ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

আমি অন্ধকারেই থাকি

মূল : অ্যানি আর্নো  অনুবাদ : নাসরিন জে রানি

প্রকাশিত: ০১:০৫, ২৪ মার্চ ২০২৩

আমি অন্ধকারেই থাকি

বাজার চত্বরে এক অন্ধ ভিক্ষুককে আমি একটি কয়েন ভিক্ষা দিলাম

(পূর্ব প্রকাশের পর)

পর্ব-১৬
শুক্রবার ১৮
বাজার চত্বরে এক অন্ধ ভিক্ষুককে আমি একটি কয়েন ভিক্ষা দিলাম, তিনি যেমন করে দিতেন। এখানে তিনি থাকলে বলতেন, “তুই সেই লোকটাকে তার কর্তব্য কর্ম থেকে বিচ্যুত করলি। আর আলসে বানিয়ে দিলি” । অথবা বলতেন, “একজনকে অবশ্যই তার জীবনের দায়িত্ব-কর্তব্যগুলো পালন করতেই হবে”। 
আমি এইসব কথাগুলো শুনলে কেঁপে উঠি, বিশেষ করে ওই কথাগুলোই যা আমি আমার শৈশব থেকে অবিরতভাবে শুনে এসেছি। 
তাকে নিয়ে আমার সবচেয়ে উদ্ভট কল্পনাটি হলো, তার সাদা কোট, সেই মুদি দোকানের ইউনিফর্মটা, যেটা আমার পেছনে ঝুলছে সারাক্ষণ (আমার দায়িত্ব আর কর্তব্যগুলোকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে)। 

সোমবার ২১
অন্যলোকদের সঙ্গে কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকাটা তিনি খুব অপছন্দ করতেন, হয়তবা অস্বস্তিবোধ বা ভয় পেতেন। তাই মুদি দোকানে যতক্ষণ থাকতেন- “প্রত্যেক গ্রাহকের সঙ্গে ন্যূনতম একটি অথবা দুটি কথা সারাক্ষণই বলতেন তিনি”। 
আমার কোনো ধারণা নেই যৌনতা ব্যাপারটি তার কাছে কেমন? অথবা তিনি কিভাবে ভালোবাসাবাসিতে সাড়া দিতেন। যদিও উপরে উপরে যৌনতাকে মন্দই বলতেন। কিন্তু তার বাস্তব জীবনে? 

বুধবার ২৩ 
তিনি আজ আমাকে বললেন, “আমি জানি তোর সঙ্গে বাড়ি ফিরে গেলে আমি ভালো থাকবো”।এরপর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা একজন নার্সকে খুব নরম সুরে বললেন, “তুমি কি একটু বসবে না?” আমি একটি সংবাদপত্র হাতে নিলাম, পড়তে শুরু করলাম। তার বসার জায়গা থেকে সামান্য একটু দূরে রাখা কেকের প্যাকেটটা যখন ধরতে চাইলেন তিনি, আমি ওটা এনে তার কাছে দিলাম- একটি শিশুর মতন। 
এক মিনিট পরে, আমি আড়চোখে তাকালাম। দেখলাম, তিনি ওটাকে হাতের মুঠোতে চেপে ধরে বেশ কষ্ট করে খেতে চেষ্টা করেই যাচ্ছেন, এরপর কেকটা হাতে তুলে আমি নিজ হাতে নিয়ে খাইয়ে দিতে চাইলাম, কিন্তু তিনি খুব শক্ত করে মুঠিটা পাকিয়ে থাকলেন, আমাকে ধরতে দেবেন না। এ যেন মা আর শিশুর মাঝের সেই যন্ত্রনাদায়ক বিপরীতমুখিতার মর্মান্তিক পীড়াদায়ক খেলা। 

