ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১

ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন উদ্বোধন করলেন হাসিনা ও মোদি

উন্নয়নে মাইলফলক

​​​​​​​বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩:৩৮, ১৮ মার্চ ২০২৩; আপডেট: ২৩:৪০, ১৮ মার্চ ২০২৩

উন্নয়নে মাইলফলক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে শনিবার বিকেলে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’ সুইচ টিপে উদ্বোধন করেন

ভারত ও বাংলাদেশের নিবিড় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আরেকটি মাইলফলক রচিত হলো। ভারত থেকে  মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল আনতে স্থাপিত ‘ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’ যৌথভাবে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সত্যিকারের এক প্রকৌশল বিস্ময় এই প্রকল্পটি হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রথম আন্তঃসীমান্ত জ্বালানি তেলের মৈত্রী পাইপলাইন।

আসাম রাজ্যের নুমা লিগড় রিফাইনারির শিলিগুড়ি টার্মিনাল থেকে সীমান্তের বর্ডার অতিক্রম করে পাবর্তীপুর ডিপোতে এই মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল আনার কার্যক্রম শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারত থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বোতাম টিপে বাংলাদেশ-ভারত এই মৈত্রী পাইপলাইন উদ্বোধন করেন। ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ডিজেল রপ্তানি করবে ভারত। এতদিন ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করা হতো রেলের ওয়াগনের মাধ্যমে। প্রকল্পটি উদ্বোধন হওয়ায় কৃষিনির্ভর  উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহ সম্ভব হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন দু’দেশের উন্নয়ন ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি মাইফ  লক অর্জন উল্লেখ করে বলেছেন, আমি বিশ্বাস করি, এই ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন আমাদের দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে সহযোগিতা উন্নয়নের একটি মাইলফলক। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে এবং আমরা সারাদেশে একশ’টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলেছি, আমি চাই ভারতের বিনিয়োগকারীরাও এখানে এসে আরও বিনিয়োগ করবে। আমরা দু’দেশই তাতে লাভবান হব।

জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রকল্পের উদ্বোধনকালে বলেন, এই বন্ধুত্বপূর্ণ পাইপলাইন দু’দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। গত কয়েক বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ নিয়ে প্রত্যেক ভারতীয় গর্বিত। বাংলাদেশের এই উন্নয়ন অভিযাত্রায় ভূমিকা রাখতে পেরে আমরা (ভারত) আনন্দিত। এই যৌথ প্রকল্প বাংলাদেশের সোনার বাংলা গড়ার ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

ভারতীয় লাইন অফ ক্রেডিট (এলওসি) থেকে নেওয়া প্রায় ৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ভারতীয় রুপি ব্যয়ে নির্মিত ১৩১ দশমিক ৫ কি.মি ভারত-বাংলাদেশ  মৈত্রী পাইপলাইনের (আইবিএফপিএল) মাধ্যমে বাংলাদেশে ডিজেল রপ্তানি করবে ভারত। ভারতের শিলিগুড়ির নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে ১৩১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর ডিপোতে ডিজেল আমদানি করা হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে পড়েছে ১২৬ দশমিক ৫৭ কি.মি. এবং ভারতের অংশে ৫ কি.মি.। পাইপলাইনটির হাই-স্পিড ডিজেল (এইচএসডি)-এর বার্ষিক পরিবহনের ক্ষমতা ১ (এক) মিলিয়ন মেট্রিক টন (এমএমটিপিএ)।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা বলেন ॥ প্রকল্পটির উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করে বলেন, ভারত-বাংলাদেশ পাইপলাইনের মতো আগামী দিনেও আরও সফলতা বাংলাদেশ-ভারত উদযাপন করবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আমরা একইসঙ্গে কাজ করব। এই পাইপলাইনের সুফলের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ চালুর ফলে দুই দেশের জনগণ নানাভাবে উপকৃত হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে যখন বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। এই পাইপলাইনটি আমাদের জনগণের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে সেটাকে আমরা কার্যকর করতে চাই। আর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা আরও উন্নত করতে চাই যাতে ভারতের সঙ্গে আমাদের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে দুই দেশের জনগণের সার্বিক উন্নয়ন ও কল্যাণে আমরা একসঙ্গে কাজ করে যেতে পারি, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। কারণ আমরা চাই আমাদের দেশের এই উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হোক। সেই সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর, সিলেট ও চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দরটাকে আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে উন্নত করে দিচ্ছি এবং ভারতের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিচ্ছি যাতে এই বন্দর ব্যবহারে ভারতের কোনো অসুবিধা না হয়। এর ফলে ব্যবস্থা-বাণিজ্য আরও সহজ হবে এবং দুই দেশের মানুষই লাভবান হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পাইপলাইনে ভারত থেকে ডিজেল আমদানিতে ব্যয় ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। উত্তরাঞ্জলের ১৬ জেলায় ডিজেলের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং আমি, আমরা ভার্চ্যুয়ালি এই প্রকল্পের কাজ শুরু করি। ১৩১ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের অংশে পড়েছে ১২৬ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার, ভারতের অংশে ৫ কিলোমিটার।

