ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

বই ॥ বাল্যবিয়ে প্রতিরোধী আখ্যান

তিথি বালা

প্রকাশিত: ২২:৪৫, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩

বই ॥ বাল্যবিয়ে প্রতিরোধী আখ্যান

মোহিত কামাল

মোহিত কামালের ‘কার্তিকে বসন্ত’ উপন্যাসে এক গ্রামীণ কিশোরীর মনোজগতের সাহসী ও সদর্থক ভাবনা উঠে এসেছে। পাঠকের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে এই উপন্যাস ভূমিকা রাখতে পারে। 
গ্রামীণ পরিবেশে খেটে খাওয়া পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা চন্দার। অক্ষরজ্ঞানহীন মজিদ মিয়া আর সফিনা বানুর মেয়ে চন্দা। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া চন্দা ছুটির দিনে পরিবারের সঙ্গে মাঠের জমিতে কাজ করে, ফসল ফলায়। চাষাবাদে অংশ নেয়। পড়াশোনায়ও সে ভালো। কথাবার্তায়ও সে স্মার্ট। তবে তার স্মার্টনেস ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়।
গ্রামের সহজ বাসিন্দা চন্দার মধ্যে লেখক এক তেজস্বী, প্রতিবাদী, বুদ্ধিমতী চন্দাকে সৃষ্টি করেছেন। বাল্যবিয়ের প্রতিরোধে সে সহপাঠীদের নিয়ে শিক্ষকের সহায়তায় ‘মনপুর উপজেলা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ সংগঠন’ গড়ে তুলেছে। সহপাঠীয় বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তার প্রস্তাবে শ্রেণিকক্ষে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এর মাধ্যমে লেখক চন্দাকে প্রতিবাদী চরিত্রের প্রতীক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। 
স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে গ্রামের কিছু বখাটে ছেলে চন্দাদের বিরক্ত করত। চন্দা দৃঢ় কণ্ঠে তাদের সতর্ক করে দেয়। এমন কি মার দেবার হুমকিও দেয়।
একই গ্রামের ছেলে রশীদ। সে এক সময় স্কুলে যেত। কিন্তু অভাবের কারণে তাকে স্কুল ছাড়তে হয়েছে। সেও মাঠে কাজ করে। অনেক সময় সে চন্দাদের জমিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। পেশিবহুল তামাটে শরীর রশীদের। চন্দাদের জমিতে কাজ করার সময় সে আড়চোখে তাকিয়ে রশীদকে দেখে। রশীদ চন্দার থেকে দুই ক্লাস উপরে পড়ত। বাবা-মারা যাবার কারণে তাকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে মাঠের কাজ করে সংসারের হাল ধরতে হয়। কিন্ত চন্দার কাছে বিষয়টি ভালোলাগেনি। সে মনে মনে চায় রশীদ যেন আবার পড়াশোনা শুরু করে। পড়াশোনায় রশীদ ভালো ছিল। তবে সে মাঠের কাজেও খুব দক্ষ। রশীদের অবচেতন মনে চন্দার আসা-যাওয়া। চন্দাও নিজের অজান্তে ঘুরেফিরে সে পথেই চলছে। লেখকের ভাষায়, ‘খর¯্রােতা মনের মঙ্গা মোকাবিলায় সরু নাইলের মধ্যে চন্দা পুরে নিচ্ছে ভালোবাসার আগাম শস্যবীজ। মরা কার্তিক মাসকে আর মরা মনে হচ্ছে না। উজ্জ্বল শস্যবীজ বুক ভরে বুক ভরে কার্তিকে লেগেছে বসন্তের ছোঁয়া। উর্বর হয়ে উঠেছে মন-ভূমি। ভালোলাগার উর্বর ভূমি কেবল রশীদের জন্য।’ 
গ্রামের বখাটে ছেলেদের দ্বারা চন্দাদের উত্ত্যক্ত করার কারণে রশীদ একবার নরক আলী নামে এক বখাটে যুবকের চোখ উপড়ে ফেলে। যার ফলে তাকে জেলে যেতে হয়। রশীদকে জেল থেকে বের করার জন্য চন্দার উৎকণ্ঠার মাধ্যমে লেখক রশীদের প্রতি চন্দার গভীর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। চন্দার অগ্রহ আর জোরালো উদ্যোগের কারণে একসময় রশীদ জেল থেকে ছাড়া পায়। ধানকলে রশীদের মায়ের চাকরি হয় চন্দার চেষ্টায়। পাশের বাড়ির জরিনার বাল্যবিয়ে রোধ করে চন্দারা। চন্দাদের ¯ু‹লে বাল্যবিয়ে সংঘকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেখানে উপস্থিত থাকবে উপজেলা, জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ। প্রান্তিক পর্যায়ে বসবাস করেও চন্দা তার কাজের জন্য উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে সাহায্য-সহযোগিতা পাবে এটা ভেবেই চন্দার বাবা মনে শান্তির পরশ অনুভব করে।  গ্রামের নানা দ্বন্দের অবসান হয় চন্দার কৌশলগত কার্যক্রমের কারণে। চন্দার বিপরীতপন্থিরাও তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানায় তার বল্যবিয়ে প্রতিরোধক সংঘের কারণে। মনপুর গ্রামে শান্তি ফিরে আসে চন্দার হাত ধরে। এসব কিছুর মাঝেও চন্দার মনের গোপন কুঠরিতে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে রশীদ নামের ছেলেটি।
গ্রামের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে আলোকিত করার জন্য লেখক ‘কার্তিকে বসন্ত’ বইয়ে চন্দার মত উদ্যমী  কিশোরীর চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। চন্দার মতো কিশোরী যে সমাজে আছে সেখান থেকে বাল্যবিয়ে অন্তর্হিত হবে। বেকারের কর্মসংস্থান হবে, দুষ্কৃতকারীরা সুপথে আসবে, ঝরে পড়ার হার কমবে, বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশুর সংখা বাড়বে। চন্দা  কিশোরী হলেও তার ব্যক্তিত্বে  অভিভূত হন ইউএনওসহ এলাকার মানুষ।
ব্যক্তিত্ব মানুষের একটা বড়গুণ। ব্যক্তিত্বের কারণে শত্রুও মিত্রে পরিণত হয়। যেমনটা লেখক চন্দাদের গ্রামের ছবিতে এঁকেছেন। এদেশের প্রতিটি গ্রামে যদি একজন করে চন্দার আবির্ভাব হয় তবে দেশের চেহারাই পরিবর্তন হয়ে যাবে। কার্তিক মাসের শূন্য মাঠ ফাল্গুনের ফুলে-ফলে উঠবে।

×