ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

ফ্ল্যাটবাসীর নিরাপত্তা

প্রকাশিত: ০৬:০০, ২ এপ্রিল ২০১৮

ফ্ল্যাটবাসীর নিরাপত্তা

পর পর দুটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সংবাদ যে কোন সংবেদনশীল মানুষকেই হতবাক করে দেয়। তবে ওই বিয়োগান্তক দুঃখজনক ঘটনা দুটিকে দুর্ঘটনা বলা হলেও আহত মন সেটি মানতে রাজি নয়। দুটি ঘটনার নেপথ্যে মানুষেরই অবহেলা-উপেক্ষা রয়েছে। আছে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে অপারগ থাকার মনোভাব। অসতর্কতা বা অসচেতনতাকে দোষারোপ করে আমরা আমাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না। রাজধানীতে বাবা-মায়ের সামনেই ত্রুটিপূর্ণ লিফটের দরজার চাপায় প্রাণ হারাল ৯ বছরের শিশু আলভিরা। লিফট ত্রুটিমুক্ত থাকলে দরজাটা বন্ধ হতো না, আর শিশুকন্যাও তীব্র আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হয়ে মারা যেত না। অপরদিকে ময়মনসিংহের ভালুকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে মারা গেছে কুয়েটের ৪ শিক্ষার্থী। ঢাকার ঘটনাটি ঘটে অত্যাধুনিক এ্যাপার্টমেন্টে। আর ভালুকার ঘটনাটিও ঘটেছে আরেকটি অত্যাধুনিক বহুতল ভবনে। এই দুটি ঘটনায় তরুণ প্রাণের মৃত্যু সারা দেশেরই ফ্ল্যাটবাসীর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নগরে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য দেশে ডেভেলপার কোম্পানির অভাব নেই। এদের জমি নির্বাচন ও ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। সে কারণেই তাদের অনেকেরই পরিচিতি গড়ে উঠেছে ‘ভূমিদস্যু’ হিসেবে। দস্যুতা করে যারা ব্যবসায় বিনিয়োগ করে তাদের কাছ থেকে মানবকল্যাণ আশা করা যায় না। আর সে কারণেই তাদের অর্থায়নে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কারিগরি ত্রুটি যেমন থেকে যায়, তেমনি গৃহ নির্মাণসামগ্রী বা উপকরণ ব্যবহারেও এরা দুই নম্বরীর আশ্রয় নেয়। ফলে তাদের তৈরি ভবন হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনগুলো টেকসইও হয় না। যেনেতেনভাবে বাড়ি বানিয়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর বা ভাড়া দিয়ে মুনাফা লোটাই এদের প্রধান উদ্দেশ্য। ফ্ল্যাট বা এ্যাপার্টমেন্ট কালচারে একজন কেয়ারটেকার বা দারোয়ান নিয়োগ দেয়া হয়। তার বেতন-ভাতা মেটাতে ভাড়াটিয়াদের ওপর আরোপ করা হয় সার্ভিস চার্জ। এক্ষেত্রেও অতি মুনাফার মানসিকতা লক্ষ্য করা যায়। এদের প্রতিটি পদক্ষেপই লোক ঠকানো ও মাত্রাতিরিক্ত লোভ। তাই ভবনের লিফট রক্ষণাবেক্ষণে তারা উদাসীনতার পরিচয় রাখে। গ্রিন পিস এ্যাপার্টমেন্টের একাধিক বাসিন্দা সাংবাদিকদের জানান, ১৮০টি ফ্ল্যাটের এই বিশাল এ্যাপার্টমেন্টে এক হাজারেরও বেশি মানুষ বাস করে। তিনটি ভবনের জন্য রয়েছে ৬টি লিফট, তবে সব সময় চালু থাকে একটি। আগে তিনজন লিফটম্যান কাজ করলেও এখন কাজ করছেন একজন। চার হাজার টাকা সার্ভিস চার্জ হিসাবে মাসে ৭ লাখ টাকা উঠলেও মাঝে মাঝেই লিফটের বাটন, সেন্সর কাজ করে না। এ ছাড়া পর্যাপ্ত সিকিউরিটি গার্ড না থাকা, লিফটম্যান ও গার্ড দিয়ে কমিটির লোকজনের বিরুদ্ধে বাজার করানোর অভিযোগও রয়েছে। এটি যে কেবল দুর্ঘটনাকবলিত ভবনের চিত্র তা নয়, এটি এখন বহুতল ভবনের সাধারণ চিত্র, বিরাজমান বাস্তবতা। আসা যাক গ্যাস সিলিন্ডার প্রসঙ্গে। প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডারেরই ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখের পরে ওই সিলিন্ডার ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। কেননা সেটি তখন বিস্ফোরণের ঝুঁকিসম্পন্ন এক বোমায় পরিণত হয়। ভবন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়া যদি বিষয়টি সম্বন্ধে সতর্ক ও সচেতন না থাকেন তাহলে এরকমভাবেই দুর্ঘটনায় ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা নিহত বা আহত হতে থাকবেন। এজন্যই এখন আবাসিক এলাকার বহুতল ভবনের তদারকি ও নজরদারি কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা জরুরী হয়ে পড়েছে। ফ্ল্যাটবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে ভবন ব্যবস্থাপনা এবং তার তদারকি কর্তৃপক্ষের সতর্কতা ও সক্রিয়তা জরুরী। এ ব্যাপারে কোন ধরনের গাফিলতি পাওয়া গেলে ভবন মালিককে আইনের আওতায় এনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে অকালে মানুষের প্রাণ ঝরে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষার উৎকৃষ্ট উপায়।