ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

শতবর্ষ পরেও প্রাসঙ্গিক ইবসেন

দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশিত: ২৩:২৮, ২৫ মে ২০২৩

শতবর্ষ পরেও প্রাসঙ্গিক ইবসেন

.

বছর পরিক্রমায় অতিক্রান্ত হচ্ছে মে মাস। মাসেই প্রয়াণ ঘটেছে বিশ্ব নাট্য সাহিত্যের জনক হেনরিক ইয়ুহান ইবসেনের। জন্মেছিলেন উত্তর ইউরোপে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ নরওয়েতে ১৮২৮ সালের ২০ মার্চ। মারা গেছেন ১৯০৬ সালের ২৩ মে। ২০০৬ সালের ২৩ মে গোটা বিশ্ব শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে তাঁর শততম মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলাদেশেও নাট্যজগতে আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়েছে দিনটি। কারণ, বিশ্বখ্যাত সেক্সপিয়ারের পর তিনিই উনিশ শতকের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে বিবেচিত। তাঁকে বলা হয় আধুনিক নাট্য সাহিত্যের জনক। সেই শিরোপা আজ অবধি বহাল রয়েছে বিশ্ব সাহিত্যের নাট্যাঙ্গনে। তাঁর মতো শক্তিশালী নাট্যকারের অভাব আজ পর্যন্ত অনুভব করে আসছে বিশ্ব নাট্য জগত। উল্লেখ্য, প্রয়াণ বর্ষে ২০০৬ সালে গোটা বিশ্বে তাঁর নাটক ডলস হাউস’ ( উড়ষষং ঐড়ঁংব) মঞ্চায়নের যে বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে, তা ইতোপূর্বে আর কোনো নাট্যকারের ক্ষেত্রে ঘটেনি। এই রেকর্ড আজও অক্ষুণœ

বিশ্বখ্যাত মনীষী আলফ্রেড বার্নার্ড নোবেল (২১ অক্টোবর, ১৮৮৩-১০ ডিসেম্বর, ১৮৯৬) যেমন সুইডিশ জাতির আইকন হিসেবে চিহ্নিত, তেমনি নরওয়েজিয়ান জাতিরও গর্বের প্রতীক হেনরিক ইবসেন। দুজনেরই জন্ম অবিভক্ত সুইডেনে হলেও বর্তমান নরওয়ের অংশ সিয়েন শহরে জন্মলাভ করায় দুজন হয়ে যান দুই দেশেরÑ ১৯০৫ সালে সুইডেনের ইউনিয়ন থেকে নরওয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে। উল্লেখ্য, নোবেল শুধু ডিনামাইটসহ সাড়ে তিন প্যাটেন্টের আবিষ্কারক বিজ্ঞানীই ছিলেন না। তিনিও ছিলেন একজন বড় মাপের সাহিত্যিক। কিন্তু তাঁর বিজ্ঞান গবেষণা দুনিয়া কাঁপানো আবিষ্কার কর্মের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় সাহিত্যের সৃষ্টিশীল কর্ম। নোবেলের লেখা উল্লেখযোগ্য একটি নাটক হলোÑ নিমেসিস।

পরিতাপের বিষয় হলো, বিশ্বখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের সম্মান সমাদর হয়নি নিজ দেশে তার জীবদ্দশায় বিতর্কিত হবার কারণে। প্রচলিত মূল্যবোধ থেকে ভিন্ন ধারার নীতিবোধ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে লেখা তাঁর নাটক উনিশ শতকের গোড়া সমাজ সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। জীবনের বাস্তব প্রেক্ষিত থেকে আড়াল করা বা দাবিয়ে রাখা রূঢ় বাস্তবতাকে তিনি চোখের সামনে এনে সত্যকে দাঁড় করিয়েছেন মুখোমুখি। সমাজের কাছে যা লজ্জা এবং স্ক্যান্ডালের প্রতিরূপ হিসেবে হয়েছে আবির্ভূত। তাঁর সময়ে এই কাজটি কেউ করতে পারেননি এতটা নিপুণভাবে এবং সাহসের সঙ্গে। তিনি সমাজ, নিজ পরিবার এবং ব্যক্তি জীবনের বাস্তব চরিত্রগুলো থেকে তুলে নেওয়া উপাদানগুলোই উপস্থাপন করেছেন তাঁর অনবদ্য সৃষ্টিকর্মে। তিনি বলেছেন, তাঁর পরিবারের বাস্তব ঘটনা এবং চরিত্রগুলো নিয়েই তিনি রচনা করেছেন বেশিরভাগ নাটকে। তাই তাঁকে বলা হয় বাস্তবতা চিত্রনের এক শ্রেষ্ঠ কারিগর। তখনকার সামাজিক পারিবারিক জীবন মূল্যবোধ ছিল ভিক্টোরীয় আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই আদর্শের বাইরে কিছু করাকে ভালো চোখে দেখা হতো না। কিন্তু ইবসেনের সৃষ্টি কর্ম ছিল মানব চরিত্রের বিভিন্ন বাস্তব দিক তুলে ধরা।

