ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

অভিমত ॥ এসএসসি ২০১৮-এর পরীক্ষা এবং ‘ফাঁকির রেজাল্ট’

প্রকাশিত: ০৬:০১, ২ এপ্রিল ২০১৮

অভিমত ॥ এসএসসি ২০১৮-এর পরীক্ষা এবং ‘ফাঁকির রেজাল্ট’

গত ২২.০৩.২০১৮ তারিখের দৈনিক জনকণ্ঠে সাংবাদিক স্বদেশ রায় একটি মূল্যবান উপসম্পাদকীয় লিখেছিলেন। তার পরামর্শগুলো সংশ্লিষ্ট সকলেই গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিলে সমস্যাটি থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হতে পারে। তবে সে পরামর্শগুলো এইচএসসি-২০১৮ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে। সরকারও সে পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিরোধের জন্য নতুন টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করছেন। সেটাই স্বাভাবিক কারণ পরীক্ষাটি এখন দরজায় কড়া নাড়ছে। সরকারের প্রচেষ্টা সফল হোক- এটাই কাম্য। কিন্তু এসএসসি-২০১৮ এর পরীক্ষার কী হবে? তাকে কি স্বদেশ রায় কথিত ‘ফাঁকির রেজাল্ট’ দিয়ে সমাধান খোঁজা হবে? পরীক্ষার শুরুতে তো শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, প্রশ্ন ফাঁস হলেই পরীক্ষা বাতিল। এখন তিনি আর তার কথার অনুগত থাকতে চাচ্ছেন না মনে হয়। নৈতিকতা প্রবর্তনের মন্ত্রণালয়ের শীর্ষে থাকা একজন মানুষ যদি এ রকম অনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে গোঁজামিল খোঁজেন, তাহলে আমাদের কচি বাচ্চাদের মনে আর নৈতিক কোন জ্বালানি অবশিষ্ট থাকবে কি? ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে মন্তব্য করেছেন, প্রশ্ন ফাঁস আমাদের সমাজের অবক্ষয়ের বড় প্রমাণ। এই ‘বড় প্রমাণ’-এর বড় রাস্তা যদি একজন বড় মানুষ প্রশস্ত করেন তাহলে বাচ্চারা কি সে পথেই হাঁটবে না? একুশে ফেব্রুয়ারির অমর গানের রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী গত মাসে এক নিবন্ধে বলেছিলেন, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ নীতিভ্রষ্ট। তাহলে এই নীতিভ্রষ্টতার জয়রথ যে এগিয়ে চলছে তা কে থামাবে? সরকার হয়ত ভাবছে জাতীয় জীবনে যে সব আলোড়িত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে সে সব ঘটনার ঝাটই মানুষের স্মৃতি থেকে তা মুছে দেবে। মানুষের স্মৃতি আর কত বিষয় বহন করবে? খালেদা জিয়ার কারাবাস আছে। নিদাহাস ট্রফিতে বাংলাদেশের গৌরব ও লজ্জা আছে। জাফর ইকবালের ওপর হামলা হয়েছে। নেপাল ট্র্যাজেডি আছে। বিএনপির নির্বাচনী আন্দোলন ও অভিমান আছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে বাংলাদেশের অভিযাত্রা আছে। এই অভিযাত্রা রুখে দেয়ার জন্য দেশ বিদেশে ষড়যন্ত্রের গাঁটছড়া আছে। এসব হাজার বিষয় এসে এসএসসিতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা কি মানুষের মন থেকে মুছে দেবে না? কিন্তু এহো বাহ্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ফুরায় যাহা, ফুরায় শুধু চোখে। সবই আড়ালে থেকে যায়। এভাবে কোন কিছুই নিঃশেষিত হয় না। কোন স্খলন যদি হয়েই যায়, তবে তার প্রায়শ্চিত্ত করা ছাড়া মুক্তি নেই। প্রায়শ্চিত্তে দোষ কিসের? আসলে এসএসসি-২০১৮ পরীক্ষায় সারাদেশে যে নৈতিক ভূমিকম্প হয়ে গেল তার ফাটল থেকে বের হওয়ার একটাই উপায়, তাহলো শিক্ষামন্ত্রী ঘোষিত পরীক্ষা বাতিল। কিন্তু পরীক্ষার্থীরা যে কষ্ট করে প্রস্তুতি নিয়েছে তা তো ভুলে গেলে চলবে না। তাহলে উপায় কী? উপায় একটাই। এমসিকিউ অংশের পরীক্ষা বাতিল করে প্রশ্নের মান পুনর্বন্টন করা। একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে কথাটা বলি। যদি জীববিজ্ঞানকে বিষয় হিসেবে ধরি তাহলে তাতে নম্বরের বিদ্যমান মান বণ্টন হলোÑ এমসিকিউ-২৫, রচনামূলক-৫০, ব্যবহারিক-২৫, মোট-১০০ নম্বর। প্রস্তাবিত পুনর্বিন্যস্ত মানবণ্টন অনুযায়ী নম্বর সাজানো হতে পারে এভাবেÑ রচনামূলক-৭৫, ব্যবহারিক-২৫, এমসিকিউ-০, মোট-১০০ নম্বর। কারণ এমসিকিউ তো বাতিলই ধরা হচ্ছে। এখন রচনামূলক অংশে যদি কেউ বিদ্যমান ৫০-এর মধ্যে ৩০ নম্বর পায় তাহলে প্রস্তাবিত বিন্যাস অনুযায়ী ৩০ নম্বর বেড়ে গিয়ে হবে ৪৫ নম্বর। কারণ ৫০ ও ৩০-এর আনুপাতিক হার ৭৫-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হলে ৩০ নম্বর হবে ৪৫ নম্বর। এই ৪৫ নম্বরের সঙ্গে প্রাপ্ত ব্যবহারিক নম্বর যুক্ত হলে পরীক্ষার্থীর মেধাভিত্তিক রেজাল্ট পাওয়া যাবে। তাতে যারা পরীক্ষা বাতিলের পক্ষে তাদের দাবি যেমন মানা হবে, আবার যারা পরীক্ষা বাতিলের বিপক্ষে তাদের জন্যও সুব্যবস্থা করা হবে। সর্বোপরি শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের ঘোষণাও বাস্তবায়িত হবে। প্রস্তাবটা কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন। লেখক : গবেষক