ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

সিরিজ নির্বাচন ॥ ৯ মার্চ থেকে স্থানীয় সরকারের

শরীফুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২৩:৩২, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সিরিজ নির্বাচন ॥ ৯ মার্চ থেকে স্থানীয় সরকারের

আগামী ৯ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে দেশব্যাপী স্থানীয় সরকারের সিরিজ নির্বাচন

আগামী ৯ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে দেশব্যাপী স্থানীয় সরকারের সিরিজ নির্বাচন। টানা বছরব্যাপী চলবে এ নির্বাচন। সুষ্ঠু ভোটের চ্যালেঞ্জ নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এদিকে উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন। এ নির্বাচনে অংশ নেবে বেশ ক’টি রাজনৈতিক দল। দলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও তৎপর। এবার দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন জমজমাট ও অংশগ্রহণমূলক হবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছে। 
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার দুই মাস পর ৯ মার্চ কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনসহ ২৩৩টি স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যেই তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলেও বিএনপি এখনো হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। তবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ায় বিএনপিও অংশ নিতে পারে। কোনো কারণে কেন্দ্রীয়ভাবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। 
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সর্বজনীন করার জন্যই দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন করলে অন্য দলগুলোও নির্বাচনে বেশি আগ্রহী হবে। এর ফলে সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান জানান, আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক না দেওয়ার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের এ কৌশল বিএনপি নির্বাচনে আসে কি না তা দেখার জন্য। তবে বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনো দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা করেনি। আলোচনায় কোনো সিদ্ধান্ত হলে সবাই জানতে পারবে। 
৯ মার্চ যে ২৩৩টি স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) উপনির্বাচন, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের (মসিক) নির্বাচন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলের নির্বাচন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৮ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিল নির্বাচন এবং তিনটি পৌরসভা যথা পটুয়াখালী, বকশীগঞ্জ ও আমতলীর নির্বাচন, পাঁচটি পৌরসভার যথাক্রমে ত্রিশাল, মুন্সীগঞ্জ, শিবগঞ্জ, কাটাখালী ও তাহেরপুরের মেয়র পদে উপনির্বাচন।

এ ছাড়াও ১০টি পৌরসভার কাউন্সিলর পদে উপনির্বাচন, ১৩টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন, ২১টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচন, ১৪৬টি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে উপনির্বাচন, ২৩টি ইউনিয়নের সংরক্ষিত সদস্য পদে উপ-নির্বাচন, ছয়টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে ও একটি জেলা পরিষদের সদস্য পদে উপনির্বাচন। 
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৯ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য  ২৩৩টি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ১৩ ফেব্রুয়ারি। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ১৫ ফেব্রুয়ারি। রিটার্নিং অফিস থেকে বাতিল হওয়া প্রার্থিতার বিষয়ে আপিল নিষ্পত্তি ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২২ ফেব্রুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দ ২৩ ফেব্রুয়ারি। আর ভোটগ্রহণ ৯ মার্চ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। 
৯ মার্চ ২৩৩টি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর থেকে সারাদেশের ৪৮৫টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন শুরু হবে। এর পর অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হয়ে চলবে টানা বছরব্যাপী। মে মাসের শেষ দিকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন শেষ করতে চায় ইসি। এ নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।

কারণ এ সিদ্ধান্তের পর দলের মনোনয়ন না পেলেও যে কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারবেন। আর সর্বস্তরের নেতাকর্মী নিজ নিজ পছন্দ অনুসারে যাকে খুশি ভোট দিতে পারবেন এবং তার পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। এ কারণে নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছে। 
উল্লেখ্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সব নেতার জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়া উন্মুক্ত রাখায় রেকর্ডসংখ্যক ৬২ আসনে বিজয়ী হয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এরপর নির্বাচন কমিশন উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করার পর বিভিন্ন মহল থেকে দলীয় প্রতীকবিহীন নির্বাচনের দাবি ওঠে। আওয়ামী লীগের কোনো নেতাও এমন দাবি করেন। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সভায় সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রতীক ছাড়া করার সিদ্ধান্ত হয়। দলটির এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করে বিভিন্ন মহল। 
২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন সংশোধন করে দলীয় প্রতীকে ভোটের বিষয়টি যুক্ত করা হয়। আর ২০১৭ সালের মার্চে প্রথমবার তিন উপজেলায় দলীয় প্রতীকে ভোট হয়। তবে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান পদ বাদে বাকি দুটি পদ উন্মুক্ত রাখে। তবে আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে নৌকা প্রতীক না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ।