প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু, ভাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আমাদের হাজার বছরে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবাধ প্রবাহ। ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক সেতুবন্ধ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর করেছে। ক্রমাগত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সহযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনাকে আমরা বাস্তবে রূপদান করেছি। আমাদের দুই দেশের মধ্যে সমস্যগুলো একে একে আমরা সমাধান করেছি। যোগাযোগ স্থাপন করেছি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার আমরা ঘটিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা উন্নয়নে এক সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি এবং ভারতের কাছ থেকে বিভিন্ন সহযোগিতা পাচ্ছি। সেইসঙ্গে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা ও উভয় দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি। দুই দেশের জনগণের কল্যাণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে পারস্পরিক সহযোগিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের দুই দেশের বন্ধুত্ব অটুট থাকুক সেটাই আমরা চাই। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে সেটাকে আমরা কার্যকর করতে চাই।

সরকারপ্রধান আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ঠিক রেখে দুই দেশের জনগণের সার্বিক উন্নয়নে আমরা কাজ করে যেতে চাই। আমরা চাই আমাদের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হোক। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশে একশ’টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি। আমি চাই ভারতের বিনিয়োগকারীরাও এখানে বিনিয়োগ করুক। আমরা দুই দেশই তাতে লাভবান হব। ভারত থেকে বাংলাদেশের ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে উপআঞ্চলিক পর্যায়সহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার আরও কয়েকটি উদ্যোগ বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কৃতজ্ঞ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরকার এবং জনগণ অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল। শুধু তাই না এক কোটি বাঙালি শরণার্থীকে স্থান দেওয়া, খাবারের ব্যবস্থা, চিকিৎসার ব্যবস্থা, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেওয়া এবং অস্ত্র দেওয়া এসব সহযোগিতা ভারতের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি। ভারত-বাংলাদেশ  মৈত্রী বাহিনীর অভিযানে আমরা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করি।

১৯৭৫ সালের পর ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতের সরকার ও জনগণের কাছে ঋণী। আমরা দুই বোন তখন ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমাদের আরও আত্মীয় স্বজন যারা বেঁচে গিয়েছিল তারাও ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। কাজেই আমি ভারতের কাছে, ভারতের জনগণের কাছে, সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী এ সময় ভারত বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের  মতো আগামী দিনেও আরো সফলতা বাংলাদেশ-ভারত যৌথভাবে উদযাপন করবে এ্বং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে একইসঙ্গে কাজ করারও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী যা বলেন ॥ ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে আজ একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এর উদ্বোধন করতে পেরে আমি আনন্দিত। আরও সন্তুষ্টির বিষয় হচ্ছে, করোনা মহামারির সময়েও এই প্রকল্পের কাজ চলমান ছিল। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে ১ মিলিয়ন মেট্রিক টন হাইস্পিড ডিজেল  পৌঁছানো যাবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ খরচ তো কমবেই, একইসঙ্গে এই সরবরাহে কার্বন নিঃসরণও কম হবে। বিশ্বস্ত ডিজেল সরবরাহ কৃষিক্ষেত্রের জন্য লাভজনক হবে। স্থানীয় ব্যবসাও এর মাধ্যমে লাভবান হবে। আজকের বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক উন্নত অর্থ ব্যবস্থাও টিকে থাকার লড়াই করছে। এই কারণে আজকের আয়োজনের মহত্ত্ব আরও বেশি।

