ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

ধূসর ক্যানভাস

অরূপ তালুকদার

প্রকাশিত: ০১:২৮, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

ধূসর ক্যানভাস

ধূসর ক্যানভাস

রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছেগাঢ় অন্ধকার এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছেশীতের রাতের শেষে চারদিকজুড়ে কুয়াশার চাদর ছড়িয়ে আছে যেন কান পাতলে জলের ফোঁটার মতো জমাট শিশির টুপটাপ ঝরে পড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে এখান-ওখান থেকেপূবের আকাশে লাল আহলার আভা দেখা যাচ্ছেআস্তে আস্তে বাড়ছেসূর্য উঠছেকিছু পরেই লাল আলো ভোরের রোদ হয়ে ছড়িয়ে পড়বে সবখানে

ঠিক এসময়েই নয় বরং এর কিছুটা আগে আগে স্বাভাবিক নিয়মে ঘুম ভেঙ্গে যাবে সত্যব্রতরদীর্ঘদিনের অভ্যাসঘুম ভেঙ্গে গেলে মিনিট পাঁচেক চুপ করে শুয়ে থাকবেনতাকাবেন এদিক-ওদিকতখনও সব পরিষ্কার দেখা যায় না ঘরের ভেতরেআবছা অন্ধকার যেন ঝুলে আছে আসবাবপত্র আর ঘরের অন্যান্য জিনিসপত্রের সঙ্গে

সত্যব্রত শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকেন আজ কোন কাজ আছে কিনাযদিও এখন তেমন কোন জরুরী কাজটাজ থাকে নাঅন্যান্য লোকজন আছে, তারা করেকখনও কখনও মনে করিয়ে দেয়াটাই তিনি করে থাকেনএজন্য মনে রাগ হয় না কারণ কমবয়সী ছেলে ছোকড়াদের কত কাজ অকাজ আর চিন্তাভাবনা থাকেতার মতো ষাট ছাড়ানো মানুষদের সেসব থাকবে কেন? কারণ ধীরে ধীরে তো ঘরমুখী হয়ে গেছেন তিনি। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে দূরে কোথাও যেতে মন চায় নাষাট ছাড়িয়ে সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়স এখন সত্যব্রতরতিনি বলেন- ষাট পেরুনোতাতে মনের সান্ত¦না মেলে, শরীরের শক্তি বাড়ে নামনেরও না

বিছানা ছেড়ে উঠে দুবার শুরকুদ করে পর পর দুই গ্লাস জল খান সত্যব্রতএ অভ্যাসটাও দীর্ঘদিনেরএতে পেটটা একটু নরম হয়তবে এই নিয়মটা মেনে চলার কারণেই হয়তো এতদিনেও তিনি পেটের তেমন কোন গোলমালে পড়েননিঅথচ তার বয়সী অনেকেই এখন, এই বয়সে এসে বা তার কিছু আগে থেকেই আই বা অন্য কোন ঝামেলায় জড়িয়ে গেছেনফলে খাবার-দাবারের উসাহ কমে গেছে বা কোন না কোন হজমি ওষুধে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন

তবে সত্যব্রতর শরীরের জন্য সবচেয়ে যে বড় সুবিধা সেটা হলো- ডায়াবেটিস না থাকাএ রোগটি মানুষকে ধীরে ধীরে প্রায় স্থবির করে দেয়কন্ট্রোলে রাখতে পারলে তবু রক্ষে, না হলে যখন তখন বড় ধরনের শারীরিক ঝামেলায় পড়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়

বাড়ির চারদিকের গাছ গাছালিতে নানা ধরনের পাখির কিচির-মিচির শুরু হয়ে গেছেঅর্থা ভোরের আলো পৌঁছে গেছে ওদের কাছেতাই ঘুম ভেঙ্গে খাবারের খোঁজে নামার সময় হয়ে গেছেতাই ওদের এত চেঁচামেচি আর ওড়াওড়ি

সত্যব্রত এবার দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেনদুই তিনবার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেনসমস্ত শরীর থেকে ঘুমের জড়তা অনেকটাই যেন কেটে গেলভোরে উঠানের ওপর দাঁড়িয়ে পূবদিকে মুখ করে কপালে হাত তুলে সূর্যপ্রণাম করলেনবিড়বিড় করে মন্ত্র আওড়ালেন অস্ফুট স্বরে

