ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৪ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

স্বাধীনতা ॥ আত্মমর্যাদা ও মুক্তির গান

অনিরুদ্ধ সাজ্জাদ

প্রকাশিত: ২১:২১, ১৪ মার্চ ২০২৬

স্বাধীনতা ॥ আত্মমর্যাদা ও মুক্তির গান

ক্যাম্পাসে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থীরা

স্বাধীনতা এসেছে ত্যাগ-সংগ্রামের পথ বেয়ে। পতাকায় জ্বলজ্বলে ইতিহাস, হৃদয়ে গর্বের সুর। স্বাধীনতা দিবস কেবল উদ্যাপন নয়, শপথের নবজাগরণ। তারুণ্যের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার সংজ্ঞা যেমন বহুমাত্রিক, তেমনই প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চোখে স্বাধীনতা দিবসের ভাবনা তুলে ধরেছেন অনিরুদ্ধ সাজ্জাদ

শৃঙ্খলমুক্তির চেয়েও বেশি কিছু
মুসতারিন রহমান স্নিগ্ধা, শিক্ষার্থী, ফোকলোর বিভাগ

স্বাধীনতা শব্দটির মর্ম কেবল একটি ভূখণ্ড বা পতাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও স্বপ্নের সমষ্টি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও অসংখ্য মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই লাল-সবুজের পতাকা। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও সমাজে এখনো বিরাজ করছে গভীর বৈষম্য। অর্থনৈতিক অসাম্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারীর প্রতি সহিংসতাÑ এসবই আমাদের মুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  
স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পায় যখন প্রতিটি নাগরিক ভয় ও সংকোচ ছাড়া নিজের অধিকার চর্চা করতে পারে। এটি কেবল শৃঙ্খলমুক্তি নয়, বরং ন্যায়বিচার, সামাজিক সমতা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা। আমরা যদি শিক্ষা, চিকিৎসা ও ন্যায়ের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাই, যদি নারী-পুরুষের বিভাজন মুছে যায়, যদি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেÑ তবেই স্বাধীনতা সার্থক হবে। অন্যথায়, এটি শুধু কাগজে-কলমে একটি দিবসের উদযাপন হয়ে থাকবে। 

সমতার সমাজ গড়ার শপথ
আলাওল করিম ফয়সাল, শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ 

স্বাধীনতা শুধু পতাকা উড়ানো, জাতীয় সংগীত গাওয়া কিংবা কাগজে লেখা কিছু অধিকারের নাম নয়। যদি তাই হতো, তাহলে কেন আজও একজন মা তার সন্তানের জন্য দু’বেলা ভাত জোগাড় করতে হিমশিম খান? কেন ধর্ষণের শিকার নারীরা বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন? কেন রাতের রাস্তায় নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন? এই সমাজে কি সত্যিই সবাই স্বাধীন? আমার চোখে স্বাধীনতা মানে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কেউ ক্ষুধার্ত থাকবে না। যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। স্বাধীনতা মানে নারীরা নিরাপদে হাঁটবেন রাস্তায়, যুবকেরা দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখবেন, শিশুরা ভয়মুক্ত পরিবেশে বড় হবে। 


স্বাধীনতা মানে মত প্রকাশের সাহস
চৈতী রাণী রায়, শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ

জন্মের পর থেকেই আমরা প্রকৃতির নিয়মে বাঁধা, জল-হাওয়া-মাটির ওপর নির্ভরশীল। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতির শৃঙ্খল তো আছেই। স্বাধীনতা বলেই আমরা যেন এই শৃঙ্খল ভুলে যাই। আমার মতে, স্বাধীনতা হলো শৃঙ্খলের মধ্যেই মুক্তির স্বপ্ন দেখা। সমাজের নিয়মে আমরা বাধ্য হই নির্দিষ্ট পথে চলতে। মেয়েদের বলা হয়, ‘এটা করো না, ওটা করো না’, ছেলেদের চাপানো হয় অর্থ উপার্জনের দায়। এই বিধিনিষেধ কি আমাদের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে না? তবুও মানুষ প্রতিদিন লড়াই করেÑ প্রকৃতির সাথে, সমাজের সাথে। এই লড়াইয়েই জন্ম নেয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। আমার কাছে স্বাধীনতা মানে নিজের মত প্রকাশের সাহস, শান্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার। তবে এখানেও সতর্কতা জরুরি। কথা বলার সময় শব্দের পাথর ছুঁড়লে তা কারো হৃদয়ে আঘাত করতে পারে। তাই মুক্ত ভাবনা প্রকাশের সাথে দায়িত্ববোধও জরুরি।  

