ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বাংলাদেশের অহংকার

লে. কর্নেল এ এস এম নাছের, পিএসসি, জি+

প্রকাশিত: ২১:০১, ২০ নভেম্বর ২০২৩

বাংলাদেশের অহংকার

বহু ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা

আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত আমাদের পেশাদার বাহিনী আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও স্থান করে নিয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে প্রথমস্থানে অবস্থানকারী সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আজ চিনতে পেরেছে সারাবিশে^র মানুষ। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সদস্য সংখ্যা বিশে^র সর্বোচ্চ

বহু ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। রচিত হয় এক মহান বিজয়ের অধ্যায়। এই অধ্যায়ের এক মর্মস্পর্শী দিন একুশে নভেম্বর। যেখানে লিখিত রয়েছে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর এক নজিরবিহীন সাহসিকতা এবং বীরত্বের কথা। এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী একত্র হয়ে পাকিস্তানের দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণের সূচনা করে। আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম হয় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর। স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্য তাদের বীরত্ব, সাহসিকতা এবং নেতৃত্বের বহির্প্রকাশ ঘটিয়েছিল।

যুদ্ধে বিজয় অর্জনের পেছনে তাদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী হয়ে ওঠে জাতির পরম আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব পালন ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী জাতির বিভিন্ন সংকট ও ক্রান্তিকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন ও অবদান রাখার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর এই সব সাফল্যমণ্ডিত কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিসরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তেও বিশাল সম্মান বয়ে এনেছে, যা শুধু সশস্ত্র বাহিনীর নয়, বরং এদেশের সকলের জন্য গর্বের বিষয়। ১৯৮৬ সাল থেকে ২১ নভেম্বর প্রতিবছর ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ হিসেবে উদ্যাপন করা হয়। এ দিনে প্রতিটি মানুষ দেশের সামরিক বাহিনীর বীর সদস্যদের প্রতি তাদের বিনম্র শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে। একই সঙ্গে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই অতীত ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখে আরও এগিয়ে যাওয়ার।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হয় রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চালিকা শক্তি ছিল তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাবহিনীর বাঙালি সামরিক সদস্যবৃন্দ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হলে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে প্রায় ২৬ হাজার সুপ্রশিক্ষিত বাঙালি অফিসার ও সদস্য বিদ্রোহ করেন এবং অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। এর মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথমে পাঁচটি ও পরবর্তী সময়ে নবপ্রতিষ্ঠিত আরও তিনটি ব্যাটালিয়ন মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে।

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণে যখন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নাস্তানাবুদ ও কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল, তখন গেরিলা যুদ্ধের পাশাপাশি প্রথাগত যুদ্ধ শুরু করার জন্য ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর সেনাবাহিনীর সঙ্গে নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণের সূচনা করে। সে কারণে ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে স্মরণ করা হয়।
২৫ মার্চ রাত্রিবেলায় চট্টগামের ষোলশহরে অবস্থানরত ৮ম ইস্ট বেঙ্গল, ২৬ মার্চ দিনের বেলায় কুমিল্লায় অবস্থিত ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল, ২৭ মার্চ জয়দেবপুরে অবস্থানরত ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ২৮ মার্চ যশোরে অবস্থানরত ১ম ইস্ট বেঙ্গল ও সৈয়দপুরে অবস্থানরত ৩য় ইস্ট বেঙ্গল হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেয়। এই পাঁচটি পদাতিক ব্যাটালিয়নই মুক্তিবাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামোর মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম অপারেশন সংক্রান্ত সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয় হবিগঞ্জের মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোতে।

এই সভাতেই কর্নেল ওসমানীকে মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার ইন চিফের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় এবং পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সম্পূর্ণ রণাঙ্গনকে প্রথমে ৪টি, পরবর্তীতে ১১ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় দ্বিতীয় বৈঠকের পর ৬টি এবং সর্বশেষে জুলাই মাসে সর্বমোট ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে প্রতিটি সেক্টর কমান্ডারদের ওপরে নিজস্ব সেক্টরের অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এক পর্যায়ে দখলদার বাহিনী মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা এবং আক্রমণের প্রচ-তায় ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।
নৌবাহিনীর সদস্যগণ শুরুতে নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন সেক্টরে অপারেশনে যোগ দেয়। পরবর্তীতে নৌবাহিনীর কয়েকজন নাবিক ফ্রান্স থেকে পালিয়ে এসে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন। এছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ছুটিতে এসে যারা ফেরত যেতে পারেননি, তারাও মুক্তিযুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং নৌবাহিনী গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। সকল সেক্টরে কর্মরত নৌবাহিনীর সদস্যদের আগস্ট মাসে কোলকাতায় একত্রিত করা হয় এবং প্রশিক্ষণের জন্য হুগলী নৌঘাঁটিতে স্থানান্তর করা হয়।