এই প্রাত্যহিক নিয়মটা বছরের পর বছর ধরে পালন করে আসছেন সত্যব্রততবে কখনও কখনও যে ব্যত্যয় হয়নি, তেমন নয়যখন বাইরে কোথাও গিয়েছেন বাড়ি ছেড়ে তখন হয়েছেতবে বাড়িতে থাকলে গ্রীষ্ম শীত বর্ষাÑ কখনও নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি

কোথায় কী একটু শব্দ হলোসত্যব্রত সামনের দিকে তাকালেনশব্দের উস খুঁজতে চাইলেনদেখলেন দুটো শালিক উড়ে এসে নেমেছে উঠানের ওপরসেখানে ঠোঁট দিয়ে টুক টুক করে কিছু তুলে নিচ্ছেউঠানের পূবদিকে তিন-চারটা আমগাছ আছে, পাশে একটা কাঁঠাল গাছ, কয়েক বছরের মধ্যে গাছগুলো বেশ বড় হয়ে গেছেএকটু দূরে আছে দুতিনটে সুপারী গাছ

আশপাশের সব গাছগুলোকে ছাড়িয়ে মাথা তুলেছে আকাশের দিকেগাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে একটা পায়ে চলা কাঁচা সরুপথ চলে গেছে দক্ষিণের বাগানের ওপাশে রেবতীদের বাড়িতেরেবতী সত্যব্রতর খুড়তো ভাইওই বাড়িতে তারা বেশ কয়েকজন একসঙ্গে থাকেসকাল-বিকাল আসা-যাওয়া আছেযখন-তখন কেউ না কেউ এ বাড়িতে আসে বা যায়

কিছু সময়ের মধ্যেই আরও ফর্সা হয়ে গেল চারদিকপূবদিকের গাছগুলোর পাতায় শিশির জমে আছে এখনওভোরের রোদ পড়ে চিক্ চিক্  করছেচোখ পুড়ানো হাল্কা সবুজ রঙের নতুন পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে উঠানের ওপরসত্যব্রত গভীর মমতা মাখানো দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছেন সেদিকেযদিও এমন দৃশ্য নতুন নয় তার কাছে

প্রায় প্রতিদিনই একা একা চারদিকের গভীর নৈঃশব্দের মধ্যে এমন দৃশ্য তার চোখে পড়েকিন্তু আজ কেন যেন মনে হচ্ছে এমন দৃশ্য তিনি আর হয়তো দেখতে পারবেন না কিছুদিন পরেবুকের ভেতর থেকে গভীর শূন্যতা মাখানো একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসে ভোরের হাওয়ায় মিলিয়ে যায়

কাল সারারাত প্রায় ঘুমাতেই পারেননি সত্যব্রতবারবার মনে হয়েছে আসলে সিদ্ধান্তটা কি ঠিক নিয়েছেন না কি ভুল নিয়েছেন ওদিকে যাবার কথা বলেযদি ওপারে যেতে না চাইতেন তবে তো এখানেই থেকে যেতে পারতেন জীবনের শেষ কটা দিনকিন্তু পরিবারের অন্যদের কথা ভেবেই এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে তাকেবিষয়টা নিয়ে ভেবেছেন দিন সাতেকের কম নয়

বারবার দোনামোনা করে শেষ পর্যন্ত এ রকম একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেতার একার সিদ্ধান্ত তিনি তো সবার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন নাসংসারে সবার বড় হবার যেমন কিছু সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধাও কম থাকে না

সত্যব্রত কিছুটা সময় হাঁটলেন উঠানেএক সময় শালিক দুটোকেও উড়ে যেতে দেখলেনআশপাশের গাছপালাগুলো ঝলমল করছে সূর্যের আলোয়সত্যব্রত ধীরে ধীরে হেটে চলে এলেন বড় ঘরের বারান্দায়বারান্দায় ঢুকেই টের পেলেন ভেতরের লোকজনেরও ঘুম ভেঙ্গেছেতাদেরও বিছানা ছেড়ে কাজকর্মে যাবার সময় হয়েছে

