ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ জুলাই ২০২৪, ৬ শ্রাবণ ১৪৩১

বর্ষাদিনের ফ্যাশন

রেজা ফারুক

প্রকাশিত: ২০:২৭, ২৩ জুন ২০২৪

বর্ষাদিনের ফ্যাশন

.

বর্ষা এসে দাঁড়িয়েছে অবিশ্রাম বাদলাঝরা দেবদারু উঠোনের আবছা ব্যালকনিতে। বৃষ্টির ডোরবেল বাজিয়ে বর্ষার নৈসর্গিক আগমন সংবাদটি দিয়ে দেয় রেশমীজ্বলা কদম, কেয়া, কেতকী, গন্ধরাজ, জুঁই, বেলি, হাস্নুহেনা প্রভৃতি ফুলের সৌরভ। বর্ষার নিবিড় গুঞ্জরনে চঞ্চল হয়ে ওঠে মন। উদাস ভাবনায় ডুবে যায় সত্তার স্পন্দন। আষাঢ় এবং শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল হলেও প্রকৃতপক্ষে চৈত্রসংক্রান্তির রেলব্রিজ পেরুতে পেরুতে বর্ষণজ্বলা ট্রেনটি এসে থামে বৈশাখের ধূলোজমা ধূসর জংশনে। ইস্টিশনের লাল ঝাউফুল ফোটা ঝকঝকে টিনের চালে যেন হঠাৎই বর্ষার গুঞ্জন জেগে ওঠে। বর্ষা শুধু বৃষ্টি বা বর্ষণ নয়। বর্ষা এই রূপসী বাংলার নদী, খাল, বিল, হাওড়, বাওড়, শস্যক্ষেত্রের আকণ্ঠ উর্বরতার জন্যও রাখে এক অনশ্বর অবদান।

স্রষ্টার অনুপম এই ঋতুবৈচিত্র্য ছন্দের গ্রন্থিতে জীবন যেমন প্রবাহিত হয় তেমনি এক অদৃশ্য অসীম প্রাকৃতিক ধারার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয় প্রকৃতি। যে প্রকৃতি থেকে মানুষ পায় বাঁচার উপাদান। পাহাড়, পর্বত, বন, অরণ্য, নদী, সমুদ্র সব, সবকিছুই প্রকৃতির এক অমোঘ প্রাসঙ্গিক বিষয়। বৈশাখের ঝড়ো দিন পেরিয়ে বর্ষা এসে বসে জ্যৈষ্ঠের তাপদগ্ধ প্রাচীন জমিদার বাড়ির কাকচক্ষু জলের দীঘির পলেস্তারা খসে যাওয়া মোজেইকজ্বলা শানবাঁধানো ঘাটে। তারপর ধীরে ধীরে সারা আকাশ আর সারা দিগন্তে জেগে ওঠে নীলাম্বর মেঘ রাশি। জেগে ওঠে অজস্র মেঘের প্যাগোডা। অবশেষে জনজীবনের পুরোভাগে এসে হানা দেয় বর্ষা, তথা বর্ষাকাল।

চলে বর্ষার দাপট কয়েক মাসজুড়ে। বিশেষ করে আচমকা বৃষ্টি ঝাপিয়ে পড়ে সব এলোমেলো করে দেয়।

গ্রামবাংলায় বর্ষার যে চিত্র নগর জীবনে তার ছবিটা একটু ভিন্ন। গাঁওগেরামে বর্ষা অভিন্ন বৃষ্টির মতো হলেও খাল বিল পানিতে বর্ষাকে মনে হয় যেন কোনো রাজদুহিতার জ্বলজ্বলে গলদেশে হীরের নেকলেসের মতো। মনে হয় যেন ডুবোচরের ওপর ভেসে থাকা বালিহাঁসের নির্জন ছায়া। নদীর কিনারে ফোটা আকন্দ ফুলের অধরে বর্ষার দুপুরগুলো ঝকমক করে উঠে এমন আভা ছড়ায় যে মনে হয় এমন অনন্য রূপোজ্জ্বলতা বুঝি কখনোই চোখে পড়েনি। বৃষ্টির দিনে গ্রামগঞ্জের কাদামাখা পথঘাট, হাল্কা বৃষ্টির পানিতে ডোবা ঘাসের ডগায় বর্ণিল ফড়িং আর প্রজাপতিদের চঞ্চল উড়ন্ত পালকের ফড়ফড় শব্দে যেন বর্ষার মায়াবী ঝিলিক-ঝলক দিয়ে ওঠে। গ্রামের বর্ষা যেন কোমল এক অভিব্যক্তি নিয়ে জীবনকে ছুঁয়ে যায়। কালেভদ্রে বর্ষা আবার জীবনকে বিপর্যস্তও করে তোলে বন্যা, প্লাবন।

