ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ২৯ চৈত্র ১৪৩০

‘দশ সপ্তাহের সেই ঘটনার জন্য সারাজীবন আমাকে খেসারত দিতে হবে’

প্রকাশিত: ১২:২৪, ৩ মার্চ ২০২৪

‘দশ সপ্তাহের সেই ঘটনার জন্য সারাজীবন আমাকে খেসারত দিতে হবে’

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বিবিসি বাংলা

শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস মনে করেন ২০০৭ সালে বাংলাদেশে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ ভুল ছিলো। সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ইউনূস দাবি করেছেন, তখন সেনা সমর্থিত সরকারের অনুরোধের পরও তিনি সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেন নি। পরবর্তীতে সবার অনুরোধে রাজনৈতিক দল খোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই উদ্যোগটি শুরুর পর দশ সপ্তাহের মধ্যেই সেখান থেকে সরে আসেন তিনি।

অধ্যাপক ইউনূস প্রশ্ন রাখেন, দশ সপ্তাহের সেই ঘটনার জন্য সারাজীবন আমাকে খেসারত দিতে হবে? ওই সময় তিনি যে রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেটির নাম ছিলো ‘নাগরিক শক্তি’।

অধ্যাপক ইউনূস জানান, তার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে। তাতে সাজা হয়েছে। জামিনে আছেন একটি মামলার সাজায়। এর প্রভাব তার ব্যক্তি জীবনেও পড়ছে। ব্যক্তিগত জীবনে সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। আমার স্ত্রী একজন ডিমেনশিয়া রোগী। সে আমাকে ছাড়া কাউকেই চিনতে পারে না। তার দেখাশোনার দায়িত্ব সব আমার। এ অবস্থায় জেলে থাকতে হলে আমার স্ত্রীর কী অবস্থা দাঁড়াবে?বিবিসি বাংলার সম্পাদকের সাথে বিশেষ সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ইউনূস। ছবি: বিবিসি বাংলাঅধ্যাপক ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন, দুর্নীতি দমন কমিশনে অর্থ পাচারসহ যে শতাধিক মামলা রয়েছে তার মধ্যে একটি মামলায় ছয় মাসের কারাদণ্ড হয়েছে। অনেক মামলার বিচার কাজ চলছে এখনো।

তিনি বলেন, আমি কোন প্ল্যান-গ্রোগ্রাম করতে পারছি না। আমি এবং আমার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সবার জন্য এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। গ্রামীণের এসব প্রতিষ্ঠান থেকে তারা কোন বেতন-ভাতা নেন না। তারা অবৈতনিকভাবে কাজ করেন সেখানে।

এসব প্রতিষ্ঠান করতে গিয়ে আমি গেলাম। আমার সংসার গেলো। আমার ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যত গেলো। আমাকে দেখলে লোকে ভয় পায়। আমি আসামি মানুষ।

হামলা করে গ্রামীণের প্রতিষ্ঠান জবর দখল?
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ কল্যাণসহ আটটি প্রতিষ্ঠান জবর দখলের অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেন। ঢাকার মিরপুরের চিড়িয়াখানা রোডে টেলিকম ভবনে ছিলো ওই প্রতিষ্ঠানগুলো।

তখন ওই প্রতিষ্ঠানটি দখলের অভিযোগ করলেও এখন কী অবস্থায় আছে সেটি? বিবিসি বাংলাকে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এখন আমরা এখানে আছি। তবে ভবিষ্যতে কী হবে আমরা জানি না। হঠাৎ করে একদল লোক আমাদের এখানে আসলো। চেচামেচি করে ঢুকলো। নিয়মকানুন কিছু মানলো না। সবাইকে হুকুম দিতে আরম্ভ করলো।

তিনি জানান, তারা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে চিঠি আনার দাবি করে চেয়ারম্যান থেকে সব কিছু পরিবর্তনের কথা বলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভীতসন্ত্রস্ত করে দিয়েছিলো। এর মাধ্যমে তারা এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করলেও মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন ‘দখলে আসা ব্যক্তিদের’ আর এখন ওই প্রতিষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে না।

এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আপাতত তেমন কিছু আমরা চোখে দেখতে পারছি না। ভেতরে থাকলেও থাকতে পারে। আমরা তো জানি না পরের দিন কি হবে।

নোবেলজয়ী গ্রামীণ ব্যাংকের সাথে বৈরিতা কেন?
২০০৬ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল। সেই নোবেল বিজয়ী একটি প্রতিষ্ঠান ও নোবেলজয়ী একজন ব্যক্তির মধ্যে বৈরি সম্পর্ক কেন হলো?

