ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১

‘সত্য ফেরারী’র কবি আসাদ চৌধুরী

বাসার তাসাউফ

প্রকাশিত: ২২:৪১, ১৬ নভেম্বর ২০২৩

‘সত্য ফেরারী’র কবি আসাদ চৌধুরী

আসাদ চৌধুরী

বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার একটি নিভৃত গ্রামের নাম উলানিয়া। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের কথা, তখন দেশটা ছিল পূর্ব পাকিস্তান, সময়টা শীতকাল। ফেব্রুয়ারি মাসের ১১তম দিনে এই গ্রামেরই এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছেন আসাদ চৌধুরী। যিনি পরবর্তীতে ‘তবক দেওয়া পান’ মুখে নিয়ে বাংলা কাব্যভূবনে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং এখনও এর প্রতিটি অলিতে-গলিতে ফেরি করে বেড়াচ্ছেন। আসলে শুধু তবক দেওয়া পান নিয়ে নয়, কবি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছেন। কবি নিজেই বলেছেন এ কথা।

এক সাক্ষাৎকারে কবি আসাদ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘...আমার ছেলেবেলার প্রথম অংশটা কেটেছে উলানিয়ায়। মোটামুটি অনেক বড় প্রপার্টি ছিল আমাদের। আমাদের পরিবারে একটা সময় টাকা গুনত না, সের মেপে মেপে ১০ সের আধা মণ টাকা বস্তা ভরে আমাদের তিনটা বড় মাইট্যার (মটকির) মধ্যে রেখে দেওয়া হতো। যখন কাউকে টাকা দিত, তখন সের দরে দেওয়া হতো...।’  
কবি আসাদ চৌধুরী ষাটের দশকে কবিতা লেখা শুরু করলেও তখন তিনি প্রতিষ্ঠা পেতে সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। কারণ, ষাটের দশকের বাংলা কবিতার পটভূমিতে পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তবে হৃদয়বৃত্তির যে সংবেদনশীলতা থাকে, তার ভেতর দিয়ে তিনি নিজেকে প্রকাশ এবং ক্রমবিকাশের পথে এগিয়েছেন নিরন্তর কাব্যসাধনার মধ্য দিয়ে। তিনি সত্যিকার অর্থে লেখালেখি শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধের পর। যখন দেখলেন কবি বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিরা তাকে নামে চেনেনÑ তখন তিনি লেখালেখিটা মন দিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন। 
আসাদ চৌধুরীর ‘তবক দেওয়া পান’ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৬০ থেকে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর বিভিন্ন সময়ে লেখা কবিতা থেকে বাছাই করা কবিতার সংকলন এটি। কবিতাগুলো নির্বাচন করে দিয়েছিলেন কবি রফিক আজাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, অরুণাভ সরকার ও আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো ব্যক্তিত্ব। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি সপ্রশংসিত ও আলোচনা হচ্ছে। এক সাক্ষাৎকারে কবি আসাদ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘...বাঙালি হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার অনুষ্ঠানে পানের ব্যবহার আছে। গ্রামে এখনও অতিথিদের পান দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। পানটা আবার মাঙ্গলিক। এই চিন্তা থেকেই হঠাৎ তবক দেওয়া পান মাথায় এলো।’