বেশ কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেনহেটেও ছিলেন উঠানের চৌহদ্দির ভেতরেফলে কিছুটা ক্লান্তি বোধ করছিলেন সত্যব্রততাই ঘরের ভেতরে ঢুকতেই বসার ইচ্ছে হলোদরজার কিছু দূরের চেয়ারটায় গিয়ে বসলেন এবারবসার সময় হাঁটুর হাড়ের জোড়ায় একটু মট করে শব্দ হলো কিনা ঠিক বুঝতে পারলেন নাকিন্তু আলগা একটু ব্যথার মোচড় ঠিকই টের পেলেনপরিষ্কার বুঝতে পারলেন, বয়স হয়েছেইচ্ছেমতো হাঁটাচলা বা দৌড়ঝাঁপ করার দিন শেষএবারে হাঁটাচলা হবে মেপে ঝেপেবুঝে শুনে

এটুকু চিন্তার মধ্যেই সেই বড় চিন্তাটা আবার এসে গেলতাইতো, বেশ রাতে কাল ঘুমাতে পেরেছিলেন নানা দুশ্চিন্তার মধ্যেএক সময় তার অজান্তেই বোধ হয় ঘুম এসে গিয়েছিল সব চিন্তাভাবনাকে ঢেকে দিয়েসত্যব্রত ঘুমিয়ে পড়েছিলেনতবে তাতে তেমন কিছু অসুবিধা হয়নিঘুম কিছু কম হলেও যথাসময়ে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল ভোরের দিকে

বসতে বসতে এবার নতুন করে আবার ফিরে এলো সেই চিন্তাটাচল্লিশ পঞ্চাশ বছরের এই ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হবে নতুন ঠিকানায়সেখানে কীভাবে আবার বসবাস শুরু হবে, সে চিন্তাতেই অস্থির হয়ে উঠেছেন সত্যব্রত মনে মনেছিটমহলের জীবন শেষ হবে এবার এই এতগুলো পরিবার আর মানুষেরবছরের পর বছর এই মাটিতে জীবন কেটেছে সবারকত জন্ম মৃত্যুর ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই মাটি, ঘরবাড়ি আর জল জংগলের সঙ্গে

এই সবকিছুকে পেছনে ফেলে চলে যেতে হবে দূরে কোথাওকোথায়, ঠিক জানাও নেইএসব চিন্তাভাবনা মনের ভেতরে সময় অসময়ে একেবারে স্তব্ধ করে দিচ্ছে সত্যব্রতকেআর কদিন তিনি বাঁচবেন, কে জানে! কিন্তু শেষের সেদিন কি আর খুব বেশি দূরে? জন্মমৃত্যুর কথা কেউ কি জানে! কখন যে নিঃশব্দে মৃত্যুদূত এসে কড়া নাড়বে সত্যব্রতর জীবনের দরজায়, সেটা কেউ কি জানে! সত্যব্রত নাতবে যে বয়স তখন নানারকম দুশ্চিন্তায় সময় কাটে সত্যব্রতরশত চেষ্টা করেও মন থেকে সেসব সরাতে পারেন নাভুলে থাকতে পারেন না

দুশ্চিন্তা যে অন্যদের মনেও উঁকি দেয় মাঝেমাঝে, সেটাও স্পষ্ট বুঝতে পারেন তিনিগতকাল নয়, পরশুদিন ছোটভাই দেবব্রত বলছিল, আমার কিন্তু আসলে দাদা ভয় করতিছে, কোথায় না কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে, কে জানে! একেবারে বিদেশ বিভুঁই মনে হবেনেসেখানে কি নতুন করি ঘর বানাতে হবে, জমি জিরেতই বা পাব কোথায়, বুঝতে পারছিনে

সে সবের কি ব্যবস্থা ওরা করবিনে! সত্যব্রত আস্তে আস্তে বলেনকিন্তু কথার মধ্যে হতাশার সুরটা ঠিক ধরা পড়েকথায় তেমন জোর পাওয়া যায় না

