ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৪ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ধর্ম মন্ত্রণালয় ও সৌদি কর্তৃপক্ষের গাফিলতি

২৮ হাজার হজযাত্রীর মুজদালিফা গমন অনিশ্চিত

আজাদ সুলায়মান

প্রকাশিত: ২৩:০৯, ১৯ এপ্রিল ২০২৪

২৮ হাজার হজযাত্রীর মুজদালিফা গমন অনিশ্চিত

.

এবারের হজে ২৮ হাজার হজযাত্রীর মুজদালিফায় গমন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়, সৌদিতে হজ কাউন্সিল সেখানকার একটি কোম্পানির গাফিলতি অবহেলার দরুন এই জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে এই ২৮ হাজার হজযাত্রী চরম ক্ষুব্ধ। চলতি সপ্তাহের মধ্যে এই জটিলতার নিরসন না করলে তারা প্রয়োজনে ইহরাম বেঁধে রাস্তায় নামার হুমকি দিয়েছেন। জটিলতার দরুন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ওপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাব সভাপতি শাহাদত হোসাইন তসলিম। বলেছেন, হজে যাবেন, অথচ মুজদালিফায় যেতে পারবেন না, এটা কি কল্পনা করা যায়? কোনো হজযাত্রী কি এটা মানবে? এত টাকা দিয়ে হজে যাচ্ছেন, কিন্তু মুজদালিফা না গিয়েই হজ শেষ করতে হবে, এমন খবরে এখন রীতিমতো তোলপাড় চললেও কারোর কোনো চৈতন্যবোধ হচ্ছে না।

জানতে চাইলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. হামিদ জমাদ্দার দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে সত্যিই যদি এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই দেখব।

উল্লেখ্য, হজের তিনটি ফরজ, ৬টি ওয়াজিব। প্রথম ওয়াজিব হচ্ছে- জিলহজ আরাফাতের ময়দানে সারাদিন অবস্থানের পর সন্ধ্যায় সেখান থেকে মুজদালিফায় এসে রাত্রি যাপন করা এবং পাথর সংগ্রহ করা। ওই পাথর দিয়েই পরদিন অর্থাৎ ১০ জিলহজ মীনার মাঠে গিয়ে শয়তানকে লক্ষ্য করে মারতে হয়। অথচ এই ওয়াজিব কাজটি বাদ দিয়েই হজ করতে হবে ২৮ হাজার হজযাত্রীকে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মুজদালিফায় গমন ছাড়াই এসব হজযাত্রীকে হজ করার বিষয়টি প্রথম ফাঁস হয় সম্প্রতি সৌদির সঙ্গে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক জুম বৈঠকে। তখন থেকেই এসব হজযাত্রীর এজেন্সিগুলো দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। তারা বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার তাগিদ দিলেও কোনো সুরাহার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জটিলতা নিরসন না করা হলে বড় ধরনের কেলেঙ্কারির মুখে পড়বে এবারের হজ ব্যবস্থাপনা।

এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব পালন ছাড়াই যদি ২৮ হাজার হজযাত্রীকে হজ করতে হয়-সেটার পরিণতি কতটা মারাত্মক হতে পারে তা নিয়েই উদ্বিগ্ন এদের এজেন্সিগুলো। শুক্রবার পর্যন্ত এই ২৮ হাজার হজযাত্রীর মুজদালিফার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি ঢাকার ধর্ম মন্ত্রণালয় সৌদির বাংলাদেশ হজ কাউন্সিল। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করে গালফ এয়ারের মালিক ফজলে এলাহী দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন, হজ করবেন, অথচ মুজদালিফায় যাবেন না, সেটা কি কোনো হজযাত্রী মেনে নেবেন? কিছুতেই তার যৌক্তিকতা দেখানো মানানো যাবে না। মূলত ধর্ম মন্ত্রণালয় হজ কাউন্সিলের উদাসীনতায় এখনো বিষয়টির সুরাহা করা হয়নি।

বিষয়ে শাবান এয়ারের মালিক মহসীন উদ্দিন দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন, ২৮ হাজার হজযাত্রীই সৌদির হজ সেবা সংস্থা রিফাত কোম্পানির মাধ্যমে  অনলাইনে নিবন্ধিত। এই কোম্পানির অধীনে ৭টি মোয়াল্লেম। তারাই এই ২৮ হাজার হজযাত্রীকে হজসেবা দেবে। এই রিফাতের মোয়াল্লেমরাই ২৮ হাজার হজযাত্রীকে মক্কা থেকে মীনার মাঠ হয়ে আরাফাতে পৌঁছে দেবে। সেখান থেকে মুজদালিফায় নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেটা সম্ভব হবে না। কারণ তাদের বাসের যে রুট নির্ধারিত করা হয়েছে, তাতে মুজদালিফা নির্ধারিত নেই। তাদের বিকল্প পথে সরাসরি আরাফাত থেকে মীনার মাঠে নেওয়া হবে। এজন্যই তারা মুজদালিফা যাবার সুযোগ পাবেন না।