গত কয়েক বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছে উল্লেখ করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, এতে প্রত্যেক ভারতীয় গর্বিত। আমরা আনন্দিত যে, আমরা বাংলাদেশের এই উন্নয়ন যাত্রায় অবদান রাখতে পেরেছি। আমার বিশ্বাস, এই পাইপলাইন বাংলাদেশের উন্নয়নে আরও গতি এনে দেবে এবং ২  দেশের মধ্যে বেড়ে চলা যোগাযোগের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে। যোগাযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে দু’দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমার মনে আছে, বেশ কয়েক বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেল  যোগাযোগ বাড়ানোর ভিশন নিয়ে কথা বলেছিলেন। তখন থেকেই দুই দেশ মিলে এর অনেক উন্নতি করেছে। এর কারণে করোনা মহামারির সময়েও আমরা বাংলাদেশকে অক্সিজেন পাঠাতে পেরেছি। তাঁর এই দূরদৃষ্টির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা খুবই সফল। আজ ভারত বাংলাদেশকে ১ হাজার ১০০ এর বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ারপ্লান্টের প্রথম ইউনিটও চালু হয়ে গেছে। গত বছর প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় আমরা এর উদ্বোধন করেছিলাম। এর দ্বিতীয় ইউনিটও দ্রুত চালু করার কাজও আমরা করে যাচ্ছি।

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন প্রকল্পটি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার যে ভিশন, তার একটি ‘উত্তম উদাহরণ’ বলেও মন্তব্য করেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে থাকায় আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। সেই সঙ্গে এই প্রকল্প থেকে লাভবান হতে যাওয়া সবার জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা।’

প্রকল্পটি সত্যিই এক প্রকৌশল বিস্ময় ॥ এদিকে, পার্বতীপুর থেকে আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা শ আ ম হায়দার জানান, ভারতের আসাম জ্যের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নুমালিগড় রিফাইনারির শিলিগুড়ি মাকেটিং টার্মিনাল থেকে সীমান্তের বর্ডার অতিক্রম  করে বাংলাদেশের  বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে পঞ্চগড়, নীলফামারী, দিনাজপুর হয়ে পার্বতীপুর ডিপোতে সংযুক্ত হয়েছে পাইপটি। প্রকল্পটি সত্যিকারের এক প্রকৌশল বিস্ময়। এটি বাস্তবায়নে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে ঠিকই, তবে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগীতা এবং প্রযুক্তিগত বোঝাপড়ার কল্যানে আন্তজার্তিক এ  প্রকল্পটি আলোর মূখ দেখেছে। অসম্ভব  কাজটি একমাত্র  সম্ভব হয়েছে  বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শীতা ও বন্ধুপ্রতিম দুই দেশের নিবিড় বন্ধুত্বের কারনে।  যা দক্ষিন এশিয়ার দুই দেশের সেরা সম্পর্কের প্রমান হয়ে থাকবে। এ মন্তব্য করেছেন দুই দেশের বিদগ্ধজন ।