তুমিতো বলতেছ, দাদাদেবব্রত বলে, আমাদের এই ব্রাহ্মণবাড়ির লোকজন এ তল্লাট ছাড়ি গেলে চারদিক তো আন্ধার হয়ে যাবেও বাড়ির রমাপদরা এখন বলতিছে এখান থিকা যাবে নাদেখবা, আমরা চলে গেলি, ওরাও থাকবেনি নাপরে যাওনের ঝামেলা আছে, বলেন সত্যব্রত, সরকারী লিস্টিতে নাম না থাকলে পড়ে গেলে কোন সুযোগ-সুবিধাই পাওন যাইবেনে না

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, কী ভাবতে ভাবতে দেবব্রত সায় দেয় দাদার কথায়বলে, ঠিক বলছো, দাদাতোমার কথাই ঠিকএখন যতটা সুযোগ-সুবিধা পাওন যাবে, পরে তা আর পাওন যাবেনি নাএসব কথা এখন পরিষ্কার মনে পড়ে সত্যব্রতর আর তাতেই তিনি বুঝতে পারেন বাড়ির অরাদ্দ রীতিমতো অনিশ্চয়তায় ভুগছেদুশ্চিন্তায় কাতর হচ্ছেঠিক এই মুহূর্তে কেন যেন তার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়যদিও তখনকার সেইসব এখন কেমন ধূসরতায় ম্লান হয়ে এসেছেমনে পড়ে যায় বাবার কথা

বাবাও হয়তো এমনভাবে অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন যখন নদীভাঙ্গনের মুখে পড়ে একদিন যা কিছু ছিল সবই নিয়ে এখানে চলে এসেছিলেন আরও দুয়েকটা পরিবারের সঙ্গেতারপরে এখানেই স্থিত হয়েছিলেন অনেক ঝড়ঝাপটা পেরিয়েসত্যব্রতর বাবা গুরুপদ বেশ কয়েক বছর হলো মারা গেছেনমৃত্যুর আগে তিনিও কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন ছিটমহলের ঝামেলা নিয়ে

কিন্তু কোন উপায় না দেখে সবকিছু তিনি অনেকটা বাধ্য হয়েই মেনে নিয়েছিলেন অন্যদের সঙ্গে। (এরপর ৯ পৃষ্ঠায়)  মারা যাবার সময় যদিও বলে গিয়েছিলেন এসব এভােেব চিরদিন থাকবেনা, থাকতে পারে নামানুষের জটিলতা সারাজীবন ধরে কেউ সহ্য করতে চায় না, জটিলতার শৃঙ্খল ভাঙ্গার জন্য সব সময় সে উন্মুখ থাকে, এটা প্রকৃতির নিয়ম

সত্যব্রতর মনে হয়, সেই নিয়মেই বোধহয় আজকে দ্বিতীয়বারের মতো বাস্তুচ্যুত হতে হচ্ছে তাদেরসত্যব্রত মনে মনে হাসেন, দেশভাগের সময়ও তাদের পরিবার এই দেশ ছেড়ে ওদেশে যায়নিজন্মভূমির মাটি কামড়ে পড়ে ছিল এদেশেই তার বাপ ঠাকুরদাতবে তখন যদি সবাই ও দেশে মানে ভারতে চলে যেত তাহলে আজকে নতুন করে আর সেখানে যাবার প্রয়োজন হতো না

যতই বয়স বাড়ছে ততই যেন স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছেন সত্যব্রতসেই কোন ছোট বেলায় কত না ঘটনা এখন যেন ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠছে

তবে সেই স্মৃতির মধ্যেই বারবার ফিরে আসছে বাবার মুখদীর্ঘজীবন পেয়েছিলেন তিনিএকসময় প্রথম জীবনে শহরে সরকারী চাকরিতে ছিলেনকিন্তু সে চাকরিতে শেষ পর্যন্ত থাকতে পারেননিপারিবারিক কারণেই এক সময় গ্রামের বাড়িতে এসে আর ফিরে যাওয়া হয়নি তারজায়গা জমি আর বাড়ির টান তাকে ধরে রেখেছিল গ্রামেই

