ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ০১:৩১, ২১ জুন ২০২৪

বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীলতার কাতারে অবস্থান করছে। হরেক বিপণœতাও কাঠামোর গভীরে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকানো। সমাজের সমসংখ্যক নারী যদি উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে প্রবৃদ্ধি তার টেকসই লক্ষ্যমাত্রায়ও পেছনে পড়বে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবয়বও হরেক তারতম্যের শিকার হয়ে বিভিন্নভাবে হোঁচট খাওয়াও বিপরীত প্রবাহ। কন্যা, জায়া, জননী এমন বৈচিত্র্যিক রূপের আধার আবহমান বঙ্গরমণীরা। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সেই নারী সমাজ অতি শৈশবকাল থেকে কিশোরী, যুবতীর পর্যায়ে যেতে সিংহভাগ সময়ই নানামাত্রিক বিপরীত অবস্থার শিকার হয়। প্রথমেই কন্যাসন্তান অপরিণত বিবাহ অত্যাচারে নিজের সম্ভাবনাময় জীবনকে জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হয়। প্রসঙ্গ অবশ্যই বাল্যবিয়ে এবং বাংলাদেশে তার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়েও শিশুকন্যা থেকে কিশোরীরা বাল্যবিয়ের আবর্তে পড়ার ঝুঁকির মধ্যেই থেকে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে হরেক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য-উপাত্ত সত্যিই বিচলিত হওয়ারই মতো। সম্প্রতি সারা বিশ্বের বাল্যবিয়ের ওপর এক গবেষণা প্রতিবেদন হতচকিত করে দেয়।

বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ ১২টি দেশের মধ্যে আমাদের বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত। তার চেয়েও বিব্রতকর অবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একদম প্রথম। শঙ্কিত হওয়ার চরম দুঃসময়ে সামনে আছে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় দেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে একটি সহনীয় পরিবেশে উত্তীর্ণ করা। এমন আদর্শ রাষ্ট্রের পরম দিক-নির্দেশনায় আছে সমতাভিত্তিক সমাজ তৈরিতে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। যে দেশে ১৫ বছর বয়সে ৮.২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় সেটা যে কতখানি অবাঞ্ছিত তা ধারণার অতীত। আর ১৮ বছরের আগেই ৪১.৫ শতাংশ কিশোরী কনের সাজে স্বামী সংসার করতে চলে যায়।

সঙ্গত কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে যদি সমাজ সংস্কারকে নতুন একটি যাত্রাপথ দিতে না পারলে টেকসই উন্নয়নের বিলম্ব হবে তো নিশ্চয়ই। যার জন্য প্রয়োজন বাল্যবিয়ে নিরোধে দেশকে যৌক্তিক, বাস্তবিক আর সহনীয় অবস্থায় উত্তীর্ণ করা। কতিপয় নীতিমালা ও সামাজিক সংস্কারের যুগোপযোগী রূপান্তরও অতি আবশ্যক। ফিরে যেতে চাই উনিশ শতকের নব জাগরণের সুবর্ণ সময়ে। যার আধুনিক কৃতী পুরুষ ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনিই প্রথম দ্ব্যর্থকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন শিশুকন্যা আর বালিকাদের বিয়ের পিঁড়িতে নয় বরং বিদ্যালয়ে পাঠানো জরুরি।

নিজ উদ্যোগে বহু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে অবোধ বালিকাদের জন্য বিদ্যা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক দ্বার উন্মোচনও উনিশ শতকের এক অবধারিত নতুন বলয়। আরও জোরদার করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারও এগিয়ে এলেন কন্যাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দ্বার খুলে দেওয়া। ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন আর বিদ্যাসাগরের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অবিভক্ত বাংলায় নতুন অধ্যায়ের শুভসূচনা। ১৮৪৯ সালে বেথুন বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সেটা হয় কলকাতায়। আর দ্বিতীয় বালিকা বিদ্যালয় হিসেবে নাম আসে রাজশাহীর পিএন, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের। যা ছিল তৎকালীন জমিদারের শিক্ষানুরাগের অনন্য নিদর্শন।

প্রায়ই সার্ধশত বছর পর আমাদের বাংলাদেশে নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক বলয় আধুনিক ও যুগোপযোগী হলেও বাল্যবিয়ের কবল থেকে মুক্তি না পাওয়াও এক দুঃসহ পরিতাপের বিষয়। শতকরা হারে বাল্যবিয়ে একেবারেই কমছে না তা কিন্তু নয়। প্রযুক্তি আর আধুনিকতার নির্মাল্যে খুব শ্লথ গতিতে বাল্যবিয়ের ঝুঁকি কমা উদ্বেগ উৎকণ্ঠার বিশেষ পীড়াদায়কও বটে। বলা যেতে পারে জনসংখ্যা বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দ্বার উন্মোচনও সময়ের দাবি। সেখানে নগর, বন্দর, শহর আর গ্রাম-বাংলার সামাজিক প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা পরিস্থিতিকে নাজুক করতে যথেষ্ট। এখনো দেশের সিংহভাগই গ্রাম-বাংলার সবুজঘেরা শ্যামল প্রান্তর। বাল্যবিয়ের ঝুঁকি তেমন প্রত্যন্ত অঞ্চলেই বেশি।