প্রকল্প উদ্বোধনের আগে ১০ মার্চ শুক্রবার রিসিভ টার্মিনাল পরিদর্শন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তার আগের দিন ৯ মার্চ আসেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. খায়েরুজ্জামান, বিপিসির চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী সে সময় জানিয়েছেন, রিসিভ টার্মিনালের কন্ট্রোল রুমটি সবচেয়ে অত্যাধুনিক, কম্পিউটারাইজ ও অটোমেটেড। যা যুক্ত হেড অফিসের সঙ্গে। দপ্তরে বসেই মোবাইলে পাইপ লাইনের তেলের পরিস্থিতি অবলোকন করা যাবে। মাঠ পর্যায়ে পাইপ লাইনের কেউ ক্ষতির চেষ্টা করলে তা কন্ট্রোল রুমে ধরা পড়বে।  পাইপ লাইনের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ অংশে ১২৬ কিলোমিটার দূরত্বে  প্রতি ৩০ কিলোমিটারে ৫টি এসভি স্টেশন  সেকশনালইজিং ভালভ ) স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি জানান, আমরা ভারতকে যে মানের নমুনা দিয়েছি সেভাবেই ১০ পিপিএম  উন্নতমানের  রিফাইন ডিজেল আসবে। মূলত কৃষিপ্রধান উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় নিরিবিচ্ছন্নভাবে ও সারাবছর ডিজেল সরবরাহ রাখতেই এই ফ্রেন্ডশিপ পাইপ লাইন ভূমিকা রাখবে। আগে খুলনা ও চট্রগ্রাম থেকে রেল ওয়াগনের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে তেল পরিবহনের সময় যে অনাকাক্সিক্ষত দূর্ঘটনা ঘটত এই পাইপ লাইন চালু হলে তার অবসান হবে। জ¦ালানি নিরাপত্তায়  ইন্দো-বাংলা ফ্রেন্ডশিপ পাইপ লাইন কার্যকর অবদান রাখবে। সাশ্রয়ী উপায়ে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলে জ¦ালানি সরবরাহে এটি একটি মাইলফলক হবে বলেও মন্তব্য করেন করেন তিনি।

পাইপ লাইনের মাধ্যমে আমদানি করা ডিজেল সংরক্ষণের জন্য পার্বতীপুর রিসিভ টার্মিনাল সাইডে ২৯ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার একটি বাফার ডিপো নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ১০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা রয়েছে। বিপিসির সূত্র জানায়, চুক্তি অনুযায়ী ভারত ১৫ বছর ডিজেল সরবরাহ করবে। প্রথম তিন বছর দুই লাখ মেট্রিক টন, পরবর্তী তিন বছর তিন লাখ মেট্রিক টন ও এর পর চার বছর ৫ লাখ মেট্রিক টন, অবশিষ্ট ৫ বছরে ১০ লাখ মেট্রিক টন তেল সরবরাহ করবে। এরপর চুক্তি নবায়ন নবায়ন করা হবে। নবায়ন না হলে  পাইপ লাইনের মালিকানা বাংলাদেশের কাছে থাকবে ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন,  আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল আনতে প্রতি ব্যারেলের প্রিমিয়াম প্রাইস পড়ে ১১ ডলার। এ পাইপ লাইনের মাধ্যমে খরচ পড়বে ৫ দশমিক ৫০ ডলার। অর্থাৎ প্রায় ৬ ডলারের মত প্রিমিয়াম সাশ্রয় হবে। বর্তমান ব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে  বড়বড় জাহাজে তেল চট্রগ্রাম বহিনোঙরে আসে। সেখান থেকে ছোট ছোট জাহাজে খুলনা দৌলৎপুরে আসে । তারপর ব্রডগেজ লাইনে আনা হয় পার্বতীপুর ডিপোতে। রেলপথে চট্রগ্রাম থেকে তেল আনতে প্রাকৃতিক দুযোর্গে পড়ে সমস্যা সৃষ্টি হয় অনেক সময়। সরাসরি আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন দিয়ে এসব ঝামেলা ছাড়াই তেল নেওয়া যাবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ জানান, ভারত সরকার এই পাইপ লাইনের অবকাঠামো নির্মাণ করে দিয়েছেন। আমরা পাইপ লাইনের জন্য ভূমি বরাদ্দ ও রিসিভ ট্যাংক নির্মাণ করেছি। পাইপ লাইনের মধ্যে বাংলাদেশ অংশে ১২৬ কিলোমিটার ও ভারত অংশে ৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার। পার্বতীপুর শহরের অদূরে রেল হেড ডিপো সংলগ্ন ৬ দশমিক ৮০ একর জমিতে রিসিপ্ট টার্মিনালটি নির্র্মাণ করা হয়েছে। নির্মান কাজ করেন মেসার্স দীপন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড এবং ওয়েল ডিপোর কাজ করেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স পাইপ লাইনার্স লিমিটেড। ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থা নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড এবং বাংলাদেশের মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড যৌথভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করেছেন।

×