ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

ভ্রমণ ॥ কাতালোনিয়ার রৌদ্রের ভেতর

অহ নওরোজ

প্রকাশিত: ২২:৫৬, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

ভ্রমণ ॥ কাতালোনিয়ার রৌদ্রের ভেতর

কাতালোনিয়ার রৌদ্রের ভেতর

(পূর্ব প্রকাশের 
একবার গড়িয়ে পড়লে কয়েক শ’ মিটার নিচের খাদে। প্রায় ঘণ্টা তিনেক হাঁটার পর মানচিত্র আমাদের বলে কিংবা আমরা দেখতে পাই, পাহাড়ের চূড়া আমাদের পায়ের নিচে। বিশাল নিঃশ্বাস ফেলি! প্রায় ১৫ শ ফিট! একেবারে উপরে পাথরের ফাটলে ঘাস আর গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ছাড়া আর কোনো সবুজের দেখা নেই। চূড়ার দিকে মাটি নেই বললেই চলে। কেবল বিশাল বিশাল পাথর। অবাক হয়ে তাদেরকে দেখি আর ভাবি, কত হাজার বছর ধরে এইখানে পাথরেরা এভাবে নিটল হয়ে রোদের সঙ্গে কথা বলে! একেবারে উপরে উঠে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ফিরে আসার পালা। দলের সিদ্ধান্ত হয়, যে পথে আমরা এসেছি সে পথে ফেরা হলে একঘেয়ে লাগতে পারে, তাই আমরা অন্য পথ ধরে এগোই।

পথে যে কয়েকবার পাহাড়ি ঝর্ণা-বিশিষ্ট সবুজ-নীল জলের হ্রদ পড়েছে, প্রতিবারই তাতে ভিজে এসেছি। বনের ভেতরকার পাহাড়ি পথে আমরা মাত্র একবারই পথ ভুল করেছিলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার- এই গহিন পাহাড়ের উপরের দিকে, ঘন বনভূমির ভেতর পাথর ছাড়া যেখানে কোনো মানুষের দেখা নেই, সেখানে পাথরের গায়ে কিছু পরে পরে হাতে আঁকা হলুদ রঙের ছোট ফোটা দিয়ে পথের নিশানা করা। চলতে চলতে পথের দু’ধারে পড়ে বুনো আপেল গাছের সারি। বরই-সাদৃশ্য আপেলগুলো পেকে টইটুম্বুর হয়ে আছে— সেসব খাওয়ায় ব্যস্ত বাংলাদেশে খাঁচায় কিনতে পাওয়া বাজিগর বা লাভবার্ড পাখির মতো নানারঙা ছোটো ছোটো পাখি। কাছে গেলেই কিচমিচ করে তারা উড়ে যায়।

পথে ফিরতে ফিরতে কর্সাবেই পাহাড়ের গায়ে দেখা মেলে ‘Sant Martí de Corsavell’ নামক রোমান আমলের বহু পুরাতন মন্দিরের। জানা যায় ১ হাজার ১৯ সালে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত। বহু আগে থেকেই এই পাহাড়ে মানুষের বসবাস। আমরা এগিয়ে যাই- সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই ক্যাম্পে ফিরতে হবে- বিশ্রামের অবসর নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কেবল নিচের দিকে নামছি, তবু পথ শেষ হয় না। দলের সবার শরীরের জোর কমে আসে, পায়ের পাতা আর হাঁটুতে কোনো অনুভূতি অবশিষ্ট থাকে না।
আমাদের ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে যায়- ফিরে দেখি ক্যাম্পের সবাই আমাদের নিয়ে চিন্তিত। তবে সবকিছু পেরিয়ে এমন একটা দিনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার কারণে নিজেকে একবার আয়নায় দেখতে ইচ্ছে করে। মানচিত্র অনুসারে প্রায় ৭ ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটারের কিছু বেশি পাহাড়ি পথ আমরা পাড়ি দিয়েছি।
ভলিবল খেলা, পাহাড়ী ঝর্ণা ও মুগা নদীর জলে স্নান, হ্রদে ঝাঁপাঝাঁপি আর রাতের বেলায় পাহাড়ের উপরে ঘাসের ভেতর শুয়ে ঘন অন্ধকারে ১৮০ ডিগ্রি আকাশে তারা দেখে গোপনে একটি সপ্তাহ কিভাবে যে পার হয়ে যায় তা টের পাইনি। স্পেন সফরে সঙ্গে কিছু বই নিয়ে গিয়েছিলাম। দুপুরের অবসরে চেরি গাছের ছায়ায় বসে কিংবা শুয়ে পড়তে খুব ভালো লাগতো। কখনো গহিন রাতে তাবুর জানালা খুলে ঝিরঝির হাওয়ার ভেতরে মুঠোফোনের আলোতে যখন বই পড়তাম তখন প্রায়ই মনে হতো জীবন এক বিস্ময়। সে বিস্ময়ের ঘোরে কখনো শুনতে পেতাম পাশের খাদের ভেতরে মুগা নদীর জল নেমে যাওয়ার শব্দ-কখনো অচেনা দেশের অচিন রাতজাগা পাখির মধুকরী কণ্ঠ। জীবন কত যে ধ্রুপদী হতে পারে, পাহাড়ের সেই দিনগুলো ভেদ না করলে কখনোই বুঝতে পেতাম না। 
এক সপ্তাহ পর আমরা পাহাড় ছেড়ে কোস্টা ব্রাভার সমুদ্র উপকূলে চলে আসি। লা’ স্কালা শহরের কাছে আমাদের ক্যাম্প। এখানেও আগের ক্যাম্পের মতো তত্ত্বাবধায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একদল লোক নিযুক্ত। তারাই আমাদের স্বাগত জানায় এবং তৈরিকৃত তাবু দেখিয়ে দেয়। সারি সারি বুড়ো ঝাউগাছের নিচে ভূমধ্যসাগরের তীরে ধুলোর মধ্যে আমাদের তাঁবু। বাতাসে নোনা জলের গন্ধ। পাহাড় আর সমুদ্রের মধ্যে পার্থক্য অসীম। রহস্যময় পাহাড় ছেড়ে সমুদ্র কতটুকু ভালো লাগবে তাই ভাবতে থাকি। তবু ভূমধ্যসাগর বলে কথা! পৌঁছেই রওনা করি সমুদ্রের দিকে। চলার পথে মাথার ওপরে উড়ে যেতে দেখি নানা বয়সের গাঙচিলদের।

