ থেকে ব্রিটিশ ভারতে প্রধান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি ধারালো হতে থাকে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ সূচনায় ‘তেতে থাকা খড়ে আগুন দিতে’ প্রথম ফুঁ এসেছিল, গরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রণে তৈরি বন্দুকের নয়া কার্তুজ উপলক্ষ করে। রটে যায়- হিন্দু, মুসলমানের ধর্ম কলুষিত করে, ইংরেজগণ ভারতীয়দের খ্রিস্টান বানানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। ধর্ম হারানোর উৎকণ্ঠা-চাপা বেদনার রোষ থেকে যে স্ফুলিঙ্গ স্ফুরিত হয়, তার সঙ্গে যোগ হয় ফিরিঙ্গি শাসকদের নানা বঞ্চনা। হিন্দু-মুসলমান সিপাহীরা অপরিকল্পিত অসংগঠিত বিদ্রোহে আত্মাহুতি দেয়। এর আগে ও পরে ইংরেজ অধিকৃত মুলুক অখ- ভারতের বীর ভূমিপুত্রগণ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহ সংঘটিত  করেন। এসব প্রতিরোধ লড়াইয়ে বীরত্ব ও দেশপ্রেমের রোমহর্ষ রোমাঞ্চ থাকলেও কোনোটাই ধর্মাবেগের ঊর্ধ্বে ছিল না। 
তবে সিপাহী বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে ভারতবর্ষে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইন পাসের মাধ্যমে রানী ভিক্টোরিয়ার হাতে ভারত শাসনের ভার অর্পিত হয়। বিদ্রোহ দমন ও প্রশমিত হলে হিন্দু-মুসলমান দুই পক্ষের নেতারা স্বধর্মের লোকদের রাজভক্ত বলে প্রচারে, প্রমাণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। পরস্পরের প্রতি দোষারোপের কাদা ছিটিয়ে, একপক্ষ ইংরেজ রাজত্বের পরাধীন ভারতকে ‘দারুল ইসলাম’ আরেক পক্ষ ‘রামরাজ্য’ আখ্যা দিয়ে, মোসাহেবির প্রতিযোগিতায় গলা ফাটাতে থাকে।  

বাংলার তৎকালীন শিক্ষিত অগ্রসরমান শ্রেণি, প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গ এবং সমসাময়িক পত্র-পত্রিকা এই বিদ্রোহের তীব্র নিন্দা করলেও সে সময়কার ভারতের বিখ্যাত নরপতি সমাজপতিদের সমীহ সম্মান না পেলেও, কালক্রমে ১৮৫৭ সালে সংঘটিত এই বিদ্রোহ পরাধীন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে খ্যাতি ও মান্যতা লাভ করেছে। ইতিহাস শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার স্মারক বহন করে না, সুদূরপ্রসারী অভিঘাতের স্বাক্ষর বহন করে ইতিহাস।
পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার তেজী-রোদ ছড়াতে থাকে তখন থেকে গণমানুষের চৈতন্যে। ইংরেজদের তোষামোদি করা মান্যগণ্যরাও বুঝে ফেলেন এবার সুর পাল্টাতে হবে। তবু ধর্মের অর্গল ছিন্ন করে মুক্ত বাতায়নে বেরিয়ে শুধু মানুষ পরিচয়ে পরস্পরে আলিঙ্গন করতে পেরেছে কি ভারতবাসী? চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু পারেনি। দখলদার চতুর বেনিয়ারা সহজেই বুঝতে পারে ধর্মভাগের এই বিভাজনকে সঠিক চালে খেলাতে পারলেই মাঠজুড়ে নেচে-কুঁদে লাল কার্ড, হলুদ কার্ড দেখিয়ে বাঁশিতে ফুঁক দিতে রেফারির সুবিধে হবে। উনারা পেরেছেনও। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত বেশ আয়েশে নির্বিঘেœ শিস বাজিয়ে রাজত্ব কায়েম রেখেছেন। ধর্মীয় বিভেদের ছুরিতে ভাগ হয়ে যায় ভারত। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ মাতম করে বাঙালি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পূর্ববঙ্গ যুক্ত হয় পাকিস্তানে। 
’৫৪-এর প্রাদেশিক নির্বাচনে একাট্টা বাঙালির প্রতীক নৌকা মার্কার অভূতপূর্ব বিজয়ের ফসল বাঙালি ঘরে তুলতে পারেনি। বিজয়ী যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্বে গঠিত নয়া মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানের পরপরই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের কূটচালে আদমজী জুট মিলে ঘটে বাঙালি-অবাঙালি শ্রমিকদের  দাঙ্গা। অজুহাতের লেজ ধরে ৯২-ক ধারা জারি করে সদ্য গঠিত প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে অতর্কিতে প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী শেখ মুজিবের সরকারি বাসভবনে পুলিশ হানা দেয়। গ্রেফতার করা হয় মুজিবকে।

যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার প্রধান শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক থেকে আবুল মনসুর আহমেদ পর্যন্ত প্রায় দেড় ডজন মন্ত্রি সকলেই মুজিবের সিনিয়র। বিজ্ঞ-অভিজ্ঞদের স্পর্শ না করে ৩৪ বছরের যুবক মুজিব ওদের টার্গেট! টার্গেট হবে না কেন? নির্ভীক মুজিবের টার্গেটও ধুরন্ধররা আঁচ করে ফেলেছে। অতএব, ভয়ে রাখ, নয় তো বশে আনো। কাজে আসেনি কোনো দাওয়াই। বিচ্যুত করা যায়নি তাঁকে লক্ষ্য থেকে। ভঙ্গিতে ছিলেন বেপরোয়া, কিন্তু পদক্ষেপ ফেলেছেন বিচক্ষণ মাপে, সতর্ক  অবলোকনে। মুজিবের মেধা ও সংবেদনে খুব পরিষ্কার ছিল তাঁর জনগণের সীমাবদ্ধতা, এমনকি শাসকগোষ্ঠীর দৌড়ের ভয়ংকর সীমানাও তাঁর দূরদর্শী দৃষ্টিসীমায় স্পষ্ট ছিল। তাঁর অসামান্য প্রতিভা তাঁকে নির্ভুল পথের দিশা দিয়েছে, জুগিয়েছে যে কোনো পরিস্থিতিতে লক্ষ্য ও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার নিঃশঙ্ক সাহস। মাথানত না করা প্রেরণা জাগানিয়া এক প্রাণের মানুষ পেয়ে যায় বাঙালি। 
ধর্মের দোহাইপারা শাসক ও তাঁবেদারদের লেবাস উন্মোচন করে দেয় মুজিবের শাণিত তর্জনী। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বুজরুকি চাল, তকবিরের ধাপ্পা মার খায় মুজিবের অকুতোভয় বজ্রধ্বনির কাছে। আপন মহিমার বাঙালি-দ্যুতিতে সাড়ে সাত কোটি আপামর জনতা হয়ে ওঠে মুজিবের ‘আমার মানুষ’। এমন মাহেন্দ্রক্ষণ বাঙালির ইতিহাসে অতীতে কখনোই আসেনি। পরিচয়ে বাঙালি, ভাষায় বাংলা, ঠিকানায় পদ্মা মেঘনা যমুনা। এমন ঐশ্বর্যময় পরিচয়ের পাগলপারা ঐকতান বাঙালি কি আগে আর কখনো শুনেছে?
সময়ের উত্তাপ, দেশীয় ও বিশ্ব পরিম-লের পরিস্থিতি সবকিছু শাণিত সংবেদে মেপে মুজিব পদক্ষেপ ফেলেছেন, কথা বলেছেন। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আগরতলার ষড়যন্ত্র মামলা, কারাগারে প্রেরণ, মিলিটারি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ, হুমকি, ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা, শাসকদের নিষ্ঠুর আস্ফালন, প্রতিকূল হাওয়ার দক্ষ নাবিক মুজিবকে টলাতে পারেনি।
উজ্জীবিত মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে ধর্মান্ধ অপশক্তি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এই অসুরদের পশ্চাদপসারণে রেখেই ’৭০-এর নির্বাচনে অভূতপূর্ব জয় এবং ’৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী, পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর, ধর্মের ধজাধারী দুষ্টচক্র কি পিছু হটেছে? পরাজিত হয়ে, বিষের ফণা নত করে নিরাপদ বিবরে বসে, হাওয়ায় গরল-শ্বাস ফেলেছে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ বিনির্মাণের পথে নানান ছলে-কৌশলে-মুখোশে এই গোষ্ঠী ছড়িয়েছে ঘৃণার বিষবাষ্প ও বিদ্বেষের কাঁটা। মুজিব, আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশবিরোধী হেন অপপ্রচার নেই যা এ গোষ্ঠী করেনি।

ঘৃণা আর বিদ্বেষের সর্বনাশা আঁধারে আচমকা হানা দেয় নিষ্করুণ ঘাতক। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের  নারকীয় পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ, জিঘাংসা আর নিষ্ঠুরতার বীভৎস হননলীলা, মুজিবের জীবদ্দশায় যে তামসিক অপশক্তি লেজ গুটিয়েছিল হন্তারকদের হুঁইসেল শুনে বেহুঁশ আনন্দে হুড়মুড় করে ওরা রাস্তায় নামে, ঘাতকদের ট্যাংকে চড়ে জিন্দাবাদের সম্মিলিত কোরাসে ওরা উল্লাস করে। খুনিদের নাটের গুরু গদিনসীন হলে তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অশুভ শক্তির উন্মত্ত বিস্তার ঘটতে থাকে। প্রায় সিকি শতাব্দী ধরে ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্যে ক্রমে অর্থেবিত্তে, শক্তিতে এরা হয়ে ওঠে হৃষ্টপুষ্ট এবং পরাক্রম। 
২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে তিনটি মেয়াদে মুজিবকন্যার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা থাকার সুবাদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ১৫ আগস্টের ঘাতকদের বিচারসহ রাষ্ট্রীয় মদদে অন্যান্য হত্যা, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিচারকার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার ফলে এই আসুরিক শক্তির প্রতিপত্তিতে কিছুটা লাগাম টানা গেছে সত্য, কিন্তু কতটুকু? সাম্প্রতিককালে দুনিয়াব্যাপী সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও ঘৃণার ভয়াবহ পুনরুত্থান সময়ে প্রগতির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ কতটুকু সফল হতে পারবে? নির্ভীক মুজিব যেমন ধর্ম-পুঁজির রাজনীতিকে অকার্যকর করে সব মানুষকে ঐক্যের সুতোয় গেঁথে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন, তেমনি তাঁর কন্যা পারবেন বর্তমানের পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ানো অসুরের ছায়া এড়িয়ে জনগণের সুদৃঢ় ঐক্যের শক্তিতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতেÑএমনটাই প্রত্যাশা।

লেখক : কথাকার ও প্রকৌশলী (অব.), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড

×