তারপর অন্য আর সবার মতোই, কিছু দূরের এক গ্রামের মেয়েকে পছন্দ করেন তার সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়েছিল বেশ ধুমধাম করে পারিবারিকভাবেবাবাও এসব মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে ওখানকার মানুষদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেনতারপর আস্তে আস্তে নিজ বুদ্ধিবলে অর্থবিত্তে তুলনামূলকভাবে ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন সবার মধ্য থেকে

গুরুপদ গাছপালা আর পাখি ভালবাসতেনবাবার এই ভালবাসার কথা জানতেন সত্যব্রত ছোটবেলায়দেখতেন বাবা কি পরম মমতায় ভোরবেলা পাখিগুলোকে ডেকে ডেকে খাবার দিতেনএভাবে দিনের পর দিন ডাকা আর খাবার দেয়ার জন্য পাখিদের কাছে খুব বিশ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলেনপাখিগুলো অনেক সময় তার হাত থেকে খাবার নিয়ে নিতনির্ভয়ে আশপাশে ঘুর ঘুর করত

গুরুপদ বলতেন, চারপাশে এই যে সবুজ প্রকৃতি পাখিদের মতো ওদেরও প্রাণ আছেআমরা, মানুষেরা এই বিশ্বচরাচরের অনেক কথাই জানি না, বুঝতে পারি নাকিন্তু ওরা পারেমানুষের চাইতে ওরা প্রকৃতি আর বনবনানীর অনেক কাছাকাছি থাকেযতদিন যাচ্ছে প্রকৃতির কাছে মানুষ ক্রমশ অবিশ্বাসী হয়ে উঠছেকারণ এই মানুষ নিজের স্বার্থ আর লোভের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে উজার করে দিচ্ছে প্রকৃতি থেকে সবুজ অরণ্যভূমি

এই যথেচ্ছায় মানুষের প্রকৃতি আর কতদিন সহ্য করবে? এই সব কথা বলতে বলতে গুরুপদের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠতোবাবার এসব কথার প্রকৃত অর্থ সেই বয়সে বোঝেননি সত্যব্রতপরে মনে হয়েছে তাহলে এই জন্যই কি ভূমিকম্প হয়! নিজের শক্তির জানান দেয় প্রকৃতিই? মানুষকে সতর্ক করে দেয়? এসব কথা ভাবতে ভাবতে বাবাকে কখনও কখনও যেন অচেনা মনে হতো সত্যব্রতরবাবার কাছ থেকে আরেকটা অভ্যাস রপ্ত করেছেন সত্যব্রতযে অভ্যাসটা এখনও আছেমাঝে মাঝে চেষ্টা করেছেন এটাকে বাদ দিতে, কিন্তু পারেননিকেননা যুগ যুগ ধরে চলে আসা অভ্যাসটাকে শেষ পর্যন্ত রয়েই গিয়েছে

তবে সেটা দেড়যুগ আগে ছেড়েছেন সেটা হলো ধূমপানের অভ্যাসশহরে চাকরি করার সময় অভ্যাস বা নেশাটা তাকে ধরেছিল বেশ ভালভাবেই কিন্তু বাড়িতে এসে ধীরে ধীরে ওই কু-অভ্যাসটিকে ত্যাগ করতে পেরেছিলেনধারণা ছিল, তিনি যদি ধূমপানের নেশায় আসক্ত না হন তা হলে তার সন্তানরাও এই নেশায় আসক্ত হবে নাতার এই উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল, সত্যব্রত কখনও ধূমপানে আসক্ত হননি

তবে যে অভ্যাসটি তিনি ছাড়তে পারেনি সেটা হলো নিজে নিজে বারান্দার বাইরে আলগা চলায়শুকনা নারিকেল পাতা দিয়ে জ্বাল দিয়ে দুধ চিনি ছাড়া এক বা দুকাপ চা খাওয়াসকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ উঠান আর বাড়ির আশপাশে হাঁটাচলা করে ফিরে এসে চা বানিয়ে খাওয়া এখনও চলছেআজও সেই আয়োজনই করছেনএখন নানারকম চিন্তাভাবনার মধ্যেও সে আয়োজনের র্হের্ফে হয়নি

