ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

নদীর পানি বৃদ্ধি ১৮ বছরে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টায় পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা নগরীর বাড়িঘর ও দোকানে পানি বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুত নেই

সিলেটে রেকর্ড বন্যা

প্রকাশিত: ২৩:০২, ১৯ মে ২০২২

সিলেটে রেকর্ড বন্যা

সালাম মশরুর, সিলেট অফিস ॥ ১৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বন্যার কবলে এখন সিলেট। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ২০০৪ সালের পর সিলেটে নদীর পানি কখনও এতটা বাড়েনি। আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, ২৩ জুন পর্যন্ত সিলেটে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া ভারতের মেঘালয় রাজ্যে বৃষ্টি কমছে না। তাই পাহাড়ী ঢলের পানিতে আমাদের দেশে পানি বাড়ছে। এদিকে সুরমা নদীর পানি উপচে সিলেট নগরীর দুই তীরের ঘরবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকেছে। নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা কালিঘাটের শত শত দোকান ও গুদাম পানিতে তলিয়ে গেছে। কালিঘাটের বৃহত্তম আড়তসহ গুদামে থাকা প্রায় চার হাজার বস্তা চাল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন আলকাস ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে আবহাওয়া অধিদফতর। একইসঙ্গে ভারি বর্ষণ ও কালবৈশাখীর আশঙ্কা রয়েছে। এতে এই অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। সীমান্তবর্তী কানাইঘাটে সুরমা নদীর পানি সামান্য হ্রাস পেলেও সিলেট পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়েছে। সিলেটের বিভিন্ন উপজেলাসহ নগরীর বেশিরভাগ মানুষ এখন পানিবন্দী। আকস্মিক এই বন্যায় মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। গ্রামগুলোর রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের যাতায়াত ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পানিবন্দী এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সঙ্কট বিরাজ করছে। সিলেটে বন্যায় বিদ্যুতহীন দেড় লাখ গ্রাহক ॥ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটের দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দি বিদ্যুত উপকেন্দ্রে বন্যার পানিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিদ্যুত ব্যবস্থা। নগরসহ বিভিন্ন উপজেলার বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুত সমিতির প্রায় সাড়ে ১১ লাখ গ্রাহকের মধ্যে দেড় লাখ গ্রাহক বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে। সিলেট বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ এবং সিলেট পল্লী বিদ্যুত সমিতি-১ ও ২-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। বন্যা পরিস্থিতির কারণে সিলেট বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের দুটি উপকেন্দ্র ও পল্লী বিদ্যুত সমিতির দুটি উপকেন্দ্রে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে চারটি উপকেন্দ্রের গ্রাহকদের বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। সিলেটে অকাল বন্যায় দুর্ভোগে পড়া মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বন্যা দুর্গত এলাকাগুলো পরিদর্শনে বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি বিমানের একটি ফ্লাইটে সিলেট এসে পৌঁছেন। তাঁর সঙ্গে আছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মোঃ এনামুর রহমান এমপি। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি ছুটে যান বন্যাকবলিত সিলেট নগরীর চালিবন্দর এলাকায়। সেখানের আশ্রয়কেন্দ্রে তিনি বন্যার্তদের মাঝে শুকনো ও বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন। দিনভর পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্লাবিত সিলেট মহানগরী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন এবং ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সুপারিশে সিলেট জেলার বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোর বন্যার্ত মানুষের মাঝে নগদ ১০ লাখ টাকা, ১০০ মেট্রিক টন চাল ও ৩০০ ব্যাগ শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে ত্রাণ মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৭ মে এ সংক্রান্ত সুপারিশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মোঃ এনামুর রহমান এমপি বরাবরে জানালে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের উপ-পরিচালক (ত্রাণ-১) সিলেটের জন্য এসব বরাদ্দ পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন সংশ্লিষ্টদের। এ ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেট সদর উপজেলার বন্যার্ত মানুষের জন্য বিশেষ বরাদ্দের সুপারিশ করেন। ওই সুপারিশপত্রে তিনি বলেন- ‘আমার নির্বাচনী এলাকা সিলেট-১ সদর উপজেলাধীন ৭টি ইউনিয়নে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের কারণে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আকস্মিক এই বন্যায় জালালাবাদ ইউনিয়ন ৯৫%, হাটখোলা, মগোলগাঁও ইউনিয়ন ৮৫%, কান্দিগাঁও, খাদিমনগর ইউনিয়নের ৮০%, টুকেরবাজার ৬০%, খাদিমপাড়া ইউনিয়নের ৪০% বাড়ি ও রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ২৫ হাজার পরিবার পানিতে প্লাবিত অবস্থায় রয়েছে। ৩৩টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সকল ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যায় ৭টি ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার পরিবার ও আনুমানিক ৭১টি গ্রাম বিধ্বস্ত অবস্থায় রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় খাদ্যসহ অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সুপারিশ পেয়েই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শুধু সিলেট সদর উপজেলার বন্যাকবলিত মানুষের জন্য আলাদাভাবে ১ হাজার ব্যাগ শুকনো ও অন্যান্য খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়। সিলেট জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের এসব বরাদ্দ দ্রুত বণ্টন বা বিতরণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের পক্ষ থেকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। বুধবার জকিগঞ্জে নতুন করে কুশিয়ারা নদীর বড়চালিয়া, সুপ্রাকান্তি ও রারাই গ্রামে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গ্রামের ভেতর পানি প্রবেশ করেছে। জেলার কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাট থানা সদরসহ বিভিন্ন হাট বাজারে এখনও হাঁটু থেকে কোমর পানি বিরাজ করায় অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাটও বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার তিন ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে উপজেলার লামাকাজী, খাজাঞ্চী ও অলঙ্কারী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, হাট-বাজার, মসজিদ, স্কুল-কলেজ বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাকা ধানসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির বাগান। পানিতে ভেসে গেছে অনেক ফিসারী ও পুকুরের মাছ। সাম্প্রতিক লামাকাজী ইউনিয়নের মাহতাবপুর এলাকায় নদীর তীরে চলমান ব্লক বসানোর কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে বন্যার পানিতে অনেক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বসতঘর বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার কারণে পরিবার পরিজনের পাশাপাশি গৃহপালিত পশু নিয়েও বিপাকে রয়েছেন মানুষ। সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার কারণে নতুন আরও এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন সড়ক দিয়ে চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সিলেটের জকিগঞ্জের কুশিয়ারা-সুরমা নদীর পানি বেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করায় জকিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এলাকাবাসী ডাইকের ওপর বালুভর্তি বস্তা ফেলে পানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। নদীর তীরবর্তী গ্রামের ঘর বাড়িতে এখন অথৈ পানি। বাড়িঘর ছেড়ে গৃহপালিত পশু নিয়ে অন্যত্র অবস্থান নিয়েছেন। বন্যার পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির সাপের উপদ্রবও দেখা গেছে। এদিকে সুরমা নদীর পানি সিলেট পয়েন্টে বৃদ্ধি পাওয়ায় সিলেট শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাসা-বাড়িতে পানি প্রবেশের ফলে এলাকার বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটছে। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি হচ্ছে। এদিকে, সিলেটে বন্যাকবলিতদের জন্য ১৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, এ সকল আশ্রয়কেন্দ্রে খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউএনওদের সর্বক্ষণিক নজরদারি রাখার নির্দেশনা দেয়া আছে। বন্যাকবলিতদের জন্য আরেক দফায় ১০০ টন চাল ও ৩ হাজার প্যাকেট শুকানো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর আগে ১২৯ টন চাল ও ১ হাজার শুকানো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। নগরীর শাহজালাল উপশহর, মাছিমপুর, লালাদীঘির পাড়, কলাপাড়া, লামাপাড়া, ঘাসিটুলা, যতরপুর, সোবহানিঘাট, কালীঘাট, ছড়ারপাড়, শেখঘাট, তালতলা, মাছিমপুর, পাঠানটুলা, লন্ডনী রোড, মেজরটিলা, মোল্লাপাড়া, দক্ষিণ সুরমার বঙ্গবীর রোড, মোমিনখলা এলাকায় বানের পানিতে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সিলেট সিটি কর্পোরেশন পানিবন্দি মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ৭ ওয়ার্ডে খোলা হয় ১৭টি আশ্রয়কেন্দ্র। আড়তে পানিতে কোটি টাকার ক্ষতি ॥ সুরমা নদীর পানি উপচে সিলেট নগরীর দুই তীরের ঘরবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকেছে। নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা কালিঘাটের শত শত দোকান ও গোডাউন পানিতে তলিয়ে গেছে। কালিঘাটের বৃহত্তম চালের আড়তসহ বিভিন্ন দোকানের শত শত চালের বস্তা পানিতে নিমজ্জিত। গোডাউনে থাকা প্রায় চার হাজার চালের বস্তা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন আলকাস ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী। পানিতে ভিজে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন এই প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী। বিপর্যস্ত বিদ্যুত ব্যবস্থা ॥ টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেটের বিদ্যুত ব্যবস্থা। নগরীর দক্ষিণ সুরমা, উপশহরসহ কয়েকটি এলাকার বিদ্যুতের সাব স্টেশন পানিতে তলিতে গেছে। ফলে এসব এলাকায় মঙ্গবার থেকে বন্ধ রয়েছে বিদ্যুত সরবরাহ। এ ছাড়া বসতঘরে পানি উঠে যাওয়ায় সিলেট নগরীর অর্ধেক এলাকা ছাড়াও কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, কোম্পানিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, সদর ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বেশিরভাগ এলাকার বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুত বিভাগ সূত্র। সূত্র জানায়, কিছু জায়গায় সাব স্টেশনের যন্ত্রপাতি পানিতে তলিয়ে গেছে। আবার অনেক জায়গার বাসা-বাড়ির মিটার পর্যন্ত ডুবে গেছে। এ কারণে বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ আছে। পানি না কমলে এটি স্বাভাবিক হবে না। পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুতহীনতা পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। বিভিন্ন সরকারী অফিসে পানি ॥ সিলেট নগরের তালতলা এলাকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কার্যালয় বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়াও নগরীর বেশ কয়েকটি সরকারী গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও পানি উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের ভবনের ভেতরে পানি ঢুকে গেছে। পানিতে ডুবে আছে আগুন নেভানোর গাড়িও। এতে বিপাকে পড়েছেন ওই ভবনে বসবাস করা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বাধ্য হয়ে তাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে নগরের রিকাবীবাজার এলাকার কাজী নজরুল অডিটরিয়ামে। অডিটরিয়ামের সামনেই ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এই মিলনায়তনেই খোলা হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম। আর অডিটরিয়ামের বারান্দায় নিজেদের অস্থায়ী শোয়ার জায়গা করে নিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তালতলা এলাকার বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের সামনের সড়কে হাঁটু পানি। নগরীর শ্মশানঘাট নিমজ্জিত ॥ এদিকে, বন্যায় তলিয়ে গেছে সিলেট নগরের চালিবন্দর এলাকার মহাশ্মশানঘাট। সিলেট নগরের মধ্যে এই একটি মাত্র স্থানে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা মৃতদেহ দাহ করে থাকেন। এতে এখানে মরদেহ দাহ করা যাচ্ছে না। শ্মশানঘাট সংস্কার ও সংরক্ষণ কমিটি, সিলেটের সভাপতি বেদানন্দ ভট্টাচার্য জানান, শ্মশান ঘাটের শবদাহ পোড়ানোর চুলা তলিয়ে গেছে। বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা ॥ বুধবার রাতে সিলেটের ওপর দিয়ে শক্তিশালী কালবৈশাখী ঝড়, তীব্র বজ্রপাত ও ভারি বৃষ্টিপাত হওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ জানিয়েছেন, বুধবার রাত ১০ থেকে ১টা পর্যন্ত সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে তা-ব চালাতে পারে কালবৈশাখী। নগরীর নতুন এলাকা প্লাবিত ॥ বুধবার নগরীর আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সে সঙ্গে রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও জলমগ্ন অবস্থায় দেখা গেছে। এতে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন নগরবাসী। পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা ॥ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বেলা ১২টায় পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটের প্রধান নদী সুরমা কানাইঘাট (সিলেট) পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়েছে, তবে এখনও তা বিপদসীমার ১২৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের কতিপয় স্থানে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে। বন্যার পানি বৃদ্ধিতে বিপাকে শাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থী ॥ সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বন্যার সৃষ্টি হওয়াতে বিপাকে পড়েছেন ওই সকল এলাকায় মেসে এবং ফ্ল্যাট বাসায় থাকা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা। বিশ^বিদ্যালয়ের আবাসন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকায় মূল ফটক সংলগ্ন এলাকা আখালিয়ার তপোবন, সুরমা আবাসিক এলাকা, নিহারীপাড়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মেসে বা ফ্ল্যাটে থাকেন। নগরীর এসব এলাকায় বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় তারা অনেকেই বিপাকে পড়ছেন বলে জানা যায়। এদিকে নগরীতে বন্যার কারণে বিশ^বিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা পেছানো হয়েছে। আগামী বর্ষার আগেই নদীগুলো খনন করতে হবেÑ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ॥ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এই দুই নদী খনন করতে হবে। এ ব্যাপারেও আমাদের সরকার ও প্রধানমন্ত্রী খুবই আন্তরিক। আমরা নদী খননের পরিকল্পনা নিয়েছি। আগামী বর্ষার আগেই নদীগুলো খনন করতে হবে। বুধবার দুপুরে সিলেট নগরের চালিবন্দর এলাকার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, সিলেটে এই মৌসুমে সবসময়ই ঢল নামে। আমাদের ছেলে বেলায়ই এমনটি দেখেছি। কিন্তু পানি আটকে থাকত না। চলে যেত। কারণ আমাদের শহরেও অনেক পুকুর ও দীঘি ছিল। প্রত্যেক বাড়ির সামনে পুকুর ছিল। আর সিলেটকে বলা হতো দীঘির শহর। কিন্তু এখন আমরা নগরের ভেতরের সব পুকুর-দীঘি ভরাট করে বড় বড় বিল্ডিং করেছি। হাওড়গুলো ভরাট করে ফেলেছি। এছাড়া প্রধান নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। খালি মাঠগুলো ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে পানি নামতে পারছে না। যে কোন দুর্যোগেই সিলেটের জন্য এটা একটা ভয়ের কারণ। মন্ত্রী নগরের ভেতরের পুকুর-দীঘিসহ জলাশয়গুলো রক্ষায় সবাইকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া ড্রেনগুলো খনন করা ও আরও বড় করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক সিস্টেমটাকে নষ্ট করা যাবে না। বন্যার্তদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই পানি বেশি দিন থাকবে না। দ্রুতই নেমে যাবে। ফলে কয়েকটা দিন কষ্ট করতে হবে। এই সময়ে সরকার আপনাদের পাশে আছে। ত্রাণ বিতরণকালে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এনামুল হক। এ সময় তিনি বলেন, সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকায় ২৫ লাখ টাকা ও ২০০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও বরাদ্দ দেয়া হবে। দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার প্রস্তুত আছে। আমরা আজকে সিলেটের দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখব। প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করব। সবার সঙ্গে আলাপ করে ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে জানব। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, প্রত্যেক বছরই এই অঞ্চলে ঢল নামে। কিন্তু এবার ব্যাপক আকারে ঢল নামছে। সিলেটের উজানে মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। ফলে এবার বন্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বন্যা মোকাবেলায় আগামীতে এই অঞ্চলের নদ-নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানান এই প্রতিমন্ত্রীও। সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ওপর ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা সুনামগঞ্জ জানায়, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢল ও ভারি বর্ষণ কম হওয়ায় নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে এখনও (দুপুর-১২টায়) সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ০২ মিঃমি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নদীর পানি কূল উপচে নিম্নাঞ্চলে পানি ঢোকা অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে অবিরাম বৃষ্টিপাত থাকায় নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল। এদিকে জেলার যাদুকাটা নদীর পানি বিপদসীমার ১৩৯ সে.মি. নিচ দিয়ে বইছে। ফলে তাহিরপুর বিশ^ম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২
ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২