যুদ্ধের শুরু থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট ৫১৫ জন নৌকমান্ডোকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অপারেশন পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করা হয়। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই কমান্ডোরা অনেক অপারেশন করে। কিছু পাকিস্তানি যুদ্ধ জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়াসহ প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করতে সমর্থ হয়। এর মধ্যে ১৫ আগস্ট ১৯৭১ তারিখের ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর মাধ্যমে ৫টি বন্দরে একই দিনে মোট ২৬টি জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। কোলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত দুটি টাগ বোটকে ‘গার্ডেন রীচ ডক ইয়ার্ড’-এ যুদ্ধ জাহাজে রূপান্তরিত করা হয় এবং নামকরণ করা হয় ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’।
১৯৭১ সালের মে মাসের শেষ দিকে উইং কমান্ডার এ কে খোন্দকার বিমান বাহিনীর একদল অফিসার ও টেকনিশিয়ানসহ মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। তাকে ‘ডেপুটি চিফ অব স্টাফ’ নিয়োগসহ মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। মাত্র ৩/৪ টি হালকা বিমান ও হেলিকপ্টার নিয়ে এবং ১০/১২ জন পাইলট ও টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শুরু করে আমাদের বিমান বাহিনী। পরবর্তীতে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ১৭ জন অফিসার এবং ৫০ জন বিমানসেনা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

ভারতীয় বিমানবাহিনী প্রদত্ত একটি অটার, একটি ডিসি-৩ বিমান ও একটি অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার নিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের ডিমাপুরে গঠিত হয় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’-এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে শুরু হয় এই বাহিনীর অগ্রযাত্রা।
১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর ছিল ঈদের দিন। দখলদার বাহিনী সেদিন মুক্তিবাহিনী কর্তৃক কোনো রকম অভিযান পরিচালনায় আশঙ্কা করেনি। রণকৌশলের সাফল্য অর্জনের একটি মূলনীতি হলো- শত্রুকে হতবাক করে দেওয়া। এই নীতি অনুসরণ করে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ‘ইয়মকিপুর’ উৎসবের দিনে আরবরা ইসরাইল আক্রমণ করেছিল। মুক্তিবাহিনীও এই মূলনীতি অনুযায়ী এই দিনটিকেই বেছে নিয়েছিল সম্মিলিত আক্রমণ পরিচালনার জন্য। রাত থেকেই সমগ্র রণাঙ্গনের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম, পশ্চিম, উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সমন্বিতভাবে স্থলবাহিনী অন্যান্য বাহিনীর সহায়তায় অভিযান পরিচালনা শুরু করে। যশোরের রানাঘাটের আক্রমণে দখলদার বাহিনীর এক স্কোয়াড্রন ট্যাংক সম্পূর্ণ ধ্বংস ও প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।

পশ্চিমে রংপুরের পঞ্চগড় এবং দিনাজপুরের হিলি অঞ্চলে পাকিস্তানি অবস্থানে আক্রমণ পরিচালনা করা হয়। উত্তর পূর্বাঞ্চলে সিলেটের জকিগঞ্জ ও পূর্বে কুমিল্লার বেলুনিয়া ও তবলছড়ি এই সময়ে শত্রুমুক্ত হয়। একুশে নভেম্বর স্থলবাহিনীর সবচেয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ অভিযানটি পরিচালিত হয়, তা ছিল পূর্বাঞ্চলের আখাউড়ায় পাকিস্তানি অবস্থানের ওপর মুুক্তিবাহিনীর আক্রমণ। এই আক্রমণের পথ ধরেই নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের মধ্যে ৩৭০ টি বিওপির মধ্যে ২৮০টি মিত্রবাহিনীর হস্তাগত হয়। প্রায় ৫০০০ বর্গমাইল এলাকা সম্পূর্ণ মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। 
একই দিনে নৌকমান্ডোরা অতর্কিতে হামলা চালায় চট্টগ্রাম, চালনা, চাঁদপুর, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জে।

নৌকমান্ডোদের অপারেশন আকাশবাণীতে প্রচারিত গানের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছিল। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল প্রতিদিন সকাল ০৭:৩০ ঘটিকায় আকাশবাণী ‘খ’ কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনার জন্য। পঙ্কজ মল্লিকের ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান’টি চূড়ান্ত প্রস্তুতি এবং সন্ধ্যায় ‘আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ^শুর বাড়ী’ গানটি আক্রমণ চালাবার সংকেত হিসেবে নির্বাচিত ছিল। নৌকমান্ডোরা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রায় ৫০ টি অভিযানে পাকবাহিনীর ১২৬টি যুদ্ধ জাহাজ ধ্বংস/দখল করেন। স্থল এবং নৌঅভিযানের পাশাপাশি এইদিনে আখাউড়া, বেলুনিয়া ও জকিগঞ্জ আক্রমণে নবগঠিত বিমান বাহিনী সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল।