নভেম্বর, রবিবার ৩
তার মাথার এলোমেলো চুল, আর হাতগুলো শূন্যে একে অপরকে ধরতে হাতড়াচ্ছে, কিন্তু যখন ডান হাতটা তার বাম হাতকে ধরছে, এমন করে ধরছে যেন অচেনা কোনো বস্তুকে ধরছে। তিনি তার নিজের হা-মুখটা কোথায় আছে তা ঠাহর করতে পারছেন না; যতই চেষ্টা করছেন কেকটা মুখের কোনো একপাশে লেগে বাড়ি খাচ্ছে। এটা তার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে কেকের যে ছোট্ট টুকরাটা আমি তার হাতে দিলাম, ওটা আবার তার হাত থেকে খসে পড়ে যাচ্ছিল কিন্তু আমি সেটা দ্রুত ধরে ফেলে চট করে তার হা-মুখের ভেতরে ঢোকালাম। তার এই অধঃপতন আর পাশবিকতায় আমি হতাশ হয়ে পড়ছি- তিনি কোথাও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, জিভ আর ঠোঁট দুটো শূন্যে দুলছে, ওঠা-নামা করছে, যেন পাতলা বাতাস চুষে নিচ্ছে নবজাতক শিশুর মতো করে। আমি তার মাথার আলুথালু চুলগুলো আঁচড়াতে শুরু করলাম, কিন্তু একটু পরেই থেমে গেলাম। কারণ, চুলগুলো বেঁধে রাখার জন্য কোনো ইলাস্টিক ব্যান্ড নেই আমার কাছে। তিনি বললেন, “তুই যখন চুল আঁচড়ে দিস, আমার খুব ভালো লাগে”। কিন্তু তিনি একজন মানুষের ন্যূনতম আচার আর পরিপাট্যতার সবকিছুই যেন ভুলে গেছেন। তার চুল আঁচড়ানো আর মুখের লোম বেছে দেওয়ার পরে এখন তাকে একজন মানুষের মতন লাগছে। যখন তার চুল আঁচড়ে গায়ের পোশাকটা পরিপাটি করে পরিয়ে দিই, এটাতে তিনি খুব আনন্দ পান। আমার মনে পড়ছে, যখন আমি রুমে ঢুকেছিলাম, আমার মায়ের রুমমেট ওই বৃদ্ধা মহিলাটি তার নিজের কাঁধ আর পাগুলো হাত দিয়ে আদর করে স্পর্শ করছিলেন। যেন বেঁচে থাকাকে আদর করা হচ্ছে, স্পর্শ করা হচ্ছে। 

সোমবার ১১ 
তিনি আজ চরমভাবে উত্তেজিত হয়ে গেছেন। তার হুইলচেয়ারের হাতলটা আঁকড়ে ধরে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওটাকে টেনে উপরে তুলতে চেষ্টা করছেন। 
এই সহিংসতা আমাকে মনে করিয়ে দিল তার চারপাশের জিনিসগুলোর প্রতি তার সেই আক্রমণাত্মক প্রকাশগুলো, এমন কি আমার উপরেও। হঠাৎ করে আমার তাকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে হলো, তিনি একজন প্রচ- “খারাপ মা”- খুব নিষ্ঠুর আর অনমনীয়। বিষ্ঠার একটি শ্বাসরুদ্ধকর গন্ধ আছে, কিন্তু আমি একেবারেই বুঝতে পারছি না কখন আর কিভাবে তার এই নোংরা জামাকাপড়টা পরিবর্তন করে একটি পরিষ্কার পোশাক পরাতে পারবো। আমি তাকে একটি কেক খাইয়ে দিচ্ছিলাম, ছোট্ট ছোট্ট টুকরো করে; তখন তিনি আমার দিকে একবারও ফিরে তাকিয়ে দেখেননি। তিনি কখনোই আর বলবেন না, “এটা আমার মেয়ে,” আমাকে এই রুমে ঢুকতে দেখলে যেমনটা গতবছরও বলেছিলেন। 
আমার মনে পড়ল- আমাদের শোবার ঘরে রাখা চেম্বার পটে বসে তার সেই মলত্যাগের দৃশ্যগুলো; তিনি খুব নির্লজ্জভাবে আমার সামনে মলত্যাগ করতেন ওটাতে; মেয়েদের মাঝের সেই অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতা, যা তিনি শৈশবে আমার উপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিলেন এবং এটা আমি আমার পরবর্তী জীবনে ভীষণভাবে ঘৃণা করে এসেছি। সারাজীবন জোরাজুরি করে নিজের ইচ্ছেগুলো অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার এই ব্যাপারটা- আজ আপনি কিভাবে নিতে পারছেন, বলুন? এই কথাটি অন্য অর্থে বলতে চাইলে, “আপনি কিভাবে এই রকমের একটি চিকিৎসা মেনে নিতে পারছেন? (আমার স্বামী বলেছিল)। 

বুধবার ১৩
গতকাল ইভত্যুতেঁ আমার খালা আর তার মেয়ে বলছিল আমাকে, “তুই সত্যি তোর মায়ের মতো কাজের মানুষ হয়েছিস, তাই না? আর দ্যাখ! তুই দেখতেও যেন তোর মায়ের মতোই”। আমার খালা বললেন, “তোর মা সারাটা জীবন শুধু খেটেই মরলো। ও ঘর ঝাট দিতো, মুছতোও ওই। তোর বাবাকে কোনো কাজ করতে দেখলে বলত, রেখে দাও তুমি, আমি করে ফেলবো সব”। 
তিনি সব সময়ে একধরনের অহংকার নিয়ে চলতেন। এমন- তার শরীরটা নিরোগ আর খাঁটি, তাই তিনি যত খুশি ততটাই পরিশ্রম করতে পারেন। তার কোনোদিনই কোনো রোগশোক হবে না, অসুস্থ শরীর বা এই ধারণাটিকে তিনি অবজ্ঞাই করতেন শুধু, আর এই সম্ভাবনাটিকে নাকোচ করে দিতেন। তিনি ছিলেন একটি কেজো-পশু, সারাদিন শুধু কাজই করতেন। কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগত, যখন তার সঙ্গে তুলনা করেই হয়ত আমাকে বলতেন, এক কৃশকায় দেহের দুর্বল প্রাণী। আমি খুব ঘৃণা করতাম এই কথাটা শুনতে। 

রবিবার ১৭
আমার মা আর তার রুমমেট পাশাপাশি বসেছিল, আমি যখন রুমে ঢুকলাম। খুব মিষ্টি একটা ছবি। দেখে মনে হচ্ছে তাদের দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য জাদু বন্ধন আছে। এই ছবিটা দেখতে লাগছে ইতালীয় রেনেসাঁর সেই চিত্রকর্মগুলোর মতো, বাইবেলের সেই অসাধারণ দৃশ্যগুলোর একটি, নির্মল, অবর্ণনীয়, সুন্দর, পরম সুখের একটি মুহূর্ত যেন। 
আমাকে দেখিয়ে আমার মা ইশারা করে তার সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি ওকে চিনতে পারছো?’ যথারীতি অন্য মহিলা স্তব্ধ, তিনি তোতলাতে শুরু করেন, গত কয়েক মাস বোধগম্য হয় এমন কোনো কথাই তিনি বলেননি, তিনি তোতলাতে থাকেন। তারা দুজন আজকাল ভাষা দিয়ে যোগাযোগ করে কিনা এটা সত্যি আর খেয়াল করে দেখার দরকার নেই, এমন কি তাদের মাঝে মুখের ভাষা দিয়ে কথা বলার প্রয়োজন পড়ে কিনা এটা নিয়ে ভাবার আর কিছুই নেই। আমি তাদের উল্টোপাশে বসলাম। আমার মাকে একটি একলিয়ার খাওয়ালাম। তার রুমমেটকে বাকি একলিয়ারটা সাধলাম কিন্তু তিনি খাবেন না, এরপর ওটা আমি সময় নিয়ে ছোট ছোট কামড়ে ধীরে ধীরে খেতে থাকলাম। ভিয়েনিজ ওয়াল্টজেস- ধ্রুপদ নৃত্যানুষ্ঠানের শব্দ ভেসে আসছে টিভি থেকে। আমার মনে পড়ে গেল ইভতুত্যঁতে কাটানো সেই রবিবারের বিকালগুলোর কথা। এটা ঠিক সময় অতিবাহিত করা নয়, বরং অন্যকিছু- মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত কিছু। যেন এটি একটি শৃঙ্খল। আমার জীবন এই পুরো শৃঙ্খল প্রক্রিয়ার একটি অংশ; এই জন্য আমি একটু লম্বা সময় বেঁচে থাকছি। আমার জীবনটা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। 
রুমের ভেতরের পায়খানাটা শুকনো প্রস্রাবের মাখামাখিতে বেশ আঠালো হয়ে আছে। আমি সেটাকে মুছে দিলাম। মনে পড়ল আমার প্রেমিক ‘এ’-এর ঘরের সকালের দৃশ্যগুলো। আমি আমার মায়ের যৌনজীবন সম্পর্কে একেবারেই কিছু জানি না। তবে তাকে বলতে শুনেছিলাম- ‘কেউ যদি এসব জানত, তাহলে খুবই লজ্জার ব্যাপার হবে’।

রবিবার ২৪
মাঝে মাঝে তিনি আমার দিকে বেশ অহংকারী দৃষ্টিতে বেশ ইতস্ততভাবে তাকিয়ে দেখেন আর এক প্রকারের অবজ্ঞাই যেন করেন। (চলবে...)

×