ইবসেন আধুনিক মঞ্চনাটক প্রতিষ্ঠা করেছেন সামাজিক মূল্যবোধের বিভিন্ন উপাদানকে সমালোচকের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করে। ভিক্টোরীয় যুগে নাটকগুলো কেবল সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে কথা বলবে, এমনটাই ভাবা হতো। যেখানে অন্ধকার এবং কালো শক্তির বিরুদ্ধে সত্যের জয় অনিবার্য-এমন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। সব নাটকই কেবল তৎকালীন সামাজিক মূল্যবোধের গুণগান গেয়ে শেষ হবে, অন্ধকার দিক তুলে ধরা যাবে না, নাটক বলতে এমনই চিত্র আশা করা হতো। ভাবা হতোÑ পারিবারিক জীবনের নীতি মূল্যবোধ এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার কথা বলবে নাটক। ইবসেন এই ধারার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে নাটকের সমাপ্তিতে বৈচিত্র্য আনেন এবং নতুন একটি ধারার জন্ম দেন। জন্যই শেক্সপিয়ারের মতো ইবসেনকে ইউরোপীয় ধারায় নবজাগরণ সৃষ্টির অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর পেছনে  তাকে যে অক্লান্ত শ্রম, মেধা মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে, তাকে উপমা হিসেবে বলা যায় বিমল মিত্রের কড়ি দিয়ে কিনলাম উপন্যাসের মতো করে।

তার সৃষ্টি কর্ম নিয়ে তুমুল বিতর্ক, নিন্দা, সমালোচনা, বিষোদ্গার তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। তার বহু নাটক মঞ্চস্থ হতে পারেনি নিজ দেশে। তার নাটক সময়ের রক্ষণশীল সমাজে এতটাই বিরূপ অবস্থার শিকার হয়েছিল যে, নিজ দেশে তার নামটি হয়েছিল অবাঞ্ছিত। এমনও হয়েছিল, তার লেখা ভালো নাটকগুলোও ছদ্ম নামে মঞ্চস্থ করতে হয়েছে। এমনকি তাঁর বিখ্যাত নাটিক  দ্য ঘোস্টস (এযড়ংঃং) নিজ দেশে মঞ্চস্থ হতে সময় লেগেছে ২০ বছর। তারপর নরওয়ের জনগণ মূল্যায়ন করেছে তাকে।

১৮৭৯ সাল থেকে লেখা তার সব নাটকই ইউরোপীয় সমাজে আলোচনা সমালোচনার ঝড় তোলে। কারণ, তিনি লোকচক্ষুর আড়ালের এবং বিদ্যমান অসঙ্গতিপূর্ণ বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন নাটকে। সেই বাস্তবতা অনৈতিক জীবনাচারণ, অন্যায়ের এবং প্রবঞ্চনার। একটি উদাহরণ পরকীয়া। সাহিত্যে এমন একটি বিষয় তুলে ধরাকে সমাজ তখন ভালো চোখে দেখেনি। তাই বলে সত্য চিত্রটি তুলে ধরতে তিনি পিছপা হননি তীব্র সমালোচনা, নিন্দা বাধার মুখে পড়েও। এমনই বাধা ছিল যে, মঞ্চস্থ নাটকে রচয়িতা ইবসেনের নাম প্রকাশ করা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু বেলা শেষে তার ভাগ্যাকাশের কালো মেঘ সরে যায়। তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হন বিশ্ব সাহিত্যের দিকপালÑ জর্জ বার্নার্ড , অস্কার ওয়াইল্ড, আরথার মিলার, মারগারিতা ইউরসেনার, জেমস জয়েস, ইউজিন নীল, মিরোস্লাভ ক্রিজারার মতো কালজয়ী প্রতিভাবানরা।