রাজপথের বিরোধী দল বিএনপিসহ আরও কিছু দল দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিরোধিতা করে আসছে আইন সংশোধনের পর থেকেই। তাই ক্ষমতাসীন দল দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি বিএনপির জন্য নৈতিক জয় বলে দলটির নেতাকর্মীরা মনে করছেন। 
দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকেই নানামুখী সমস্যা দেখা দেয়। যে কারণে বিএনপির পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি তুলে। এ দাবি দিন দিন আরও জোরদার হয়।
রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশ না নেওয়ায় দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। আবার দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহলও বিএনপির প্রতি নাখোশ হয়। ঘরে-বাইরে এমন চাপ থাকায় এবং আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ায় বিএনপি আসন্ন উপজেলা পরিষদসহ সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। নির্দলীয় আমেজে নির্বাচনের পরিবেশ পেলে যে কোনো সময় বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে। 
৯ মার্চ ২৩৩টি স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষে এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত ৫ ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছে ইসি। রোজার আগেই প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে মনোনয়ন না দেওয়ার ঘোষণা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন মনে করে আইন অনুযায়ী দলীয় ও স্বতন্ত্র দুইভাবে মনোনয়ন দেওয়ার নিয়ম আছে। তবে দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন হলে তা বেশি অংশগ্রহণমূলক হবে। 
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। কারণ দেশের সকল উপজেলায় একজন চেয়ারম্যান ও ২ জন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয় এ নির্বাচনে। উপজেলাভিত্তিক সকল উন্নয়ন কর্মকা- তাদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোও এ নির্বাচনকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। দেশে উপজেলা রয়েছে ৪৯৫টি। তবে কিছু জটিলতা থাকায় ১০টি বাদে বাকি ৪৮৫টি উপজেলায় নির্বাচন হবে।

আইন অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদের মেয়াদ হচ্ছে প্রথম সভা থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর। আর নির্বাচন করতে হয় মেয়াদ পূর্তির আগের ১৮০ দিনের মধ্যে। ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেহেতু পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ৫ ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছে তাই শপথও হয়েছে পাঁচ বা তার বেশি ধাপে। যে কারণে উপজেলাগুলোর মেয়াদও ধাপে ধাপে শেষ হবে। আর সে অনুযায়ী ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা করা হবে। 
১৯৮৫ সালে দেশে প্রথমবারের মতো উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর ১৯৯০ সালে দ্বিতীয়বার ও ২০০৯ সালে তৃতীয়বার, ২০১৪ সালে চতুর্থবার এবং ২০১৯ সালে পঞ্চমবার উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনে ১৪টি উপজেলায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হয়। এবারও কিছু উপজেলায় ইভিএমে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 
২০১৯ সালে দেশে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় ৪৮৮টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ৪৫৫টির নির্বাচন যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। বাকি উপজেলাগুলোর নির্বাচন পরে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৯ সালের ১০ মার্চ প্রথম ধাপে ৮২টি উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮ মার্চ দ্বিতীয় ধাপে ১২৩টি, ২৪ মার্চ তৃতীয় ধাপে ১২২টি, ৩১ মার্চ চতুর্থ ধাপে ১০৬টি এবং ১৮ জুন পঞ্চম ধাপে ২২টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

২০১৪ সালে জুন-জুলাই মাসে সাত ধাপে অনুষ্ঠিত হয় ৪৮৬ উপজেলার নির্বাচন। এবারও এপ্রিল মাস থেকে শুরু করে মে মাসের মধ্যে সকল উপজেলা নির্বাচন শেষ করবে ইসি। ফাঁকে ফাঁকে মেয়াদোত্তীর্ণ বিভিন্ন ইউপি ও পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর হবে সারাদেশের সকল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। আর বর্তমান সরকারের আমলে শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হবে জেলা পরিষদ নির্বাচন।

×