ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

সফল মায়ের গল্প

রাজু মোস্তাফিজ

প্রকাশিত: ০১:৩৫, ২১ জুন ২০২৪

সফল মায়ের গল্প

রুবি বেগম

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের সর্দারপাড়া গ্রামের রুবি বেগম (৫০)। সুখের সংসার ছিল তাদের। প্রায় দুই দশক আগে স্বামী সামছুল সর্দার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এতে তার জীবনে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। সংসারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তার স্বামী। সেই সময় এক পুত্র সপ্তম শ্রেণিতে অপরজন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। সন্তান আর সংসার নিয়ে চরম সংকটে পড়েছিলেন তিনি। ঘরে কোনো টাকা পয়সা ছিল না।

সন্তানদের কিভাবে বাঁচিয়ে রাখবেন সে চিন্তায় পাগলপ্রায়। নিজে না খেয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। শ্বশুরবাড়ির বাঁশবাগান থেকে বাঁশ বিক্রি ও বাবার বাড়ি থেকে নানা রকম সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে শুধু সন্তান দুটোকে মানুষ করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। তার এ কষ্ট সার্থক হয়েছে। দুই ছেলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার। নিজে পড়াশোনা না করলেও বুঝেছিলেন সন্তাদের পড়াশোনা করাতে হবে। যত বাঁধাই আসুক তার জীবনে। 
রুবি বেগম জানান নানা জীবন সংগ্রামের পর দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তি পেয়েছি। আজ আমার বড় ছেলে বাংলাদেশ পুলিশের এএসআই এবং ছোট ছেলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তে সৈনিক হিসেবে কর্মরত আছে। সমাজে সবাই এখন আমাকে সম্মান করে। স্বামীর মৃত্যুর পর আমাদের থাকার মতো কোনো ঘর ছিল না। স্বামীর মৃত্যুর পর ভাবি যেকোনো মূল্যে ছেলে দুটোকে মানুষের মতো মানুষ করব। সেই অতীতের কথা মনে পড়লে আজও চোখ দিয়ে পানি আসে।

তিনি আরও বলেন, চার বছর আগে আমিও ক্যান্সারে আক্রান্ত হই। দেশে নানা চিকিৎসা করলেও একপর্যায়ে ভারতে চিকিৎসা করে সুস্থ হই। এতে প্রচুর টাকা খরচ হয়। সন্তানরা পুরো চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করে। এখন আমি অনেকটা সুস্থ। বাংলাদেশে অনেক টাকা ব্যয় করেও সুস্থ না হলে ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নেই। 
তৎকালীন সময়ে রুবি বেগমের স্বামী একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। জেলা শহরে দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাসাতে থাকতেন। বেশ ভালোই চলছিল তাদের সংসার জীবন। হঠাৎ ক্যান্সার কেড়ে নেয় স্বামীর জীবন। অসহায় হয়ে ফিরে আসেন গ্রামে। গ্রামে থাকার মতো তাদের কোনো ঘর ছিল না। রুবি বেগম সন্তানদেরকে নিয়ে চলে যান বাবার বাড়ি। সেখানে কিছু দিন থাকার পর চলে আসেন শ্বশুরবাড়িতে।

এসে ছোট একটি ঘর তোলেন। শুরু হয় তাদের নতুন জীবন। খেয়ে না খেয়ে চরম দরিদ্রতার মাঝে তাদের চলে মানবেতর জীবন। শত কষ্টেও হার না মানা রুবি বেগম সন্তানদের পড়ালেখা বন্ধ করতে দেননি। স্থানীয় এক গ্রামীন স্কুলে ভর্তি করে দেন। এসএসসি পাশের পর বড় ছেলে মো. ওবাইদুর হক রুবেল যোগ দেন পুলিশ বাহিনীতে। পরে ওবায়দুল হক প্রোমোশন নিয়ে পুলিশের (এএসআই) হন। কয়েক বছরের ব্যাবধানে ছোট ছেলে মো. সোহেল রানাও বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) তে যোগ দেন। ধীরে ধীরে সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসে। রুবি বেগমের স্বপ্ন পূরণ হতে শুরু করে।

সন্তানদের উন্নতি তার জীবনে চরম পাওয়া।  বর্তমানে বড় ছেলে শান্তি রক্ষা মিশনে দেশের বাহিরে কর্মরত। সর্দারপাড়া গ্রামের প্রতিবেশী মেহেরা বেগম জানান, রুবি বেগম সন্তানদের জন্য অবর্ণনীয় কষ্ট করেছেন। এমন দিন গেছে নিজে না খেয়ে সন্তানদের খাইয়েছেন। সন্তানের জন্য মানুষ কষ্ট করে ঠিক, তবে এমন কষ্ট করার মহিলা আমি কখনো দেখি নাই। তার কষ্ট আজ সার্থক হয়েছে। দুই ছেলেই এখন সরকারি চাকরি করছে। 
বড় ছেলে মো. ওবাইদুর হক রুবেল মুঠোফোনে বলেন, আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখনি আমার বাবা মারা যান। আমি মনে করেছিলাম আমার লেখাপড়া আর হবে না। জীবনে ভালো কিছু করতে পারব না। কিন্তু আমার মা কখনোই হাল ছাড়েননি। আমাদের দুই ভাইকে  বরাবরই সাহস দিয়ে ধৈর্য ধরতে বলতেন। আমি দেখেছি সংসারের কষ্ট আর অভাব কত ভয়ঙ্কর হয়। তবু আমার মা হাল ছাড়েননি। আজ আমরা দুই ভাই সরকারি চাকরি করার পেছনে সবটুকুই শুধু আমার মায়ের অবদান। আমি আশা করি প্রত্যেক ঘরে যেন এ রকম সাহসী মা থাকেন। তাহলেই সব বিপদেই সন্তানরা তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।
কুড়িগ্রাম সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বাতেন সরকার জানান, অদম্য সাহসী রুবি বেগম নানা কষ্টেও সন্তানদের মানুষ করেছেন। এমন সাহসী মা থাকলে প্রতি ঘরে সন্তানেরা আদর্শ মানুষ হবে বলে আমি মনে করি।

×