আত্মার কাছে দায়বদ্ধতায় হাতে রাখি হাত
‘আত্মার কাছে দায়বদ্ধতায় হাতে রাখি হাত’- স্লোগানকে সামনে রেখে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একদল তরুণের হাত ধরে শুরু হয়েছিল একটি মানবিক যাত্রা। সেই যাত্রার নাম ‘কিন’। ২০০৩ সালের ৩০ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি আজ দুই দশকের বেশি সময় ধরে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছে। ‘কওঘ’ শব্দের শাব্দিক অর্থ ‘আত্মীয়’। বিপদের সময় মানুষ যেমন আত্মীয়ের কাছে আশ্রয় খোঁজে, ঠিক তেমনই সমাজের অসহায় মানুষের পাশে আত্মীয়ের মতো দাঁড়ানোর অঙ্গীকার থেকেই এই সংগঠনের জন্ম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী চারপাশের মানুষের কষ্ট দেখে তাদের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। সেই ভাবনা থেকেই ২০০২ সালে তারা একত্রিত হন এবং ২০০৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমোদন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে কিন। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের মধ্যে ছিলেন রাজু সিংহ, মো. এমদাদুল করিম, আতিকুর রহমান, মাহমুদুল হাসান, এটিএম আখতারুজ্জামান, হিমেল নাগ রানা, আব্দুল্লাহ আল বারেক, ফরহাদ হামিদ ও ঈশা শিহাব।
শিশুদের শিক্ষার আলো
কিন-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ কিন স্কুল। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন বিকেলে পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনা করান। শুধু পাঠদানই নয়, শিক্ষার্থীদের বই-খাতা সরবরাহ, ভর্তি ফি ও পরীক্ষার খরচে সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি নাচ, গান, চিত্রাঙ্কন ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জাতীয় উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগও পায় এসব শিশু।
রক্তের প্রয়োজনে পাশে
মানুষের জরুরি মুহূর্তে রক্তের প্রয়োজন মেটাতে কাজ করে কিন ব্লাড সেক্টর। দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হয়। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়মিত রক্তদান কর্মসূচিও আয়োজন করা হয়। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে বহু রোগীর রক্তের প্রয়োজন মেটানো হয়েছে। বেশ কয়েকবার সিলেটের সর্বোচ্চ রক্তদাতা সংগঠনের স্বীকৃতিও পেয়েছে কিন।
সামাজিক সচেতনতা
মানবিক সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধেও কাজ করে সংগঠনটি। এসিড সন্ত্রাস, বাল্যবিবাহ, শিশু নির্যাতন ও প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে নিয়মিত সেমিনার, মানববন্ধন, কর্মশালা ও গণসাক্ষর কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।এছাড়া সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিশু শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর কাজও করা হয়।
শীতার্ত মানুষের পাশে
প্রতি বছর শীত মৌসুমে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায় কিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, শিক্ষকদের কোয়ার্টার ও সিলেট শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করা হয়। পরে এসব কাপড় ও কম্বল দেশের বিভিন্ন শীতপ্রবণ এলাকায় অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়।এক মাসের পরিশ্রমের পর কোনো শীতার্ত মানুষের হাতে কম্বল তুলে দিতে পারা কিন সদস্যদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন তারা।
চ্যারিটি কার্যক্রম
দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহায়তার জন্য সংগঠনটি বিভিন্ন চ্যারিটি আয়োজন করে। এর মধ্যে রয়েছে চ্যারিটি ফিল্ম শো, বইমেলা, পিঠা উৎসব, চ্যারিটি ক্রিকেট ম্যাচ ও টি-শার্ট বিক্রয় কার্যক্রম। এসব আয়োজন থেকে সংগৃহীত অর্থ সরাসরি অসহায় রোগীদের চিকিৎসায় সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও কিন সক্রিয় থাকে। বন্যা বা অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে খাবার, ওষুধ, স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
মানবিক সমাজের স্বপ্ন
কিন-এর সভাপতি আরিফুল ইসলাম আরিফ বলেন, ‘মানবতার সেবায় কাজ করার মধ্যেই আমরা আমাদের দায়িত্ব খুঁজে পাই। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটানোই কিন-এর মূল লক্ষ্য।’ সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফাইয়াজ আল-মুহাইমিন বলেন, ‘শুধু সহায়তা নয়, সচেতনতা তৈরি করাও আমাদের বড় লক্ষ্য। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে আমরা একটি মানবিক ও সহমর্মিতাপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে চাই।’ দুই দশকের বেশি পথচলায় শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই সংগঠনটি এখন অনেক মানুষের কাছে আশ্রয়ের প্রতীক। সমাজের প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে আত্মার বন্ধন গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার নিয়ে কিন-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই মানবিক পথেই এগিয়ে চলছে সংগঠনটি।
প্যানেল হু








