ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৪ মার্চ ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০

উত্তাপ ছড়াচ্ছে সিলেট সিটি নির্বাচন

সালাম মশরুর, সিলেট অফিস

প্রকাশিত: ২৩:১১, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩

উত্তাপ ছড়াচ্ছে সিলেট সিটি নির্বাচন

সিলেট সিটির মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী শুক্রবার টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন

 সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী জুন মাসে। চলতি বছর অক্টোবর মাসের দিকে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যেই ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীরা সারা বছর মাঠ গোছানোর চেষ্টা করেছেন। দলের হাই কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে চেয়েছেন গোছানোর। রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকা-ের মাধ্যমে প্রার্থীরা থাকছেন ভোটারদের কাছাকাছি।

এবার সিলেট সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে যাদের নাম শোনা যায় তাদের মধ্যে আছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসাদ উদ্দিন, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মিজবা উদ্দিন সিরাজ প্রমুখ। জানা গেছে, ইতোমধ্যে আনোয়রুজ্জামান চৌধুরীকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে হাই কমান্ড গ্রীন সিগনাল দিয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। শুক্রবার টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম, কানাডা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সরওয়ার হোসেন, সিলেট বিভাগ আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোস্তাক হোসেন, যুক্তরাজ্য ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক সজিব ভুইয়া প্রমুখ।  
বিএনপির প্রার্থী বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবার মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন না বলে দলের ভেতরে বাইরে গুঞ্জন রয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির সিলেট মহানগরের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। কাউন্সিলের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে মহানগরের বিএনপি থেকে মেয়র পদে কে মনোনয়ন পাবেন। মহনগরের কাউন্সিলে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মুক্তাদির এবং বর্তমান মেয়র  আরিফুল হক চৌধুরী এই দুই বলয়। দুই বলয়ের সভাপতি পদে প্রার্থী হতে পারেন মহানগর কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম ও আহ্বায়ক কমিটির প্রথম সদস্য নাসিম হুসাইন। এর বাইরে আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পঙ্কিও প্রার্থী হতে পারেন। বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে কাউন্সিলের পরেই হবে মেয়র পদের নির্বাচন হবে। দল থেকে মনোনয়ন কে পাবেন এটাও  এই বলয় থেকেই নির্ধারিত হতে পারে।
এখনো নির্বাচনের বেশ কিছু সময় বাকি। নির্বাচনী তৎপরতাও চলছিল ঢিলেঢালা ভাবে। হঠাৎ গত সপ্তাহে নির্বাচনী  মাঠ  উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র পদটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দখলেই ছিল। তখন দলটির ভরসা ছিলেন প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। এরপর দলীয় অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় সেটি হাতছাড়া হয়ে যায়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছিল, মেয়র পদে প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের বিকল্প হিসেবে আওয়ামী লীগ আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকেই ভাবছে। এবার তা নিশ্চিত হলো।  গত ২৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দলীয় সভাপতির সঙ্গে সাক্ষাতের পরই সিলেটে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংবাদটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মেয়র পদের জন্য আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকেই গ্রীন সিগনাল দেওয়া হয়েছে। এর আগে তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন দলীয় সাধারণ সম্পাদক, সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে। আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী শুধু যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতাই নন, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবেও সিলেটের রাজপথের পরিচিত মুখ। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তিনি সিলেটের রাজনীতিতে সবসময়ই সম্পৃক্তা। সিলেট-২ (ওসমানীনগর-বিশ্বনাথ) আসনের সর্বস্তরের জনগণের অত্যন্ত প্রিয়মুখ আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। সিলেট মহানগরীতেও তার অনুসারী দলীয় নেতাকর্মী এবং রাজনীতির বাইরের সাধারণ মানুষের সংখ্যা প্রচুর। এসব কিছুর যোগফল হিসেবেই সিলেটের মেয়রের পদটি পুনরুদ্ধারে আওয়ামী লীগ হয়তো আনোয়ারুজ্জামন চৌধুরীর ওপরই নির্ভর করছেন।
বিএনপির প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী ২০১৮ সালের নির্বাচনে কামরানের ১৭ বছরের সাম্রাজ্য তছনছ করে দিয়েছিলেন। হাতছাড়া হয়ে যাওয়া নগর ভবন আবারও নিজেদের কর্তৃত্ব ফিরে পেতে চায় আওয়ামী লীগ। বিএনপি চায় নগর ভবনের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে। যে কারণে বড় দুই দলের কাছেই নির্বাচন অনেকটা মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
২০১৮ সালের ১০ জুন নির্বাচনে  সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী, সিপিবি-বাসদের প্রার্থী আবু জাফর, স্বতন্ত্র হিসেবে মহানগর জামায়াতের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সদস্য ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন খান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এহছানুল হক তাহের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।  সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হলেও শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দঁড়ান। এরপর থেকে তাকে আর নির্বাচনী মাঠে দেখা যায়নি।
সিলেট পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৭৮ সালে এবং সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয় ২৮ জুলাই ২০০২ সালে।  ৩১ আগস্ট ২০২১ সালে বাংলাদেশ গেজেট এসআর ও নং-২৮৮-আইন/২০২১ দ্বারা সিলেট সদর উপজেলার ০৪টি ইউনিয়ন যথাÑ টুকেরবাজার, খাদিমনগর, খাদিমপাড়া ও টুলটিকর ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ০৩টি যথা কুচাই, বরইকান্দি ও তেতলী ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত করে সিলেট সিটি করপোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে সিলেট সিটি করপোরেশনের আয়তন ৭৯.৫০ বর্গকিলোমিটার।
সিটির মোট জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ, মোট ভোটার ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২। ২০১৮ সালের নির্বাচনে  বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ৯২,৫৮৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান পেয়েছিলেন ৮৬, ৩৯২ ভোট। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। সাধারণ মানুষের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই নেতার মৃত্যুর পর আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মহানগর আ’লীগ নেতা আসাদ উদ্দিন আহমদ, বিজিত চৌধুরী, জাকির হােসেন, আজাদুর রহমান আজাদের নাম শোনা যাচ্ছিল। তবে রবিবার আনোয়ারুজ্জামানকে বিপুল সংবর্ধনার পর হিসেব-নিকেশ পাল্টে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকটা কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
ক্লিন ইমেজের রাজনীবিদ আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ছাত্র জীবন থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কলেজ জীবনে তিনি তৎকালীন বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সমাজসেবা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সিলেট সরকারি কলেজছাত্র লীগের রাজনীতি করেন তিনি। এরপর তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সেখানে গিয়েও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী থেমে থাকেননি। জড়িদয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে। বর্তমানে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী প্রথম শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। যুক্তরাজ্যে রাজনীতির সঙ্গে  সঙ্গে প্রবাসীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে তিনি সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি নাড়ির টানে সব সময় দেশের রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। খোঁজ রাখেন সাধারণ কর্মী থেকে সাধারণ মানুষের। একজন কর্মিবান্ধব নেতা হিসেবে পরিচিত আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী দিনে দিনে হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষের নেতা। বিশেষ করে করোনাকালে সিলেটজুড়ে তার ভূমিকা ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এই নেতা তাই সাধারণ মানুষের কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন।

 

×