হঠা উঠানে কেউ যেন কথা বলছে মনে হলো সত্যব্রতর

কিন্তু এত তাড়াতাড়ি বাড়ির বাইরের কেউ কি এলো? কারুর তো আসার কথা নেই এত ভোরেতাহলে! হঠা মনে হলো, আসেলে এখন আসবে তো রেবতীভোরবেলা জেঠুর সঙ্গে একটু চা খেতে সে প্রায় নিয়মিতই আসে ঘুম থেকে উঠেএটা এখন তারও অনেকটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে

সত্যব্রত যতই বাধা দেন, মৃদু বকাঝকাও করেনকিন্তু কাজ হয় নাও হেসেই সব উড়িয়ে দেয়, জেঠু আমার জন্য তোমার কত খরচ হয় বলতো? এ জন্য তুমি আমার সঙ্গে এ রকম কর?

আমি কি তাই বলছি নাকি রেÑ

গুরুপদ তাকান রেবতীর দিকে

তা হলে, কী বলছ?

তোর যাতে এ সবে অভ্যেস না হয়ে যায়-

তাই যদি হবেনে তবে তোমার অভ্যাসটা ছাড়নি কেন?

চুপ করে থাকেন সত্যব্রতএ কথার উত্তর দিলেও আবার নতুন কথা শুরু করবেÑ

কথা না-ই কেন, জেঠু?

হাসতে থাকে রেবতী, দাও, দাও তাড়াতাড়ি চাটা করতো জেঠু বেরুতে হবেনে একবার, তাড়া আছেএবারও সত্যব্রত কোন কথা না বলে চা তৈরির কাজে লেগে যানরেবতী শুকনো নারিকেল পাতাগুলো এগিয়ে দেয় জেঠুর কাছেএই নাও, ধরোÑ

গুরুপদ মনে মনে হাসেন, এ পাগলকে যত তাড়াতাড়ি বিদেয় করা যায়, সেটাই ভালÑ

কিন্তু রেবতী থামে নাবলে, জেঠু, আসলে তোমরা কোথায় যাচ্ছো, সেটা কি ঠিক হয়েছে? কেউ তো ঠিকভাবে কিছু বলতে পারছিনেÑ নতুন করে আবার কোথায় কোন ঝামেলা বাধাবেনে, কে জানে!

রেবতীর গলায় শংকা ফুটে ওঠে

চা হয়ে গিয়েছিলএকটা কাঁচের গ্লাসে চা ঢেলে রেবতীর দিকে এগিয়ে দেন সত্যব্রত, নে ধরÑ

রেবতী চা নিয়ে চুমুক দেয়পরমুহূর্তেই একটু থামে তারপর হঠা চেচিয়ে ওঠে, এই, আবার সেই কাজটাই তো করলে, জেঠুÑ

সত্যব্রত চমকে ওঠেন, আবার কী হলো রে!

চিনিই তো দাওনিআমি কি তোমার মতো চিনি ছাড়া খাই?

তাই তো, অপরাধীর ভাব এনে মুখে সত্যব্রত রেবতীর হাতে থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে নেন, ভারি ভুল হয়ে গেলতোÑ দে, চিনি দিয়ে দিচ্ছিÑ

জেঠু এ কাজটা তুমি কিন্তু মাঝে মাঝেই করেেছা আজকাল, রেবতী বলতে থাকে, কী এতসব ভাবছো, তুমি? সব ভুলে যাচ্ছোÑ

বয়স হচ্ছে না, সত্যব্রত বলেন, তোর বয়স হলে তোরও এমনি হবে দেখিস্Ñ

সত্যব্রতর কথা শুনে কিছুক্ষণ অপলক তার দিকে তাকিয়ে থাকে রেবতীপরে বলে, তাতো বুঝলাম, আমার বয়স হলি পরে তোমার মতো ভুলে যাবতা তুমি সেটা দেখবে কেমন করি? তুমি তো আমাদের কাছে থাকছোনেÑ

তাইতোÑ! সত্যব্রত রেবতীর কথা শুনে থমকে যান হঠাচায়ের খালি হয়ে যাওয়া গ্লাস দুটো ধরেছিলেন একবার ধোবেন বলেআনমনে কাপ দুটো আবার নামিয়ে রাখলেন নিচেতাই তো, তুই তো ঠিকই বলেছিস্Ñ

