ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

পাবলিক প্লেসে ধূমপান

রহিম শেখ

প্রকাশিত: ১৮:০৩, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩

পাবলিক প্লেসে ধূমপান

তামাক

দেশের বর্তমান আইনে পাবলিক প্লেস কিংবা গণপরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ। কিন্তু এই আইন অনেকেই মানে না। এই বিধান অমান্য করলে তিন শ’ টাকা অর্থদণ্ড এবং একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার এই অপরাধ করলে দ্বিগুণ হারে দণ্ডিত হওয়ার কথা। কাগজের সেই কথা বাস্তবে খুব বেশি চোখেও পড়ে না। তবে এবার পাবলিক প্লেসে ধূমপানের সঙ্গে ‘তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করতে পারবেন না’ এমন বিধান যুক্ত করে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধিত আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে। 

এই বিধান অমান্যের সাজা ৩০০ টাকার পরিবর্তে ২ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়ায়। নতুন আইনে এই বিধান কতটা বাস্তবায়ন হবে সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে সংশোধিত খসড়ায় পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপানের জন্য নির্দিষ্ট ‘ধূমপান এলাকা’ বিলুপ্তের প্রস্তাব করেছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ। তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ সংক্রান্ত কমিটি বলেছে, ‘ধূমপান এলাকা’ বিলুপ্তির বিষয়ে অধিকতর পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই বিষয়ে অধিকতর পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কি আছে এটা সচেতন মানুষ হিসেবে যে কেউ প্রশ্ন তুলবেন।

ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল টোব্যাকো কন্ট্রোলের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকায় হসপিটালিটি ভেন্যু এবং ট্রেনগুলোতে নির্ধারিত ধূমপান এলাকা (ডিএসএ) মূল্যায়ন করে দেখায় যে, হসপিটালিটি ভেন্যু এবং ট্রেনগুলোতে নির্ধারিত ধূমপান এলাকা (ডিএসএ)-এর মধ্যে কেউই সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা পূরণ করতে পারেনি এবং বর্তমান তামাক আইন মেনে চলেনি। ডিএসএ-এর সঙ্গে মাত্র ১৫ শতাংশ ভেন্যু ডিজাইনের মান পূরণ করেছে, কোনোিটই অভ্যন্তরীণ মান পূরণ করেনি। উপরন্তু, ডিএসএ-এর কোনোটিই ধূমপানমুক্ত এলাকার প্রয়োজনীয়তা মেনে চলেনি।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে ৪৩% মানুষ। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রাপ্ত বয়স্ক জনগণের প্রায় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ রেস্তোরাঁয় এবং ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ চা-কফির স্টলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। প্রায় ২৪ শতাংশ (২ কোটি ৫০ লাখ) প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। এছাড়াও প্রায় ৩৯ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ (৪ কোটি ৮ লাখ) বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ৬১ হাজার শিশু পরোক্ষ ধূমপানজনিত বিভিন্ন রোগে ভোগে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় সকল পাবলিক প্লেস শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার সুযোগ না থাকায় পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ডিএসএ বিলুপ্ত করার মাধ্যমেই কেবল শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের তথ্য বলছে, তামাক বছরে ১ লাখ ৬১ হাজার প্রাণ কেড়ে নেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ রাখার বিধান বাতিলসহ পূর্ণাঙ্গ ধূমপানমুক্ত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে দেশকে তামাকমুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।

জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ এবং গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) যৌথভাবে ঢাকার ১১৮টি আবাসিক হোটেল ও ৩৫৫টি রেস্টুরেন্ট, ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ৫৩টি ট্রেনের ওপর একটি গবেষণা চালায়। এ থেকে দেখা গেছে, মোট ৫২৬টি নমুনার মধ্যে মাত্র ৪১টিতে (৮ শতাংশ) ডিএসএ পাওয়া গেছে, যার একটিও পরিপূর্ণভাবে আইন মেনে করা হয়নি। গবেষণার সুপারিশে বলা হয়েছে, ধূমপানের জন্য নির্ধারিত এলাকা (ডিএসএ) অধূমপায়ীদের পরোক্ষ ধূমপানের ছোবল থেকে সুরক্ষা প্রদান করতে পারে না এবং এই বিধান চালু রেখে ধূমপানমুক্ত আইন বা নীতির সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ডিএসএ বাতিল করা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু ৩৫% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিভিন্ন আকারে তামাক ব্যবহার করে এবং দেশের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা পরোক্ষাভাবে ধূমপানের সংস্পর্শে আসছে। আশ্চর্যজনকভাবে, ৪৩% কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষাভাবে ধূমপানের সম্মুখীন হয়। এছাড়া পরোক্ষাভাবে ধূমপানের শিকার হন ৩৯% বাসা-বাড়ির লোকজন। যদিও বাংলাদেশ তামাকের বিজ্ঞাপন এবং প্রচার বাদ দেওয়ার লক্ষ্যে বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল স্বাক্ষর করেছে।  

কিন্তু পরোক্ষ ধূমপানের ফলে যেসব স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে এরমধ্যে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যাগুলো অন্যতম। শুধু ব্যক্তি নয়, সিগারেটের ধোঁয়া পরিবেশ দূষণে একটি প্রধান অবদানকারী, ক্ষতিকারক রাসায়নিক দিয়ে বায়ু, জল এবং মাটিকে দূষিত করে। 

নতুন খসড়া আইনে আগের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত অফিস ও বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, লিফট, আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল, ক্লিনিক ভবন, আদালত ভবন, বিমানবন্দর ভবন, সমুদ্রবন্দর ভবন, নৌ-বন্দর ভবন, রেলওয়ে স্টেশন ভবন ও প্ল্যাটফর্ম, বাস টার্নিমাল ভবন, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপণি ভবন, হোটেল, যে কোনো ধরনের রেস্টুরেন্ট, খাবার দোকান, কফি হাউস, চায়ের দোকান এবং উল্লিখিত পাবলিক প্লেসগুলোর প্রাঙ্গণ, কমিউনিটি সেন্টারসহ যে কোনো ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানস্থল, পাবলিক টয়লেট, শিশু পার্ক, মেলা, পাবলিক পরিবহনে আরোহণের উদ্দেশ্যে যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সারিসহ সেবাগ্রহণের জন্য মানুষের সারি অথবা সরকার সরকার বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দিয়ে সময় সময় ঘোষিত অন্য যেকোনো বা সকল স্থানকে পাবলিক প্লেস হিসেবে রাখা হয়েছে।

 খসড়ায় বলা হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান ও শিশু পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করা যাবে না। এটি করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার এই অপরাধ করলে জরিমানা দ্বিগুণ হবে। কোনো ব্যক্তি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লাইসেন্স নেওয়া ছাড়া তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করতে পারবেন না। লাইসেন্স ছাড়া তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে দণ্ড দ্বিগুণ হবে।

যদিও সরকার তামাক সেবন কমানোর জন্য কাজ করছে, সুবিন্যস্ত তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার জন্য সরকারের অঙ্গীকারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে সাহায্য করতে পারে। বিদ্যমান আইনগুলো আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা অপরিহার্য। ডিএসএ নিষিদ্ধ করা, আইনের সঙ্গে বিদ্যমান ডিএসএ-এর সম্মতি পর্যবেক্ষণ, তামাক পণ্যের কর বৃদ্ধি, ব্যাপক তামাক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং ধূমপায়ীদের যারা ধূমপান ছাড়তে চান তাদের সহায়তা প্রদানের মতো পদক্ষেপের প্রবর্তন বিবেচনা করা উচিত। জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া বাংলাদেশের তামাকের ব্যবহার কমাতে এবং একটি স্বাস্থ্যকর জাতিকে উন্নীত করার প্রচেষ্টাকে অনুঘটক করতে পারে।

লেখক : বিজনেস এডিটর, দৈনিক জনকণ্ঠ

আরএস

×