সমুদ্রতীরে গিয়ে আশাহত হতে হয়, একি সমুদ্র? ঢেউয়ের বালাই নেই! সমুদ্র জানে না, আমার মনে গাঁথা আছে বঙ্গোপসাগর কিংবা আইসল্যান্ডে আছড়ে পড়া আটলান্টিকের স্মৃতি। ডেনমার্ক বা জার্মানির বাল্টিক সাগরের তীরে এর থেকে বেশি ঢেউ দেখেছি। তবে, ভূমধ্যসাগরের নীলাভ থেকে ক্রমান্বয়ে গাঢ় নীল হয়ে যাওয়া রঙ হাঁপিয়ে-ওঠা মন শান্ত করে। ভাবা যায়? এই জলের অন্যপাড়ে আফ্রিকা মহাদেশ। জল পার হয়ে ওপারে গেলে মানুষের রঙ, ভাষা, সংস্কৃতি সবকিছুই আলাদা। সাগরের তীর ধরে দেখি দোকানিরা রকমারি জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেছে। জিনিসপত্রের দরদাম করার সুযোগ রয়েছে, তবে জার্মানি থেকে দাম তুলনামূলক কম। বার্সেলোনায় গিয়ে একই রকম দেখেছি। 
লা’ স্কালা থেকে বার্সেলোনা কাছে হওয়ায় সমুদ্রতীরে ক্যাম্পিং-এর একদিনের পুরোটা বরাদ্দ ছিলো বার্সেলোনার জন্য। বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে শুনে বার্সেলোনাকে যেরকম তিলোত্তমা ভেবেছিলাম ঠিক ততটি যেন নয়। তবে তার পুরনো ভবন আর ওল্ড টাউন বিস্মিত না করে পারে না। পরতে পরতে পুরান ঢাকার সরু অলিগলির কথা মনে হয়। দারুণ পরিচ্ছন্ন। শহরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে প্রচুর বইয়ের দোকান, জাদুঘর, আর মন্দির। তার কয়েকটাতে ঢু মারতে মারতে খুঁজে পাই বহু পুরনো সাগ্রাদা ফামিলিয়া মন্দির। নির্মাণ ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ চলায় তাকে সেভাবে উপভোগ করার সুযোগ হয়নি। কাতালোনিয়া অঞ্চলে গেলে বার্সেলোনার সাগরতীর, জাদুঘর, মন্দির, বইয়ের দোকান আর বিশ্বখ্যাত ফুটবল স্টেডিয়াম ‘কাম্প ন্যু’ না ঘুরে আসা হবে বোকামি।

কাম্প ন্যু আর বার্সেলোনা ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা বিচিত্র। সেগুলো বর্ণনা করতে গেলে আলাদা একটা লেখা তৈরি করাই শ্রেয়। সমুদ্রতীরে ক্যাম্পের শেষ সাতটি দিন ছিলো অনেক রকমের। কোনোদিন সায়াহ্ন থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সাগরের তীরে বসে কাটিয়েছি, কোনোদিন ভোরের আগে উঠে একাকি সাগরপাড়ে গিয়ে সূর্যোদয় দেখেছি-তখন মনে হতো আমি আর সেই আমি নেই; বাংলা-দেশের সেই জীবন কর্পুরের মতো কথায় যেন উড়ে গেছে-অন্য কোনো দুনিয়া যেন আমার জীবন চিরে ঢুকে আছে।  যত ভ্রমণ করি, যত বেশি রকমফের ঘটনার ক্রীড়া দেখি তত বেশি যেন দ্বিধায় পড়ি। তবু ধীরে ধীরে করোটির ভেতর নতুন ফুলের সুবাস বাড়তে থাকে। (শেষ)

×