২০১১ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের দায়িত্ব ছাড়েন অধ্যাপক ইউনূস। এর একযুগেরও বেশি সময় পরে গত ফেব্রুয়ারিতে সেই গ্রামীণ ব্যাংক দখলের চেষ্টা চালায় একটি পক্ষ।

অধ্যাপক ইউনূস জানান, বাংলাদেশে নোবেল পুরস্কার আসলো। সবার মনে এত আনন্দ। বহুদিন এই আনন্দ ছিলো দেশের মানুষের মধ্যে। স্মৃতিটা গভীরভাবে গেঁথে গেছে বাংলাদেশের মানুষের মনে। নোবেল তো এমন একটা জিনিস না যে, এটা আমি আবিষ্কার করেছি। পৃথিবীর মধ্যে গ্রহণযোগ্য একটা জিনিস।অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস। ফাইল ফটোক্ষুদ্রঋণের ধারণার মাধ্যমে সারাবিশ্বে সাড়া ফেলে গ্রামীণ ব্যাংক। অধ্যাপক ইউনুসের ক্ষুদ্রঋণ ধারণার কারণে তিনি ও গ্রামীণ ব্যাংক শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জেতে ২০০৬ সালে।

এরপর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন বক্তব্যে অধ্যাপক ইউনূসকে সুদখোর বলেছেন বলেও বিভিন্ন সময় খবর প্রচারিত হয়েছে। এই বক্তব্য নিয়েও সাক্ষাৎকারে কথা বলেন তিনি।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন,আমরা রক্তচোষা। ঠিক আছে আমরা না হয় রক্তচোষা। আমরা ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কাজ শুরু করেছি তখন লোকে বলতো আমরা রক্তচোষা। এখন তো এই ব্যবসা সবাই করছে। সরকারও করছে। সরকার টাকা দিচ্ছে। সরকার নিয়ম নীতি করে দিচ্ছে। এখন কে কার রক্ত চুষছে?

তিনি বলেন, আমাকে বহুবার সুদখোর বলা হয়েছে। খুব কষ্ট লাগে। যে লোকটা বাংলাদেশের জন্য নোবেল পুরস্কার এনে দিলো, তাকে নিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী এমন হেলা করবে, অপমান করবে- এটা তো কারো ভালো লাগার কথা না। এটাতে দেশের মানুষেরও ভালো লাগার কথা না।

একটা কথা বারে বারে বললে মানুষের মনে গেঁথে যাবে তো। মানুষ মনে করবে- লোকটা তো খারাপ লোক। দেশের অনিষ্ট করছে। মানুষ তো আমার দিকে তাকালে বলবে লোকটা সুদখোর, ধরো তাকে।

তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমারও জানতে ইচ্ছা করে কেন তারা এই কথাগুলো বলে। এটা মানুষকে হেয় করা ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য তো দেখি না।

অন্য ব্যাংকগুলোর সাথে গ্রামীণ ব্যাংক সুদের হারের পার্থক্য তুলে ধরেন তিনি। বলেন, 'গ্রামীণ ব্যাংকের ৭৫ শতাংশ মালিকানা তো সদস্যদের। তো সুদ যদি খেয়ে থাকে গরীব মানুষই খাচ্ছে, মহিলারা খাচ্ছে। মাঝখান থেকে আমি সুদখোর হয়ে গেলাম কেন? আমাকে ব্যক্তিগতভাবে কেন সুদখোর বলা হচ্ছে?' প্রশ্ন রাখেন তিনি।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার হলো সর্বনিম্ম। সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব মাইক্রোক্রেডিট অথরিটির কাছে। যেটা সরকারেরই প্রতিষ্ঠান।

ওয়ান ইলেভের ঘটনা নিয়ে যে সব প্রশ্ন
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, সেই সময় সেনাবাহিনী তো আমার কাছেই আসলো। তারা আমাকে বললো, আপনি সরকার প্রধান হবার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারা আমাকে বলেছিলো, বাংলার মসনদ আপনার হাতে। আপনি এটাতে বসেন। আমি বলেছি, নাহ আমি তো বসবো না। আমি তো রাজনীতি করি না। আমি তো রাজনীতির মানুষ না।

তিনি বলেন, বারে বারে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হলো। কখনো ভয় দেখানো হলো, কখনো উৎসাহ দেয়া হলো। এটা মস্ত বড় সম্মানের বিষয়। আমি প্রতিবারই জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছি আমি এই দায়িত্ব গ্রহণ করবো না। তারপরও আসার কথা বললো। কিন্তু আমি আমার অবস্থান পরিবর্তন করবো না বলেই জানিয়েছিলাম।

এমন পরিস্থিতিতে নাগরিক শক্তি নামে একটি দল গঠনের উদ্যোগের কথা তিনি জানান।

তিনি বলেন, আমাকে নানা রকম চাপের মধ্যে ফেলা হলো। তখন আমি সবাইকে চিঠি দিলাম, সবার মতামত নিতে থাকলাম। পক্ষে বিপক্ষে নানা মত আসলো। তখন দলের নাম কী হবে সেটা নিয়ে কৌতুহল ছিলো। তখন আমি একটা নাম দিলাম নাগরিক শক্তি। পরবর্তী একটা সময় বলে দিলাম নাহ আমি আর এই রাজনীতিতে নাই, আমি রাজনীতি করতে চাই না।

সূত্র: বিবিসি।


 

এসআর

×