হতদরিদ্রের কন্যাসন্তানকে অসচ্ছলতার কারণে বিয়ের সাজ নিতে হয়। আবার নিরাপত্তাহীনতায়ও বিয়ে দিতে পিতা-মাতা বাধ্য হন। অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্ভোগেরও দেশ আমাদের ক্ষুদ্র আবহমান বাংলা। তেমন নৈসর্গিক ঝড়-ঝাপটায় বাবা-মা সবার আগে তার অবিবাহিত কন্যাটিকে বিয়ে দিয়ে স্বস্তিতে জীবন কাটাতে চায়। তবে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন সময় ও যুগে পরিবর্তন পরিবর্ধন যাই করা হোক না কেন, কোনো বিধি ব্যবস্থা উপস্থিত প্রেক্ষাপটকে সামলাতে হিমশিম খায়। আগেই উল্লেখ করি বাল্যবিয়ে কমছে না তা কিন্তু নয়। তবে হিসাবের মধ্যে আসছেই না।

কমার হার বছরে মাত্র ২.১ শতাংশ। নগণ্য থেকে অসহনীয় এক দুর্বিপাক। বাল্যবিয়ে শুধু একটি কন্যার জীবনই ওলটপালট করে না বরং তার কারণে জাতীয় সম্পদও বিপর্যস্ত হয়। যেখানে বলা হচ্ছে বিয়ের পর শিশু কিংবা বালিকা বধূটির তার মেধা মননের যে সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ হয়ে যায় জাতীয় সম্পদের বিনষ্টকরণও তার মধ্যেই অন্তর্নিহিত। আমাদের দেশে মাদ্রাসা শিক্ষায়ও কন্যাশিশু আর বালিকাদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। সেখানেও বলা হচ্ছে পবিত্র ইসলাম নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করেছে। ধর্মীয় বিধিতে কোনো প্রতিবন্ধকতাই তৈরি করে নাই।

প্রতিকারের উপায় হিসাবে যে বক্তব্য উঠে আসা বাঞ্ছনীয় তা হলোÑ পবিত্র দায়িত্বটি পরিবার থেকেই শুরু করা সঙ্গত। কারণ পিতা-মাতা তার কন্যাশিশু কিংবা বালিকাটিকে কোনোভাবেই বিয়ে অবধি যেতে  দেবেনই না অপরিণত বয়সে। বরং তাকে বই হাতে বিদ্যা শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়ে পাঠানো শোভন, যৌক্তিক অনিবার্য। শুধু পাঠিয়ে দিলেই কাজ শেষ হবে না। লেখাপড়াকে নিয়মিত আর অব্যাহত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই গ্রহণ করবেন। যা তারা তাদের পুত্রসন্তানের জন্য করে থাকেন।

বর্তমান সরকার নারী শিক্ষার জন্য হরেক কর্মসূচি অবারিত করেছেন প্রত্যন্ত অঞ্চল গ্রামেও। সরকারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই শুধু নয়, গ্রামাঞ্চলে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে কন্যাশিশু ও বালিকাদের জন্য। আশঙ্কা করা হচ্ছে তারপরেও কত সময় ব্যয় করতে হবে বাল্যবিয়ে রোধ করা? তেমন অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর যেন অজানা বিস্ময়। 

দুই গৃহবধূর আলাপচারিতা প্রতিবেদকের সঙ্গে
লিপি বেগম : যার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ কর্মচারী হিসেবে চাকরিরত। লিপির বিয়ে হয় যখন সে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। ১৫ বছর বয়স। কিশোরীই শুধু নয় বয়ঃসন্ধিকালের এক স্পর্শকাতর সময়। পিতা নুরুজ্জামান অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মচারী। ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হওয়া লিপি মাতৃত্বের আস্বাদে পরিপূর্ণ হয় ১৮ বছর বয়সে। কিন্তু অল্প বয়সে মা হওয়াতে শিশুপুত্রটির দেখভালের কিছু সমস্যা বোধ করেন।

পরবর্তীতে দ্বিতীয় সন্তান পৃথিবীতে আনতে কিছু ভাবনা-চিন্তা তো করেই ফেলেন। প্রথম সন্তানের দশ বছর পর ২য় সন্তান পৃথিবীর আলো দেখে। এখানেই তার মাতৃমহিমা আর হৃদয়ের অপার নিষ্ঠা। এক সচেতন মায়ের কাহিনী সত্যিই আনন্দময়। অপরিণত বিয়ে হলেও অকাল মাতৃত্বের ছাপ সন্তানদের ওপর আসতেই দেননি। 
অন্য আরেকজন রাবেয়া বেগম :  মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী অবস্থায় ১৬ বছরে স্বামীর ঘর করতে আসেন। তবে লেখাপড়া জানার কারণে মা হয়েছেন ১৯ বছরে। কন্যাসন্তানকে অতি শৈশব থেকেই শিক্ষা জীবনে অনুপ্রবেশ করান। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, ¯œাতক-¯œাতকোত্তর ডিগ্রির পরই বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করেন। রাবেয়া দ্বিতীয় সন্তানের মা হন আরও পাঁচ বছর পরে। যখন তার বয়স প্রায় ২৪। শুধু তাই নয়, এই সচেতন মা নিজেও বিয়ের পর মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে নিজেকে প্রমাণও করেন।

×