ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

প্রতিশোধের অস্ত্র

সৈয়দা মাসুদা বনি

প্রকাশিত: ০১:৫০, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২

প্রতিশোধের অস্ত্র

প্রতিশোধের অস্ত্র

সন্ধ্যাবেলার সময়টা ভাল নাএই সময়ে মানুষ বড় একাকী বোধ করেবুকের মাঝে কেন জানি হু হু করে শোকের বাতাস বয়তুলসীতলায় সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বেলে রাধারানীরও বুকের মাঝে এ রকম একটা বোধ হতে থাকেকতক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বলতে পারে নাহঠা কর্কশ শব্দ করে উড়ে যাওয়া একটা পাখির ডাকে সংবি ফেরে রাধারানীর

কতগুলো দিন, না না- মাস হয়ে যায় কেউ নিশ্চিন্তে নিজের আঙিনায় বেরোতেও ভয় পায় ভীষণসেই কবে থেকে বর্গিরা এসে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে দেশটায়রাধার অবশ্য ভয়ডর নেইকারণ ওদের এদিকটায় তেমন কেউ আসেই না বলতে গেলেশ্বশুর মশায় নরেন পাল ছিলেন ভাবুক মানুষপালপাড়ার  নানান হৈ হট্টগোল ভাল না লাগায় গাঁয়ের এই একদম শেষে এক টুকরো জায়গায় শান্তির নীড় বেঁধেছিল

স্ত্রী গত হওয়ার পর নরেন পালকে সারাবেলা বাঁশি হাতেই হেথা হোথা বসে থাকতে দেখত গ্রামের লোকেরাএকমাত্র ছেলে ধীরেনের দিকেও খেয়াল ছিল না তেমন একটা

রাধার বিয়ে হয়ে সংসারে আসার বছর দুয়েক পরে গত হয় নরেন পালএখন এই নির্জন জায়গায় ওরা দুটি মাত্র প্রাণী-রাধারানী আর ধীরেন পালদেশের যে অবস্থা তাতে ভয়ে রাধার বুক কাঁপেএইতো গতকালই মোক্ষদা মাসী ভিক্ষে চাইতে এসে বলে গেল পাকিস্তানী হায়েনা সেনারা গঞ্জে এসে আস্তানা গেঁড়েছেদলে দলে মানুষ মারছে আর নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছেমানুষ যেদিকে যেভাবে পারছে পালাচ্ছে ঘটিভাটি-ভিটামাটি রেখে

অনিশ্চিত ভবিষ্যতএক বেলার ভাতের চালটুকুও নেইভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণটুকু হাতে নিয়ে চলে যাচ্ছে সবাইপলায়নপরদেরও সঙ্গে কি যেতে হবে আমাদেরও? ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রাধারপুরনো ঘরের প্রায় ভাঙতে বসা ঘরের বেড়ার দিকে তাকিয়ে থাকেসেদিনই স্বামী ধীরেনকে জিজ্ঞেস করছিল, এবার পূজা হবিনে? ঘরডাও তো সারা লাগবিএই ভাঙ্গা ঘরে মানুষ থাকতি পারে?

আর তোর পূজা আর ঘর সারা!

ক্যান কি হয়িছে?

শুনতে পাচ্ছিস না খান সেনা আর রাজাকারদের কারবারমাঠে ধানগুলে পাকতিছে, সেগুলা ঘরে তুলবের পারব কিনা সেইডেই এহন একমাত্র চিন্তেধীরেনের এমন কথায় মন খারাপ হয় রাধারতখনই মনে হয় আজ সাঁঝ গড়িয়ে আঁধার নেমে এলো, সেতো এখনও এলো না

ও রাধা জল তোলা আছে? ধীরেনের হাঁক শুনে আশ্বস্ত রাধা, যাক তবুও তো কোন বিপদ হয়নিঘরের মানুষ ঘরে ফিরেছে

ঝাঁ চকচকে কাস্তে দরজার পাশে বেড়ার ফাঁকে গুঁজে রাখতে রাখতে রাখতে তাকায় স্ত্রী রাধার দিকে, এইটে ধার করাতে গেছিলেম, সেইজন্যি দেরি হলোকাল ধান কাটপ, ধান না কাটলে ভাত খাব কিভাবে? ধান কাটলেই না আমরা ভাত খাবের পারব

বাড়ির পেছনের জঙলায় মুই ঘেঁচু খুঁজে পেয়েছিওগুলো কিছুদিন খেতে পারব, স্বামীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে রাধা

ধীরেন রাগ করে, সারাদিন জঙলায় ঘুরিস ক্যা? সাপখোপ আছে না?

সন্ধ্যার সামান্য আগে হাতমুখ ধুয়ে এসে কেবলই দুটো মুড়ি মুখে দিয়েছিল ধীরেন, বাইরে থেকে ডাক আসে- ও ধীরেন বাড়িত আছিস?