আপনারা কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে তাদেরকে মুজদালিফায় নেওয়া হবে না-এমন প্রশ্নের জবাবে মহসীন উদ্দিন বলেন, রমজানের শুরুতে ঢাকায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ে জুম মিটিংয়ে সৌদি হজ মিশনের কাউন্সিলর জহিরুল ইসলাম কনস্যুলার আসলাম সরাসরি নিশ্চিত করেছেন, রিফাতের নিবন্ধিত ২৮ হাজার বাংলাদেশী হজযাত্রীকে মুজদালিফায় নেওয়ার সিডিউল নেই। এটা রিফাতের ব্যর্থতা বা অবহেলা। মূলত তখন থেকেই আমরা ধর্ম মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য দাবি জানিয়ে আসছি।

মহসীন উদ্দিন বলেন, বৃহস্পতিবার আমি ওমরাহ হজ করে এসেছি। জেদ্দাতে আমি রিফাতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তখন তারা আমাকে জানিয়েছে, এদেরকে মুজদালিফায় নেওয়ার বিষয়টি সমাধানের পথে। কিন্তু বাংলাদেশ হজ মিশন কাউন্সিল থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। ওদের তো কোনো আন্তরিকতা দেখছি না।

বিষয়ে জানতে চাইলে ধর্ম সচিব মো. হামিদ জমাদ্দার বলেন, আমার জানামতে এমন কিছু ঘটেনি। যখন জানতে পারব, তখন  ব্যবস্থা নিতে পারব। এটা এমন কোনো সিরিয়াস ইস্যু নয়।

এদিকে ভুক্তভোগী এসব এজেন্সি এবারের হজ ব্যবস্থাপনায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন- এত বড় জটিলতা দেখা দেওয়ার পরও ধর্ম মন্ত্রণালয় নির্বিকার। তারা ব্যস্ত চাকর-বাকরদের হজ পোস্টিং নিয়ে। কার পিয়ন এবার হজের তালিকায় থাকবে, কে বাদ পড়বে গত এক মাস ধরে মন্ত্রণালয় ব্যতিব্যস্ত শুধু এদেরকে নিয়েই। প্রতিবারের মতো এবারও হজপোস্টিং নিয়ে কেলেঙ্কারি চলছে।

জানতে চাইলে হাব সভাপতি শাহাদত হোসাইন তসলিম বলেন, রিফাতের চিঠিতে এই ২৮ হাজার হজযাত্রীর চুক্তিতে সুস্পষ্ট লেখা রয়েছে, নো মুজদালিফা। এখন পর্যন্ত এটাই চূড়ান্ত। এটা অফিসিয়ালি পরিবর্তন করে মুজদালিফা উল্লেখ না করা পর্যন্ত কারোর মুখের কথায় তো বিশ্বাস করে হজযাত্রীদের নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না। রিফাত এটা ঠিক করে দেবে কথা তো গত এক মাস ধরে শুনে আসছি। কিন্তু নিয়ে তো ধর্ম মন্ত্রণালয়, সৌদিতে বাংলাদেশ হজ মিশনকে চিন্তিত বলে মনে হচ্ছে না। তারা তো দিব্যি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। চিন্তা করে দেখুন তো এদেরকে যদি আশ্বাস দিয়ে আরাফাত পর্যন্ত নেওয়া যায়, পরে শেষ মুহূর্তে বলা হলো, মুজদালিফা নেই সিডিউলে তখন সেখানে কি ধরনের পরিস্থিতি হতে পারে। আমরা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সমাধান হজ ফ্লাইটের আগেই করতে হবে। আর না হয় ঢাকাতেই সুস্পষ্ট তাদের জানিয়ে দিতে হবে তাদের ভাগ্যে মুজদালিফা নেই।

আগামী ১৬ জুন জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি সনের পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে। মে হজ ফ্লাইট উদ্বোধন করা হবে। আগামীকাল রবিবার বিমান তাদের হজ ফ্লাইটের সিডিউল ঘোষণা করবে।

×