এছাড়া বয়রা আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর যে তিনটি এফ-৮৬ স্যাবর জেট অংশগ্রহণ করেছিল, তার দুটি ধ্বংস করা হয়েছিল মিত্রবাহিনীর জঙ্গি বিমানের সহায়তায়। ২৫ মার্চ রাত থেকে শুরু করে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত এদেশের মুক্তিযোদ্ধারা দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরদর্পে যুদ্ধ করে তাদের প্রায় পরাভূত করে ফেলেছিল। শুধু জান, মাল ও সামরিক নয়, দখলদার বাহিনী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত যেখানে হয়েছিল, তা হলো তাদের যুদ্ধ করার মনোবল। ফলশ্রুতিতে চূড়ান্ত বিজয় ছিল তখন কেবল সময়ের বিষয়। ইত্যবসরে ৩ ডিসেম্বর থেকে যৌথবাহিনী ঢাকা অভিমুখে তাদের অগ্রযাত্রা শুরু করে এবং ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকার রেসকোর্সের ময়দানে আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় নতুন একটি দেশÑ যার নাম বাংলাদেশ।
সশস্ত্র বাহিনী দিবসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দৃঢ় মনোবল থাকলে যে কোনো সুসজ্জিত শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব, এ দিবস তারই প্রতিফলন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ আমাদের দেশপ্রেমের ভিত্তিকে আরও মজবুত ও সুদৃঢ় করে। এ দিবস সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যদের মাঝে অনুপ্রেরণা জোগায় এবং নিজের জীবন বাজি রেখে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আজও এই চেতনাকে বুকে লালন করে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্য দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বদা নিবেদিত।

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সশস্ত্র বাহিনীকে জাতির গর্ব হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি এমন এক বাহিনীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে বাহিনী হবে জনগণের বাহিনী, যে বাহিনী পৃথিবীর যে কোনো দেশের সামরিক বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হবে। যে বাহিনী দেশের যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সদাপ্রস্তুত থাকবে। জাতির পিতার সেই স্বপ্ন আজ অনেকাংশেই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। একুশে নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সশস্ত্র বাহিনী দেশের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত আমাদের পেশাদার বাহিনী আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও স্থান করে নিয়েছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে প্রথমস্থানে অবস্থানকারী সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আজ চিনতে পেরেছে সারাবিশ্বের মানুষ। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সদস্য সংখ্যা বিশে^র সর্বোচ্চ। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক শান্তি মিশনে যোগদানের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের পতাকাতলে একত্র হয় তারা। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যোগ দেয় ১৯৯৩ সালে। বিশে^র বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতিসংঘের বিশ^স্ত ও পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেদের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েও আমাদের সশস্ত্র বাহিনী আর্তমানবতার সেবা করে চলেছে। শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেই নয়, সশস্ত্র বাহিনী দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিরক্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, সাম্প্রতিকালে কোভিড ১৯ মহামারিসহ দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
আমাদের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের জন্য সশস্ত্র বাহিনী দিবস সহযোগিতা, আস্থা ও দেশ প্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন করে দেশের প্রয়োজনে আত্মোৎসর্গ করার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার দিন। দেশের প্রতিরক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ আর জনগণের জন্য ভালোবাসা- এ দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর দেশপ্রেম। দেশপ্রেমের আদর্শ ও দেশ গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা করা সশস্ত্র বাহিনী তরুণ প্রজন্মের কাছে আজ আলোর দিশারিস্বরূপ। একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশসেবায় সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রণী ভূমিকা দেশপ্রেমিক গণমানুষের কাছে পাথেয় হয়ে আছে এবং থাকবে। আমরা যেন এদেশের মাটি ও মানুষের প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করতে পারি।

উত্তরসূরিদের মতো  জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে আমরা যেন রাখতে পারি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এদেশের যে কোনো সংকটে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও আমরা যেন হতে পারি জাতীয় আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক। এই বিশেষ দিনে এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমাদের প্রার্থনা, আমরা যেন ২১ নভেম্বরের চেতনায় উজ্জ¦ীবিত হয়ে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ এবং দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ থাকতে পারি। আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই ‘আমাদের অহংকার-  একুশে নভেম্বর’। 

লেখক : সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা

×