বাংলা কাব্যভূবনে কিছু কিছু কবি আছেন, যাদের নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সৃষ্টিকর্মগুলোও উচ্চারিত হতে থাকে। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটু ব্যতিক্রম হলেও তাঁর নাম উচ্চারিত হলে অবধারিতভাবে আমাদের মনের চোখে ভেসে ওঠে ‘গীতাঞ্জলি’ ‘সোনার তরী’র মতো কাব্য, কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিবীণা’ মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ সুকান্ত ভট্টচার্য্যরে ‘ছাড়পত্র’ আর আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ তেমনি আসাদ চৌধুরীর নাম উচ্চারিত হলে ‘তবক দেওয়া পান’ মনে পড়বেই। শুধু তবক দেওয়া পান নয়, তার আরও কিছু কাব্য আছে যা বহুল পঠিত। এসব কাব্য পড়ে পাঠক প্রগাঢ় জীবনবোধ অনুভব করে। 
গোলাপের মধ্যে যাব।
বাড়ালাম হাত
ফিরে এলো রক্তাক্ত আঙুল।
সাপিনীর কারুকার্য
নগ্ন নতজানু
চরাচরে আবেগ বিলায়।
আমার অধরে শুধু
দাঁতের আঘাত। 
 (আত্মজীবনী: ১)  
আসাদ চৌধুরীর কবিতা বিবৃতিময় না। তিনি অল্প কথায়, সীমিত শব্দের বন্ধনে ভাবকে মুক্তি দেন। তবে শব্দে, উপমায়, বর্ণনায় জীবন উজ্জীবিত হওয়ার মতো উপাদান আছে তার কবিতায়, কিন্তু দুর্বোধ্য নয়। তিনি কঠিন শব্দ ব্যবহার করার বদলে শিল্প বিনির্মাণের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। এতে তার কবিতা সহজ ও সরল হয়ে পড়েনি। বরং এর ভেতর দিয়েই তিনি নিজের বলিষ্ঠ অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন। তার কবিতার ভাষা ও শব্দ পাঠককে বিব্রত করে না, বরং কাছে টানে, আপন করে নেয়। 

আশ্রয় না-দিলেও আশা দিয়েছিলে
এ-কথাটি কেমন ক’রে চেপে রাখি?
লক্ষ লক্ষ মালঞ্চের ঝড় বুকে পুরে
শূন্য হাতেই তোমার কাছে আসা। 
(যদি আলোই না হয়) 
স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে কবি আসাদ চৌধুরী একটি কবিতা পড়েছিলেন। কবিতাটি পরবর্তীতে দৈনিক ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছিল। কবিতাটির নাম ছিল ‘তখন সত্যি মানুষ ছিলাম।’ শেষের চার লাইন  বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে-
‘এখন এসব কল্পকথা
দূরের শোনা গল্প
তখন সত্যি মানুষ ছিলাম
এখন আমি অল্প।’
    কবি আসাদ চৌধুরীর ‘সত্য ফেরারী’ নামের একটি কবিতা এতটাই আলোচিত হয়েছিল যে, এক সময় কবিতাটি পাঠকের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে, আবৃত্তি শিল্পীর অডিও জনপ্রিয়তা পেয়েছে, এমনকি রাজনৈতিক পোস্টারও হয়েছে। কবিতাটি হলোÑ

কোথায় পালালো সত্য?
দুধের বোতলে, ভাতের হাঁড়িতে! নেই তো
রেষ্টুরেন্টে, হোটেলে, সেলুনে,
গ্রন্থাগারের গভীর গন্ধে,
টেলিভিশনে বা সিনেমা, বেতারে,
নৌকার খোলে, সাপের ঝাঁপিতে নেই তো।
১৯৭৫-পরবর্তীতে তিনি দেশের রাজনৈতিক স্খলন দেখে ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলেন। যখন তিনি দেখলেন এই বাংলাদেশ তো সেই বাংলাদেশ না, যে বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, ভাসানী কিংবা শেরে বাংলা চারদিকে রাজকারদের আস্ফালন। কিন্তু কবি কিছু করতে পারছেন না। তার হাতে যে অস্ত্র তা দিয়ে তিনি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি কবিতায় বলেছেন ‘তোমাদের যা বলার ছিল বলছে কি তা বাংলাদেশ...!’ 
১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ, ১৯৪৭-এর পাকিস্তান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫-এর পরে বঙ্গবন্ধু হত্যা, তারপর বাংলাদেশের রাজনীতি, ১৯৯০-তে এসে গণতন্ত্রের উত্তরণ এবং ’৯০-এর পর এখন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ইত্যাদি নিয়ে এখনকার যে অবস্থা এগুলো আমরাও আজ নীরবে-নিভৃতে পর্যবেক্ষণ করি। যে উদ্দেশ্যে জীবন বাজি রেখে দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়ে গেছেন আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা, তাঁরা যা চেয়েছিলেন তা কি পূর্ণ হয়েছে বা হচ্ছে? আদৌ হবে কি না সেটা ভবিতব্য। তাই আজও আমাদের বলতে হয়, ‘তোমাদের যা বলার ছিল বলছে কি তা বাংলাদেশ...?’

×