তাকে বলা হয় ফাদার অব রিয়ালিজম। বাস্তব যতই নগ্ন হোক, সেই নগ্ন চিত্রটিই চিত্রিত করেছেন তিনি নাট্য সাহিত্যে।সত্য যে বড় কঠিন/কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’- এই সত্যকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন সৃষ্টির মহান কারিগর হিসেবে। তা করতে গিয়ে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের মুখ তিনি দেখেননি। চরম অর্থকষ্টে কেটেছে তাঁর জীবন। এর জন্য কম মূল্যও পরিশোধ করতে হয়নি তাঁকে। ২৭ বছর ছিলেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে ইতালি জার্মানিতে। লিখেছেন নরওয়েজিয়ান ডেনিশ ভাষায়। বিশ্ববরেণ্য এই নাট্যকার এবং নাট্য চিত্র পরিচালকের (পীয়ার জিন্ট) সাড়া জাগানো নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হলো- ব্র্যান্ড, পীয়ার জিন্টএনিমি অব দা পিপলএমপেরর অ্যান্ড গ্যালিলিয়ান, ডলস হাউসহেড্ডা গেবলারঘোস্টস, দা ওয়াইল্ড ডাক, হোয়েন উই ডেড এওকেন, রোসমারসহোল্ম, দা মাস্টার বিল্ডার। এর মধ্যে দা ওয়াইল্ড ডাক এবং রোসমারসহোল্ম নাটক দুটিকে ইবসেন নিজে স্থান দিয়েছেন শীর্ষ স্থানে। এরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। দুটিকেই বলা হয় মাস্টার পিস। নোবেল পুরস্কারের জন্য তিনি মনোনীত হনÑ ১৯০২, ১৯০৩ এবং ১৯০৪ সালে। কিন্তু ভাগ্যে শিকে ছিড়েনি শেষ পর্যন্ত।

ডলস হাউস- নারী স্বাধীনতার আওয়াজ

ইবসেন ৫০ অতিক্রম করার পর ১৮৭৯ সালে ডলস হাউস  নামে যে নাটকটি হাজির করেন, তা ইউরোপসহ বহির্বিশ্বে এক তুমুল আলোচনার ঝড় তোলে। নারী স্বাধীনতা এবং নারী মুক্তির সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করার অনবদ্য সৃষ্টি হিসেবে বিশ্ব নন্দিত হয় নাটকটি। এটি  তাকে নিয়ে যায় ইউরোপের আভা গার্দের দিকে। এই নাটকে দাবি তোলা হয়, একজন পূর্ণবয়স্ক, স্বাধীন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য নারীকেও দিতে হবে স্বাধীনতা। এই নাটকের কেন্দ্রীয় প্রতিবাদী-সংগ্রামী চরিত্র নোরা হেলমার  রাতারাতি হয়ে ওঠেন নারী মুক্তির প্রতীক রূপে। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করা নোরা বিশ্বের বহু দেশে মুক্তি এবং ক্ষমতার জন্য সংগ্রামরত নারীদের কাছে কিভাবে হয়ে ওঠেন একটা প্রতীকী চরিত্র, তা তুলে ধরা হয়েছে অনবদ্যভাবে। এই বাস্তবতা আজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শত কোটি নারীর অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে। জন্যেই হেনরিক ইবসেন শত বছর পরেও পৃথিবীর দেশে দেশে প্রাসঙ্গিক এবং সমকালীন আধুনিক নাটকের সম্রাট হিসেবে বিবেচিত। এতটুকুও ম্লান হয়নি তার আবেদন। নোরাকে  তার নাটকে এমনভাবেই তুলে ধরা হয়েছে যে, নারীমুক্তির সংগ্রামের সঙ্গেনোরা হেলমার’-এর নাম আজও অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

এরপরপিলারস্ অব সোসাইটিনাটক তার জন্য খুলে দেয় জার্মানির দুয়ার। এরপর অবাধে সম্মুখ যাত্রা ডলস্ হাউস’, ‘দি ওয়াইল্ড ডাক’, ‘পিলারস অব সোসাইটি’, ‘হেড্ডা গাবলার’, দি ওয়াইল্ড ডাক’, এবংঅ্যামপেরর অ্যান্ড গ্যালিলিয়ানইত্যাদি নাটক তাঁকে সমগ্র ইউরোপ বহির্বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। তখন ইবসেনের লেখার ধার মননশীল সৃষ্টির অফুরান আবেদন তাৎপর্য বুঝতে পারা সমালোচক মহল  এসব অনবদ্য সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়নে সমর্থ হন। ততদিনে তিনি হতাশা ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া একজন রুগ্ন মানুষ। তারপরও  অলস বসে থাকেননি সৃষ্টিশীলতার প্রাণপুরুষ হেনরিক ইবসেন। মৃত্যুর বছর আগে- ১৮৯৯ সালে তিনি রচনা করেন জীবনের শেষ নাটকহোয়েন উই ডেড অ্যাওয়াকেন

(আগামী সংখ্যা সমাপ্য)

স্টকহোম, ২৩ মে, ২০২৩

লেখক : সুইডেন প্রবাসী সাংবাদিক

[email protected]

×