ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

মানবিক বিপর্যয়

-

প্রকাশিত: ২০:৪১, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

মানবিক বিপর্যয়

সম্পাদকীয়

সোমবার মধ্যরাতে তুরস্ক-সিরিয়ায় সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পটি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে  যে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ধ্বংসের কাছে মানুষ কত অসহায়। দেশ দুটিতে সাত দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে যেমন বিস্তর ধ্বংসযজ্ঞসহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তেমনি প্রাণহানি ঘটেছে বিপুল সংখ্যায়। ভূমিকম্পটির তীব্রতা ও স্থায়িত্ব এতই বেশি ছিল যে, তা অনুভূত হয়েছে সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার দূরে গ্রীনল্যান্ডেও। তদুপরি ভূমিকম্পের পর অর্ধ শতাধিক পরাঘাত সংঘটিত হয়, যার দুটির মাত্রা ছিল ৬-এর বেশি।

ফলে, বহুতল ভবনসহ অনেক সুপার মার্কেট ও হাট-বাজার প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আরও ভূমিকম্পের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা চালানো কঠিন হচ্ছে উদ্ধার কর্মীদের। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ উদ্ধারকর্মীর সংখ্যাও সীমিত। উদ্ধার কাজের সঙ্গে সঙ্গে আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভের আশঙ্কা, তুরস্ক ও সিরিয়ায় মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেই হিসাবে আহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সহজেই অনুমেয়। এর আগে তুরস্কে ১৯৯৯ সালে প্রবল একটি ভূমিকম্প হয়েছিল, যাতে ১৭ হাজারের বেশি জীবনহানি ঘটে। 
ভৌগোলিকভাবে তুরস্ক ও সিরিয়া ভূকম্পনপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। দেশ দুটিতে প্রায়ই ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু এবার এমন এক পরিস্থিতিতে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগটি ঘটেছে, যখন চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে চলছে সারাবিশ্বে ভয়াবহ মন্দাবস্থা। নিত্যপণ্যের দামের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির উত্তাপ লেগেছে প্রায় সব দেশেই। এর আগে কোভিড-১৯ অতিমারির অভিঘাত তো রয়েছেই।

অবশ্য মানবতার এই মহাবিপর্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়াসহ বিশ্বের প্রায় সব পরাশক্তি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব রকম সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সিরিয়ায় দীর্ঘদিন থেকে সংঘটিত গৃহযুদ্ধের কারণে বলবৎ রয়েছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা। দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থাও রীতিমতো সঙ্গীন। তবু এই চরম দুঃসময়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হবে সব ভুলে গিয়ে তুরস্ক ও সিরিয়ার ভূমিকম্প কবলিত দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো। খাদ্যপণ্য, তাঁবুসহ উদ্ধার তৎপরতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। এ বিষয়ে কোনো দেশের দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয়, প্রত্যাশিতও নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তুরস্কের এই দুর্যোগে আন্তরিক সমবেদনা ও সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেছেন ইতোমধ্যে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের বিষয়টিও তুলে ধরা দরকার। বাংলাদেশের অন্তত ১৩টি এলাকা রয়েছে সমূহ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে। সর্বাধিক তীব্র ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে তিন পার্বত্য জেলা ও সিলেটের জৈন্তাপুর। এসব এলাকা ঢাকা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে হলেও আত্মপ্রসাদের অবকাশ নেই। কেননা, এসব স্থানে ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে তার আঘাত এসে লাগবে ঢাকাতেও। বাস্তবে ঢাকার বহুতল ভবন ও সুপার মার্কেটগুলো ভূমিকম্প সহনীয় করে গড়ে তোলা হয়নি।

অগ্নি-নির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলাসহ উদ্ধার তৎপরতার সরঞ্জাম এবং যন্ত্রপাতি প্রায় নেই বললেই চলে। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় যতটুকু করণীয়, সেসব সংগ্রহে জরুরি ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর জন্য জরুরি উদ্যোগ ও অর্থ বরাদ্দ করা বাঞ্ছনীয় এখন থেকেই। কেননা, আধুনিক বিজ্ঞান আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত সম্পর্কে পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হলেও ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের বিষয়টি এখনো থেকে গেছে অজানা।

×