নগরজীবনে বাদল দিনের আবহাওয়াটা একটু অন্য রকম ভাবেই ধরা দেয়। প্রচ- কর্মমুখরতায়, ছুটন্ত বাসের জানালায়, হুডতোলা, নেকাবপরা রিকশায়, রেস্তোরাঁর গুঞ্জরনশীল টেবিলে বসে বন্ধুর সঙ্গে গল্পের ভেতর, অযাচিত বৃষ্টির তাড়া খেয়ে কোনো শপিংমলের ঝলমলে কফিশপের আড্ডায়, পাশের টেবিলে বসা কোনো সুন্দরী কলিগের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা আর বাসস্টপে বাসের ছাউনিতলে ভিড়ের মধ্যেও বর্ষা ভেজা রুমাল থেকে পানি নিংড়াতে নিংড়াতে এসে মিশে যায় বর্ষাং রূপোচ্ছ্বটা। বর্ষায় নগরজীবনে একচিলতে আনন্দের পাশাপাশি বিড়ম্বনারও সৃষ্টি করে।

তার পরও বর্ষা আসে। অনন্তকাল বর্ষা আসবে এই বাংলায় সাদা পরীর মতো নীল সিল্কের স্কার্ফ উড়িয়ে। ষড়ঋতুর এই বাংলায় বর্ষার প্রভাব যেমন অপরিসীম। তেমনি দৈনন্দিন জীবনেও ব্যাপক পরিবর্তন চলে আসে নিয়ম মেনে। যার মধ্যে অন্যতম হলো পোশাক। বিশেষ করে অফিস, ইউনিভার্সিটি গোয়িং নারীদের ক্ষেত্রে বর্ষার ছাপটা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায় চোখ ফেরালেই। কেননা কর্মজীবী নারীদের ঘর থেকে বেরুনোর আগেই ভেবে নিতে হয় যেÑ পথে যেতে যেতে এই বুঝি বৃষ্টি এলো! তখন প্রথমেই প্রয়োজন হয় ছাতার। এরপর চলে আসে রাস্তার পানি কাদার বিড়ম্বনার বিষয়টি। যার দরুন কর্মজীবী মহিলাদের প্রথম পছন্দ হলো সিল্কের শাড়ি। যেন বৃষ্টিতে এক-আধটু ভিজলেও দ্রুত ভেজা শাড়িটা শুকিয়ে নেওয়া যায়। একই কথা চলে আসে সালোয়ার কামিজের বেলাতেও। যাদের পছন্দ থ্রি পিস- তারাও সিল্ক, জর্জেট কিংবা এই জাতীয় ড্রেসে কম্ফোর্ট ফিল করেন। বর্ষায় যেহেতু পানি, কাদা ভিজে যাওয়ার অনুষঙ্গটা চলে আসে।

তাই বর্ষাদিনে ফ্যাশনের বিষয়টা মাথায় রেখেই পোশাকের রং নির্বাচনেও হতে হয় সচেতন। বর্ষায় সাধারণত নীল, এ্যাশসহ, গাঢ় এবং প্রিন্টেড শাড়ি, থ্রি-পিসই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এর সঙ্গে মানানসই ভ্যানিটি ব্যাগ, কালার ফুল ছাতায় এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের রূপ ফুটে ওঠে কর্মজীবী নারীদের বেলায়। এর সঙ্গে হাল্কা সাজগোজ, হিলজাতীয় সুভীষণ রকম এ্যাট্রাকটিভ হয়ে ওঠে বর্ষাকালজুড়ে। একই কথা প্রযোজ্য গৃহিণীদের বেলাতেও। যারা বাইরে বের হন।

তারাও বিষয়টিকে ভাবনায় রাখেন। বর্ষার এই ছবিটা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিকই নয়। একই দৃশ্যপট পরিলক্ষিত হয় জেলা শহর, মফস্বল শহরগুলোতেও। শহর ছাপিয়ে এই যে নৈসর্গিক জীবনচিত্র। এই জীবনাচারের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক অন্যরকম আবহ জেগে ওঠে বর্ষাকালীন জীবন ধারায়। এর বাইরে নয় শিশুরাও। বর্ষাকালে শিশুদেরও আরামদায়ক পোশাক পরিধানের বিষয়টা সচেতন মায়েরা ভেবে রাখেন। যার দরুন বর্ষার শুরুতেই শিশুদের পোশাক কালেকশনটা দৈনন্দিন জীবনযাপনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে রাখেন। আর বর্ষা : সে তো এক অপূর্ব ঋতু। ধুম বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে আসা নিসর্গ পেয়ে যায় এক মায়াবি রূপোচ্ছটা। যখন থেমে আসে বৃষ্টি চিলতে রোদের ছোঁয়ায় আকাশ হয়ে ওঠে নীলাম্বর। এই যে ঘন ঘোর বর্ষা দিন বাংলায় ঋতুচক্রের পথ বেয়ে আসে। এই বর্ষার সঙ্গে ফ্যাশনের বিষয়টা যেন হাত ধরাধরি করে এসে পাশ ফিরে বসে মেঘলা মনের ভেজা আর নিবিড় ফ্যাশন ধারায়। যার উপমা শুধু জলময়ূরের ছায়া জাগা বাদলাঝরা বর্ষাদিনের সঙ্গেই মিলিয়ে নেওয়া যায়।              

×