ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

মানুষ দেখা

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ০১:০১, ২৯ মার্চ ২০২৪

মানুষ দেখা

মানুষ দেখা

স্বনামখ্যাত ইংরেজ লেখক এলসপেথ ওয়েলডির সাড়া জাগানো গ্রন্থই শুধু নয় চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য করারও এক অবিস্মরণীয় মননশক্তি ‘সি দ্য পার্সন’। সমসাময়িক কালের এক অনবদ্য রচনা শৈলী। সঙ্গে তৈরি হয় চলচ্চিত্র নির্মাণের চিত্রনাট্য। ইংরেজি ভাষায় লেখা বইটি অনুবাদ করেছেন হুমায়ুন ফরিদ। প্রকাশ করে কথা প্রকাশ। প্রচ্ছদ এঁকেছেন লাইবা জায়ান। ভাষান্তরে গ্রন্থ আর সিনেমার পান্ডুলিপির নামটি করা হয়েছে ‘মানুষটিকে দেখো’ অলংকরণে।

সত্যিই অলংকরণই বটে। রোগ-বালাই কখনো কাক্সিক্ষত কোনো বিষয় নয়। বরং এড়িয়ে চলা, ফারাক থাকা ছাড়া তারতম্যের প্রাচীর তৈরি করা যেন সুস্থ স্বাভাবিক যাপিত জীবনের অনুষঙ্গ। বিশেষ করে বিভিন্ন ¯œায়ুবিক রোগ লেখককে যেমন তাড়িত করে একইভাবে অন্যদের সাবধান করার তাগিদও অনুভব করেন ভেতরের স্পর্শকাতর বোধ থেকে। চলচ্চিত্রায়নের রূপকল্পে ধারাবাহিকভাবে চলা এক অভিনব চিত্রনাট্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রচিত গল্প কাহিনীর নায়ক নায়িকারা লেখকের আন্তরিক সংবেদনশীলতায় তৈরি হওয়া অভাবনীয় যুগলবন্দি। কথোপকথনের সারবত্তায় ফুটে ওঠে মানুষের প্রতিদিনের যাপিত জীবনের নানা মাত্রিক সুখ, দুঃখ, হাসি কান্নার এক অনন্য সম্মিলন।

জীবনটা নিরবচ্ছিন্ন সুখের নয় আবার দুঃখের তিমিরে হারিয়ে যাবার মতো দুর্দশাও বরাবর পিছু হটে। গল্প কাহিনী শুরু করা হয় নায়িকা ফরিদার শোবার ঘরের সীমাবদ্ধ পরিবেশের নির্মাল্যে। পিতৃমাতৃহীন ফরিদার জীবন তরী ভেসে চলছে সহোদরা বড় বোনের সঙ্গে। গভীর ঘুমে স্বপ্নের যে বিভোরতা তা যেমন চমকপ্রদ তেমনি বেদনাবিধূর। কোনো অতল সমুদ্রের তলিয়ে যাবার দুঃস্বপ্ন তো বটে। আবার সুখ স্বপ্নে আচ্ছন্ন হতেও সময় লাগছে না।

মূল বিষয়ই সেরিব্রাল পালসিনামে এক ¯œায়ুবিক চাপ, কষ্ট, বেদনা। এভাবে নিত্য জীবনের আনন্দ, কষ্ট আর মানসিক চাপে এগিয়ে যাওয়া চিত্রনাট্যটি সত্যিই অনন্য এক উপস্থাপন। গতিময় জীবন কোনোভাবেই থেমে থাকে না। নিরন্তর ছুটে চলা জীবনের গতি সব সময় স্বাচ্ছন্দ্য, নিজের মতো হয়ও না। আশাতীত স্বপ্ন এবং বিচ্যুতির দারুণ যন্ত্রণার জীবনকে এক অবিমিশ্র ধোঁয়াশার দিকে ঠেলেও দেয়। শুধু ব্যক্তি জীবন নয় সামাজিক বলয়ও চিত্রনাট্যকারকে আলোড়িত ভাবিত করে।

তিনি মনে করেন সামাজিক বিবর্তন আর রূপান্তরের জন্য দৃশ্যমান চিত্রকল্প অনিবার্য এবং জরুরি। সমাজ শুধু নিয়মে চলে না। মনন ও সৃজন দ্যোতনার অনুষঙ্গ হয়ে যুগ যুগান্তরের অনুগামী হয়। সমাজ আর মনের দোলাচলে গড়ে ওঠা মানুষরাও হরেক বিব্রতকর অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার মুখোমুখি হয়। চিত্রকল্প বিশ্বজুড়ে যে সামাজিক আবেদনে সাড়া জাগায় সেখান থেকেই মন্দ আর ভালো রূপান্তরের সম্ভাবনাও জিইয়ে থাকে। অবিস্মরণীয় এক সম্ভার যা সমাজ, মনো আর চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মিলিত কর্মযোগে সুস্থ, স্বাভাবিক অবস্থাকে নিশ্চিত করে।

চিরায়ত অপসংস্কার অপসৃত করা যেন চিত্রগল্পের সচেতন দায়বদ্ধতা। আবার গণজাগরণ তৈরিতেও চলচ্চিত্র যে সুদূরপ্রসারী আর যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে তা যেন অমূল্য সাধনযজ্ঞ। এর ব্যত্যয় সামাজিক বলয়কে বিশৃঙ্খল, অরাজক আর অসুস্থ করতে এগিয়ে থাকে। সমাজের সুস্থতা যদি বজায় না থাকে তাহলে মানুষের স্বাভাবিক, স্বাচ্ছন্দ্য জীবন আর মন বারবার বিঘিœত হবে। পথ হারানোর বেদনায় দিশেহারা হওয়ার দুরবস্থা।

যে সেরিব্রাল পালসি নিয়ে চিত্রকল্পটির অবতারণা সেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র নায়িকা নিজেই এই ¯œায়ুবিক রোগে ভারাক্রান্ত। বুদ্ধিমত্তায় প্রখর দীপ্তি থাকা সত্ত্বেও শারীরিকভাবে অক্ষমতার চিহ্নও তাকে ব্যথিত, মর্মাহত করে দেয়। গ্রন্থটি সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির তার সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন ¯œায়ুবিক চাপের যে মেলবন্ধন চিত্রনাট্যকার শেষ অবধি তাই দর্শক শ্রোতাকে অনুধাবন করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন। সুখপাঠ্য গ্রন্থটি নানা মাত্রিক প্রশ্নের অবতারণায় কিছুটা দুর্বোধ্য হলেও কাহিনীর গভীরে অনুধাবনের পর সেটাও আর থাকে না। সঙ্গত কারণে পাঠকপ্রিয়তা পাবে অবশ্যই। বহুল প্রচার কামনাও করছি।

×