আমি ঠিকই বলি, জেঠুÑ মৃদু মৃদু হাসে রেবতী, এখনও চিন্তা করি দ্যাখো, যাবে কি, যাবে নাÑ

সত্যব্রত কোন কথা বলেন না

অপলকে শুধু তাকিয়ে থাকেন উঠোনের দিকেউঠোনের ওপর এখন শাদা ফিতের মতো পড়ে থাকা ভোরের হালকা রোদের ঝিকিমিকিওপাশে হালকা সবুজ পাতার ওপরে ছোট ছোট পাখিদের ওড়াওড়ি চলছেইআস্তে আস্তে রোদ বাড়ছেআশপাশের বাড়িগুলো থেকে নানা ধরনের শব্দ আসছে হাওয়ায়নতুন দিন শুরু হয়ে গেছেসবাই যার যার কাজে লেগে যাচ্ছেএসবকিছুই ছবির মতো মনে হয় সত্যব্রতর কাছেমনের ভেতরে যেন গেঁথে আছেনিত্যদিনের অতি পরিচিত আয়োজন এসব চলছে বছরের পর বছর ধরেসব যেন অভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেএসবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে দূরে কোথাও! অজানা বিভুঁইয়ে! এসব কথা মনে হলেই মনের ভেতরে যেন কোথায় একটা প্রচ- ভয়ের আবহ টের পান সত্যব্রতচারদিক কেমন অচেনা হয়ে যেতে থাকে

সত্যব্রত বুঝতে পারেন এ বাড়ির সবার মনের মধ্যেই এই ধরনের একটা ভয় আর অনিশ্চয়তার দোদুল্যমানতা কাজ করে যাচ্ছেসরাসরি কেউ বলছে নাকিন্তু চোখের দৃষ্টিতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়কাজে-কর্মে তেমন যে মন নেই, সেটাও বোঝা যায় চলাফেরার মধ্য দিয়ে

কী করবেন সত্যব্রত? এ প্রশ্নটির উত্তর কিছুতেই যেন স্থির করতে পারেন না! আবার ভুল হয়ে যাবে না তো সবকিছুতে? এ-ও আরেক ভয়! পরে যদি সারা পরিবারটিই কোন না কোনভাবে বিপদের মুখে পড়ে যায়, তখন?

এটা তো ঠিক, এখানে সবাইকে নিয়ে যেমন আছেন, তাতে একটা স্বস্তি আছেনিরাপত্তাও আছেওদিকে গিয়ে যদিÑ আর ভাবতে পারেন না সত্যব্রতএই বয়সে এসে আজ আবার কোন এক পরীক্ষার মধ্যে পড়ে গেলেন সত্যব্রতকেন না সবাই তো এক রকম তার বুদ্ধি বিবেচনা আর সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে বসে আছে এখনওপরিষ্কার করে কেউ কিছু বলছেও না তার মুখের ওপরে

কী এ্যাতো ভাবতিছ, জেঠু! হাঁটুতে মৃদু ধাক্কা দেয় রেবতীআমি যাইÑ বলতে বলতে দ্রুত নেমে যায়  উঠোনেতারপর দৌড় দেয় মাঠের দিকেসত্যব্রত ভাবনার দায় দায়িত্ব নেইআপন মনে ঘুরছে ফিরছে, দুষ্টুমি করছে পরিচিত মানুুষ আর পরিবেশের মধ্যে! এমন দিন আর কোনদিন ফিরে পাবেন না সত্যব্রত

বুকচিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে

দীর্ঘদিনের অভ্যাসে হঠা যেন চিড় ধরে যায় সত্যব্রতরএমন তো সাধারণত হয় নাঘুমের সমস্যা তার কোনদিনই ছিল নাখেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়াটাই এতদিনের অভ্যাস

কিন্তু আজ যে কি হয়েছে, কে জানে! যথাসময়ে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ার পর মাথার মধ্যে এতসব চিন্তাভাবনা এলো যে ঘুমটা চটে গেল একসময়কিন্তু চিন্তাভাবনার তো শেষ হলো নাআসলে সবটাই দুশ্চিন্তা