জাতীয় মুক্তির চাবিকাঠি
হৃদয় আহম্মেদ, শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ

স্বাধীনতা শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে ভাসে ১৯৭১ সালের রক্তঝরা ইতিহাস। কিন্তু জাতীয় স্বাধীনতা ব্যক্তির মুক্তি ছাড়া সম্ভব নয়। একজন মানুষ যখন নিজের চিন্তা প্রকাশে ভয় পায়, যখন তার মৌলিক অধিকারগুলো পদদলিত হয়Ñ তখন জাতীয় পতাকা উড়ালেও সেই স্বাধীনতা অর্ধেক। স্বাধীনতা মানে শুধু পরাধীনতার শিকল ভাঙা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সম্মানের নিশ্চয়তা। একজন দিনমজুর যদি তার সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে না পারে, একজন কৃষক যদি ফসলের ন্যায্য মূল্য না পায়, তাদের জন্য স্বাধীনতা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। সেটা তখনই, যখন রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা, সুশিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া, বৈষম্য দূর করাÑ এই ছোট ছোট পদক্ষেপই জাতীয় স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে। ব্যক্তি মুক্ত হলে জাতি মুক্ত হবে, এই বিশ্বাসেই এগিয়ে যেতে হবে।  
পাখির মতো ডানা মেলতে চাই
আবিদা সুলতানা চিশতী, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ

স্বাধীনতা আমার কাছে মনে হয় মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানো এক পাখির মতো। যে পাখি ডানা মেলে উড়তে চায়, কোনো বাঁধা তাকে আটকাতে পারে না। ১৯৭১ সালে আমরা এমনই একটি স্বাধীনতা পেয়েছিলামÑ রাজনৈতিক শৃঙ্খল ভেঙে। তবে স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রের সীমানা নয়, এটি মানসিক মুক্তির নাম। একজন শিক্ষার্থী যখন ভয় ছাড়া প্রশ্ন করতে পারে, একজন নারী যখন ক্যারিয়ার গড়তে পারেÑ তখনই স্বাধীনতা সত্যি হয়। কিন্তু সমাজ আজও আমাদের মানসিকভাবে বেঁধে রাখে। আমার চোখে স্বাধীনতা মানে কোনো বাধা ছাড়াই বিদ্যালয়ে যাওয়া, নিজের মত করে নিজের পছন্দের পেশা বেছে নেওয়া, নিরাপদে রাস্তায় চলাফেরা করা এবং নিজের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা করার পূর্ণ অধিকার। তবে স্বাধীনতার প্রকৃত মানে তখনই বোঝা যায় যখন মানুষ তার ন্যায়সংগত অধিকার আদায় করতে পারে এবং অন্যের অধিকারকেও সম্মান করে।
শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাই যথেষ্ট নয়। আমাদের দরকার মানসিক ও সামাজিক স্বাধীনতা। 

বশ্যতা নয়, আগল ভাঙার গান
আবিদ হাসান, শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ

আমার চোখে স্বাধীনতা মানে নির্ভয়ে বাঁচার অধিকার। এটি শুধু পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙা নয়, বরং নিজের চিন্তা, বিশ্বাস, ও স্বপ্নকে মুক্তভাবে প্রকাশ করার অধিকার। আমার চোখে স্বাধীনতা মানে ভয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের মত প্রকাশ করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, এবং নিজের জীবনযাত্রার পথ নিজেই নির্ধারণ করা। স্বাধীনতা তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন মানুষ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সমান অধিকার ভোগ করতে পারে। এটা কেবল একটি দেশের স্বাধীনতা নয়, বরং ব্যক্তি স্বাধীনতাও।

প্যানেল হু

×