কিছুটা ভয়। কিছুটা উত্তেজনা। কপাল ঘামানো। মুখ শুকানো। পানির পিপাসা। নতুন পরিবেশ। অজানা পরিস্থিতি। ক্যাম্পাসে প্রথম দিন। স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যায়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের একটি দিন সেই প্রতিষ্ঠানে প্রথম দিন হিসেবে অভিজ্ঞতা আছে। সুখ-দুঃখ, হাসি-তামাসা, তিক্ততা নানান কিছুর সমন্বয়ে ক্যাম্পাসের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন-
আসিফ হাসান রাজু
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানাইজেশন স্ট্যাট্রেজি এ্যান্ড লিডারশিপ বিভাগে ২০১৮-১৯ সেশনে ভর্তি হয়েছেন দিনাজপুরের মেয়ে সোমা জামান। ক্যাম্পাসের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মফস্বল শহরে আমার জন্ম। প্রথম থেকেই স্বপ্ন ছিল দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠে অধ্যয়নের। ছোটবেলা থেকে সেই লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে আজ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনটা আমার কাছে সব থেকে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে এদিন সকালে মনটা খুব লাফাচ্ছিল! রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। ঘুম না হলেও উত্তেজনায় ক্লান্তি একেবারে উড়ে যাবার যোগাড়। আজ যে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে প্রথম যাচ্ছি। প্রথমবারের মতো ক্লাস করতে! ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। একেবারে শরীর ঠা-া হয়ে যাবার উপক্রম। প্রথমদিনের স্মৃতিমাখা এ দিন আমি কোন দিনও ভুলতে পারব না।’ ঝিনাইদহ থেকে চার জেলা পাড়ি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন নাঈম জাহিদ। স্বপ্নবাজ এ তরুণের কাক্সিক্ষত বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় তার আনন্দ যেন আকাশছোঁয়া। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম ক্যাম্পাসের প্রথম দিনের অনুভূতি কেমন ছিল। হাসি মাখা মুখে সোজা উত্তর, এর চেয়ে বড় আনন্দের দিন আর হয় না। এরপর একটানা বলতে থাকলেন নাঈম। বলেন, এর আগে ঢাকাতে অনেকবার এসেছি কিন্তু এবারের আশাটা অন্যরকম। প্রথম যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ভায়ের সঙ্গে বেড়াতে আসি সেদিন মনে হয়েছিল আমিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে একদিন ভর্তি হব। আজ আমার সে স্বপ্ন সার্থক হয়েছে। নাঈম ভর্তি হয়েছেন তার পছন্দের বিষয় আইনে। তিনি বলেন প্রথম দিন শুধু ভয়ে ভয়ে কেটেছে। এটাই আমার সব থেকে বড় স্মৃতি হয়ে রবে।’ ক্যাম্পাসে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা একটু অন্যরকম বলে জানান নরসিংদী থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়া আফিয়া আক্তার। তিনি জানান, বড় ভাই বোনদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেখেই স্কুল-কলেজ থেকেই ক্যাম্পাস প্রীতি জাগে তার মধ্যে। অনেক দিনের সেই স্বপ্ন সফলতার পথে যেন ভাবতেই পারছিলেন না তিনি। বললেন, ‘ক্যাম্পাসে প্রথম দিনের সে অনুভূতি এককথায় অসাধারণ। মানুষের কিছু স্মৃতি থাকে অমলিন। কিছু স্মৃতি কখনও মুছে যাবার নয়। দিনটিকে ঘিরে আগে থেকেই ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। ক্যাম্পাসের প্রথমদিন, প্রথম ক্লাস। কী পরব, কী করব! এসব ভাবতে ভাবতেই রাত পেরোল। ঘুমহীন চোখে, চাপা রোমাঞ্চ নিয়ে সেদিন ক্যাম্পাসে পা রেখেছিলাম। পছন্দের তালিকায় থাকা প্রিয় ক্যাম্পাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে। ক্লাসের উদ্দেশ্যে এদিন ছিল ক্যাম্পাসে আমার প্রথম পদার্পণ। দিনটি ছিল আমার স্বপ্ন পূরণের দিন। সকাল ১০টায় পৌঁছে বিভাগে সেখানে গিয়ে দেখি আমার মতো অনেকে বিভাগের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে ভয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে পরিচিত হই সাদিয়ার সঙ্গে। প্রথমে ভেবেছিলাম সে হয়ত বিভাগের সিনিয়র হবে। পরে জানতে পারি সে আমারই মতো প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। ক্লাসের প্রথম দিন যখন স্যাররা এসে পরিচয় জানতে চায় এক এক করে যখন আমার পাশের জন পরিচয় দেয় আর আমি ভাবতে থাকি এবার আমার পালা। তখনই মনের ভিতর কেমন জানি একটা ভীতি কাজ করতে থাকে। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের। সে আমি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এ বিষয়ের চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে। জীবনের রোমান্সকর স্মৃতির মধ্যে ক্যাম্পাসের প্রথম দিনের স্মৃতি হয়ে রবে অমলিন বলে জানান তিনি। সব মিলিয়ে ভয়ে ভয়ে হলেও খুব আনন্দের সঙ্গেই কেটেছে নানা জল্পনা আর কল্পনার ক্যাস্পাসের প্রথম দিনটি’। নরসিংদী থেকে এসেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়া আরেক শিক্ষার্থী তাসলিমা আক্তার। তার কাছে যখন জানতে চেয়েছিলাম ক্যাম্পাসের প্রথমদিনের অনুভূতির কথা কিছু সময় চুপ থাকার পর তাসলিমা বলেন, ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল একজন আইনজীবী হব। আজ সেই স্বপ্ন যাত্রার প্রথম দিন। প্রথম দিন ক্লাসে আশার আগে অনেক কিছু ভেবেছি, ক্যাম্পাসে যাবার জন্য কোন ড্রেস পরব, কি করব, এমন নানা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল অবশেষে সেই সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে আজ সেই দিনটা পূরণ হলো। নতুন মুখ! নতুন জায়গা! এমন পরিস্থিতিতে আমি নিজেকে আজ নিজে উপলব্ধি করতে পেরেছি। আগামীতে চাই একজন আইনজীবী হিসেবে দেশের সেবা করতে।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শুভ্রজামান বলেন, ক্যাম্পাসের প্রথম দিন এদিন আমার জীবনে পাওয়া সব থেকে স্মরণীয় একদিন। ছোটবেলা থেকে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আমার এক ধরনের ভাল লাগা ছিল। সেই বাংলা বিভাগে ভর্তি হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। বিভাগের সকলে আমাদের যেভাবে আপন করে নিয়েছেন তা কখনও ভুলব না। প্রথম দিন যখন ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি তখন এক চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল। যখন শাটলে করে ক্যাম্পাসে আসি নিজেকে অনেক বেশিই ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। আমি আজ চবির শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে শুনেছিলাম র্যাগিং-এর বিষয়ে। তবে এখানে এসে সেই ধারণা পাল্টে গেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সাফায়েত উল্লাহ রুম্মান বলেন, ‘ভর্তির আগে ভাবতাম যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে পারতাম! কিন্তু আজ যখন শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ-িতে পা রাখি তখনকার অনুভূতি ব্যাখ্যা করার মতো ভাষা আমার নেই। তবে এটুকু বলব স্বপ্ন সারথি হিসেবে যে বিশ্ববিদ্যালয়কে পেয়েছি, তার মাধ্যমেই নিজেকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই’। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের লাইমা তাবাচ্ছুম ইশিতা বলেন, ‘জীবনে স্বপ্ন পূরণের এ দিনটি আমার কাছে হয়ে রবে সব থেকে এক স্মরণীয় দিন। মফস্বলের ক্যাম্পাস হলেও সবুজে ঘেরা এই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে গর্বিত মনে করি। স্কুল থেকে শিক্ষা সফরে প্রথম যখন এই ক্যাম্পাসে আসি তখন থেকেই এখানকার একজন শিক্ষার্থী হতে চেয়েছি। আজ আমার স্বপ্ন পূরণের প্রথম দিন। আমি চাই যে ইচ্ছাগুলো মনের মাঝে জমা করে রেখেছি তা সব একদিন পূরণ করতে।’ .