এদিকে দিনে দিনে সংসারটা গেছে ছোট হয়েআগের মতো আর ভরা নেইসত্যব্রতর স্ত্রী পার্বতী গত হয়েছেন, তাও বছর সাতেক হয়ে গেলছেলে একটা আছে শুভব্রত, সে থাকে কলকাতায়মা মারা যাবার পর সেই যে কলকাতায় গেল আর ফিরল নাওখানেই চাকরি-বাকরি করেবিবাহও করেছে ওর ওখানেকালভদ্রে আসেবিয়ের সময় এবং পরে এসেছিল দুবারতবে যোগাযোগটা রাখে বাড়ির সঙ্গেছিটমহলের ব্যাপার নিয়ে যখন কথাবার্তা চলছিল তখন শুভব্রত সোজাসুজি বলেছিল, এবারে ওখানকার পাট চুকিয়ে সবাই এদিকে চলে এসোসুযোগ যখন হয়েছে, এই সুযোগটা নষ্ট কর নাবৌমাও কথায় কথায় শুভর কথায়ই সায় দিয়েছিল

সত্যব্রত ভাবেন, আসলে মনের ভেতরে ছেলের প্রতি যে টান রয়ে গেছে তার কারণেই এদিকটা ছেড়ে ওদিকে যাবার ইচ্ছেটা দেখা দিয়েছেপার্বতী বেঁচে থাকলে ছেলের টানে সেও একপায়ে রাজি হয়ে যেত ওদিকে যেতে

এদিকে ছোট ভাই দেবব্রত যতই সত্যব্রতর কথায় সায় দিক কিন্তু পরে আবার অনিশ্চয়তার কথা বলে, অনাগত ভবিষ্যতে যদি অসুবিধা দেখা দেয় তখন তারা কোথায় যাবে? এ প্রশ্নও তোলেসত্যব্রত এসব কথার মধ্য থেকে দেবব্রতর অনীহা ভাবটা ঠিক বুঝতে পারেন

এসব নানা চিন্তাভাবনার মধ্যেই একসময় দুর্বল হয়ে বোধহয় নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন সত্যব্রত¯œায়ূর ওপর বেশি চাপ সহ্য হচ্ছিল নাকিন্তু ভোরের দিকে হঠা ঘুম ভেঙ্গে গেল অদ্ভুত কিছু স্বপ্ন দেখেচোখ খুলে দেখেন ঘর অন্ধকার

রাত শেষ হয়নিআন্দাজে বুঝলেন এখনও অন্ধকার থাকলেও ভোর হতে আর বেশি দেরি নেইকিন্তু স্বপ্নে এসব কী দেখলেন সত্যব্রতসেই নদীভাঙ্গন, সেই ঘরদোর ভেঙ্গে অন্য কোথাও চলে যাওয়াএসব স্বপ্ন  এখন কেন দেখলেন, সত্যব্রত বুঝতে পারলেন নাতাহলে কি অবচেতন মনের কোথাও থেকে উঠে এসেছে এসব স্বপ্ন এখন, যখন নতুন করে আবার ঘরদোর ভেঙ্গে অন্য কোথাও যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন  সত্যব্রত!

বাকি রাতটুকু আর ঘুমাতে পারলেন না, মনের ভেতরে কেমন যেন তোলপাড় চলছেখোলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন, দূর আকাশে আলোর আভাস ফুটছে অন্ধকার সরিয়ে দিয়েশেষরাতের অতল নৈঃশব্দের মধ্যে এখন কেন জানি হঠা পার্বতীর কথা মনে পড়ল সত্যব্রতরসে পাশে নেই কতদিন! সে ঘুমিয়ে আছে এই মাটিতেইতাকে ছেড়ে যেতেও তো মনে চাইছে নামনে পড়ছে রেবতীর কথা, আশপাশের আরও অনেকের কথাএদের সবাইকে, সর্বোপরি এই জন্মভূমিকে ছেড়ে আসলে কি কোনদিন দূরে কোথাও যেতে পারবেন সত্যব্রত?