ধীরেন আর বৌ রাধারানী চুপ

আবার গলা শোনা যায়, ও ধীরেন একটু বাইরে আয়কথা ছিল

ধীরেন অবাক, তাদের বাড়ির এদিকটায় তো এ সময় কোনদিন কেউ আসে নাআর এটা আক্কাস মুনশির গলা না? শয়তানটা এখন এখানে কেন? তাকায় রাধারানীর দিকেওর মুখ ভয়ে ফ্যাকাসেকি করবে বুঝে উঠতে পারে না ধীরেনআবার ডাকে আক্কাস মুনশি বড় মিষ্টি গলায়, ও ধীরেন বাইরে আয় একটু

কিচ্ছু করার থাকে না ধীরেনেরদরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসেছোট্ট উঠানে নেমে দেখে মুনশি একা আসে নাই সঙ্গে আরও চার পাঁচজন খাকি পোশাকের লোক, প্রত্যেকের হাতে অস্ত্রলোকগুলো দেশী নাদেখেই চিনতে পারে, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে শহরে গিয়ে  আর্মি দেখেছেযা বোঝার বুঝে নেয় ধীরেন

আশপাশের অনেক হিন্দুকে ধরে নিয়ে গেছে আক্কাস মুনশি আর পাকিস্তানী আর্মিরাসেই মানুষগুলো আর ফেরেনিলোকমুখে শুনেছে, হিন্দুদের সবাইকে এরা নদীতে নামিয়ে কোমড় পানিতে দাঁড় করিয়ে গুলি মেরে দিচ্ছেমানুষগুলো লাশ হয়ে পানিতে ভেসে যায়

কাকা? কী মনে কইরে? ধীরেনের গলা দিয়ে শব্দ বের হয় নাশুকিয়ে গেছে মুখ

আলাম তোগেরে দেখতেআমাগে একটা দায়িত্ব আছে না? ও ধীরেন রাধারানী কনে? পশ্চিমা সাহেবরা ওর গান শুনবের আইছেকত সুন্দর গান গায় তোর বউডাকদিনি-

আক্কাসের কথায় গা জ্বলে ধীরেনের, কিন্তু সামলে নেয়, ও ঘরেই আছে, শরীর ভাল না কাকাএখন ওসব গান-টান শুনাবের পারবি নাআপনেরা পরে আহেন

কইস কি? তোর  বৌ অসুস্থ? তালি তো তাক ভাল কইরে দেখা উচিতচলেন সার আমরা ভেতরে যাই দেখি কিরাম বিমার হয়েছে আমাদের রাধারানীর

যা বোঝার বুঝে যায় ধীরেন পালবেড়ায় সঙ্গে গেঁথে রাখা বাঁশের লাঠিটা একটানে হাতে তুলে নিয়ে হুংকার দিয়ে ওঠে, খবরদার এক পাও আগালি মাথা ফাঁক করে দিব

সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানী  সৈনার অস্ত্র গর্জে ওঠেইয়ে মাবুদ! ইয়েতো মুক্তি হ্যায়!

নিজের বাড়ির নিজের উঠানে বুকের মধ্যে গুলি নিয়ে ছটফট করতে থাকে ধীরেন পালবিস্ফোরিত চোখে ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে এই ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলো ঘটে যেতে দেখে রাধারানীপ্রাণপ্রিয় স্বামীর তরতাজা দেহটা কেমন ছটফট করতে করতে নিস্তেজ হয়ে যায় মাত্র মুহূর্তের মধ্যেরাধা চিকার করতেও ভুলে যায়পরমুহূর্তেই দেখে জানোয়ারগুলো এগিয়ে আসছে ঘরের দরজার দিকেমাথার মধ্যে আগুন জ্বলে ওঠে রাধার

ঘরের মধ্যে পাকিস্তানী আর্মি ঢোকা মাত্র রাধারানী দরজার পাশে বেড়ায় গুঁজে রাখা ধারাল কাস্তে একটানে খুলে নিয়ে চালিয়ে দেয়, আরেক হাতে ছিনিয়ে নেয় আর্মির হাতের পিস্তলকি ভয়ঙ্কর কাজ করছে জানে না রাধারানীশুধু মনে হয় সামনে এক অসুর দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং একে বধ করাই একমাত্র দায়িত্ব এখনকি হলো না হলো দেখার জন্য না দাঁড়িয়ে থেকে রাধা ওই কাস্তে দিয়ে ঘরের পেছনের ভাঙ্গা বেড়াটা দুই কোপে কেটে নামিয়ে দিয়ে অন্ধকার জঙলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে

অমাবস্যার রাতের আঁধারেও এই জঙলা হাতের তালুর মতোই চেনা রাধার, সারাদিন এখানেই জঙলার মধ্যে ঘোরেঘুরতে ঘুরতে আগেরদিনই জঙলার মাঝামাঝি জায়গায় একটা আড়াল হয়ে থাকা গর্তে বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলসেদিকেই এগিয়ে যায় ওগর্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকলে তাকে কেউ খুঁজে পাবে না

আক্কাস মুনশি আর আর্মিদের চিকার চেঁচামেচি, দৌড়ঝাঁপ একসময় কমে আসেহায়েনারা এদিকটায় বেশিদূর খোঁজাখুঁজি করার সাহস করে নাতবে অসুরটাকে যে খতম করতে পেরেছে এটাই সান্ত¡নাহঠাই রাধারানীর মনে হয়- স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে গেল চোখের সামনে চিরতরে, ছটফট করতে করতে চোখের সামনে মানুষটা মারা গেল! আমার চোখ কেন শুকনো? কাঁদতে পারে নাওর ভেতরে এক ভয়ঙ্কর শক্তি তৈরি হয়যেন এক ভয়ঙ্কর আগুন, প্রতিশোধের আগুন

রাত আরও গভীর হলে রাধারানী লুকানো জায়গা থেকে বেরোয়, চুপিসারে আগাতে থাকেজানে আমাকে এখন কি করতে হবে! শহীদ ধীরেনের স্ত্রী রাধারানী মুক্তি যোদ্ধাদের খোঁজে এগুতে থাকেদুর্দমনীয় গতিতে এগুতে থাকেবাতাসে শারীর আঁচল উড়তে থাকে পতাকার মতো পতপত করেআঁধারে জ্বলতে থাকে ওর চোখ অঙ্গারের মতোহাতে একটি অস্ত্র-প্রতিশোধের অস্ত্র

 [সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে]