ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯

হাজারো উদ্যোক্তার শেয়ার কেনা-বেচার সুযোগ

অতালিকাভুক্ত কোম্পানি নিয়ে চালু হচ্ছে বিকল্প বাজার

লেখক: অপূর্ব কুমার

প্রকাশিত: ১২:৪৬, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২; আপডেট: ১৪:২৬, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২

অতালিকাভুক্ত কোম্পানি নিয়ে চালু হচ্ছে বিকল্প বাজার

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)

উৎপাদন বন্ধ ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার কেনা-বেচার জন্য আগামী মাসেই চালু হচ্ছে অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড বা বিকল্প বাজার। বাজারটি দেশের হাজারো উদ্যোক্তার শেয়ার বিক্রি বা অংশীদার বেছে নেওয়ার একটি প্লাটফরম হিসেবে বিবেচিত হবে। যার মাধ্যমে উদ্যোক্তারা পরিচিতদের বাইরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে প্রয়োজনীয় টাকা সংগ্রহ করতে পারবেন। এটি চালু হলে দীর্ঘদিন ধরে পুঁজি আটকে থাকা লগ্নিকারকরাও তা ফেরত পাবেন, আর শেয়ারবাজারে মূল ও এসএমই মার্কেটের বাইরে লেনদেনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। 

তবে বিকল্প বাজারে শেয়ার কেনা-বেচার পদ্ধতি একই রকম থাকলেও আইন কানুনে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। নতুন চালু হতে যাওয়া বাজারটিতে শেয়ার কারসাজির সুযোগ থাকছে না। কারণ বাজারটিতে দ্রুত মুনাফার পর শেয়ার বিক্রি করে নগদ উত্তোলনের সুযোগ থাকছে না।

বিকল্প বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার কেনা-বেচার জন্য যারা নিয়মিত শেয়ার কেনা-বেচা করেন, এক কথায় যাদের ডে ট্রেডার বলা হয়ে থাকে, তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ শেয়ার কেনার পর পরিপক্ক হলে বিক্রি করে তারা মুনাফা তুলতে পারবে না। এই বাজারের ক্রেতাকে অন্তত তিন মাস শেয়ার ধরে রাখা মানসিকতা রাখার আইন করা হয়েছে। এর আগে কেউ শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে নিলে ব্রোকারই মুনাফার  টাকা কেটে রেখে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলে জমা করার অধিকার দেওয়া হয়েছে।

এমন বিধান রেখে ঢাকা স্টক একচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড  (এটিবি) রেগুলেশন বা প্রবিধানমালার  খসড়া চূড়ান্ত করেছে শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। শিগগিরই এটি গেজেট আকারে প্রকাশ হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ কমিশনের পক্ষ থেকে গত ২৯ আগস্ট ডিএসইতে প্রবিধানামাল চূড়ান্ত করে পাঠানো হয়েছে। গেজেট আকারে সেটি প্রকাশের পরই ডিএসইতে বিকল্প বাজারের লেনদেন শুরু হবে। আগামী অক্টোবর মাসেই বাজারটি চালুর আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রবিধান মালায় বলা হয়েছে, অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে তালিকাভুক্ত হতে হলে প্রথমেই আগ্রহীকে পাবলিক কোম্পানি হতে হবে। কোম্পানিটির অধিকাংশ শেয়ার ডিমেট ফরমে হতে হবে। অর্থাৎ কাগুজে শেয়ার লেনদেন করা যাবে না। আইনে বলা হয়েছে, কোম্পানির নিয়মিত এজিএম করতে হবে। ওটিসির বাইরে মূলত সচল কোম্পানিই তালিকাভুক্ত হতে পারে। এটিবিতে আসতে চাওয়া কোম্পানির পরিচালক ও কোম্পানি ঋণ খেলাপী হতে পারবে না। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ফাইনান্সিয়াল স্টেটমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড এবং কোম্পানি আইন মেনে করতে হবে। বিকল্প বাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে ঢাকা স্টক একচেঞ্জ নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বিএসইসির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সংস্থাটিকে থাকতে  হবে না। তবে বিএসইসি কোন কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে চাইলে ডিএসইতে তাতে আপত্তি জানাতে পারবে না।

বিকল্প বাজারে কাগুজে শেয়ার লেনদেন সুযোগ নেই। তবে ঠিক শতাংশ শেয়ার ডিমেট করতে হবে সেটি ষ্পষ্ট করা হয়নি। ওভার দ্যা কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেট বিলুপ্ত করার পর কয়েকটি কোম্পানি মূল বাজার ও এসএমইতে তালিকাভুক্ত হয়ে লেনদেন করছে। আর বাকি কিছু কোম্পানি যাচ্ছে এটিবিতে। যারাই লেনদেন করবে বা নতুন করে তালিকাভুক্ত হবে তাদের শেয়ার ডিমেট করতে হবে। বিকল্প বাজারটি শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির মতো হবে। সেখানে কারা কতো শতাংশ শেয়ার বিক্রি করবে এবং কোন মূল্যে করবে এবং কোন কোন ব্রোকারের মাধ্যমে করবে তা বিস্তারিত আগেই উল্লেখ করতে হবে। 

তালিকাভুক্তির আগেই তা ঘোষণা করতে হবে। যে পরিমাণ কেনা-বেচা করা হবে সেটির পুরোটা ডিমেট না হলে লেনদেন হবে না। উদহারনসরূপ  কারও কাছে শেয়ার আছে দুই লাখ। ৫০ হাজার বিক্রি করতে চাইলে তাকে ৫০ হাজারই ডিমেট করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকল্প বাজার চালু হলে সবাই তা বিক্রি করতে ডিমেট করবেন। যেমন ২০ জনের শেয়ার আছে এটিবিতে ২০ জনই বিক্রি করতে চাইবেন। তাই তাকে ডিমেট করতে রাখতে হবে, ডিমেট করলে শেয়ার সার্টিফিকেট জাল হওয়া এবং চুরি হওয়ার  সুযোগ থাকবে না। 

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, বিকল্প বাজারে আর্থিক পণ্যেও বিক্রির সুযোগ থাকবে। বে-মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলো চাইলে নিজস্ব অফিসে বা এজেন্টের মাধ্যমে ইউনিট কেনা-বেচা না করে এ প্লাটফরমের মাধ্যমে বিনিয়োগ নেওয়ার বা বিনিয়োগ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবে। এ বাজারটি মূলত ক্রেতা-বিক্রেতাকে এ ধরনের পণ্য সহজে লেনদেনের সুযোগ করে দেবে, যারা যৌথ মূলধনি কোম্পানিগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয়ে (আরজেএসি) স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে ফরম -১১৭ পূরণ করে শেয়ার হস্তান্তর করেন।

ডিএসইর কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, ওটিসির বাইরে কোন কোম্পানি তালিকাভুক্ত  হতে হলে তার ব্যবসা সচল থাকতে হবে। যেসব কোম্পানি কমপক্ষে তিন বছর ব্যবসা কার্যক্রমে থাকবে, তারা বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ায় দর নির্ধারণের সুযোগ পাবে। বাকিদের অভিহিত মূল্যে ১০ টাকা দরে শেয়ার বিক্রি করতে  হবে। 

প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে, কোন কোম্পানিকে বিকল্প বাজারে তালিকাভুক্তির জন্য প্রাথমিক অনুমোদন লাগবে। শুরুতে কোম্পানিটি একচেঞ্জে আবেদন করবে। এটিবির প্রবিধানমালার সবকিছুই মেনে চলতে হবে। ওখানে লেনদেন হবে ডিমেট সিকিউরিটিজ। বিকল্প বাজারে সার্টিফিকেট লেনদেন হওয়ার সুযোগ নেই। যে কারণে বিক্রি করতে চাইলে ডিমেট করতেই হবে। বিকল্প বাজারের কোন কোম্পানির ৫১ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তা পরিচালকদের রাখতে হবে। আর বাকি ৪৯ শতাংশ শেয়ার তারা বিক্রি করতে পারবে। তবে বিএসইসি কোন কোম্পানিকে নির্দেশ দিলে ওই কোম্পানির জন্য নিয়মটি প্রযোজ্য হবে না।

বিএসইসি সূত্র জানিয়েছে, স্টক একচেঞ্জের মাধ্যমে শেয়ার বা মালিকানা হস্তান্তর হলে ডিমেট বাধ্যতামূলক। আর স্টক একচেঞ্জের বাইরে হলে ১১৭ ফরম দিয়ে যে প্রক্রিয়া হস্তান্তর সেটা লিস্টেড কোম্পানি হলেও লিস্টিং আইন  অনুযায়ী নিকটাত্মীয়দের মাঝে হলে সেটিও কমিশন অনুমোদন দেয়। তালিকাভুক্তির আগে কোম্পানির শেয়ার কেনা-বেচায় অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন শর্ত দেওয়া থাকতে পারে। সেখানে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যে এতো শতাংশ ডিমেট না হলে এটি তালিকাভুক্ত হবে না। সেটি অনুমোদনের চিঠিতে উল্লেখ থাকবে। 

মূল ও এসএমই মার্কেটের থেকে এটিবিতে লেনদেনের বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। এটিবিতে বিনিয়োগকারী যেকোন রকম পরিমাণ লেনদেন করতে পারবেন। সরাসরি তালিকাভুক্তির মতো যেসব কোম্পানি বিকল্প বাজারে তালিকাভুক্ত হবে সেই প্রতিষ্ঠানকে ৩০ দিনের মধ্যে ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করতে হবে। প্রথম দুই দিন সার্কিট ব্রেকার থাকবে ৪ শতাংশ। আর কোম্পানি দর বাড়া বা কমার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ নিয়মিত সার্কিট ব্রেকার থাকবে। কারসাজি বন্ধ করতে মার্জিন ঋণ বন্ধ থাকবে এই বাজারে। তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের উদ্যোক্তা-পরিচালকসহ প্লেসমেন্টধারীদের প্রাইমারী শেয়ারহোল্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

চূড়ান্ত  প্রবিধানমালায় এটিবিতে মূল শেয়ারবাজারে অ-তালিকাভুক্ত বা তালিকাচ্যুত কোম্পানির শেয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। কোন কোম্পানির আবেদনের এক মাসের মধ্যেই তালিকাভুক্ত করতে হবে। অযোগ্য হলেও একমাসের মধ্যেই তা জানাতে হবে। বিএসইসি কোন কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির নির্দেশ দিলে তাকে সরাসরি তালিকাভুক্ত করতে হবে। কোন কোম্পানি আগে তালিকাচ্যুত, বিলুপ্ত ওটিসির কোম্পানি এবং বিগত কয়েক বছরে বাতিলকৃত আইপিও আবেদন এখানে তালিকাভুক্ত হতে পারবে।

মূল মার্কেট থেকে তালিকাচ্যুত ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ এবং বিলুপ্ত ওটিসির মেটালেক্স করপোরেশন, মিতা টেক্সটাইল, বায়োনিক- সি ফুড এক্সপ্রোর্টস ও পারফিউম কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার শুরুতেই লেনদেন হতে পারে। ইতোমধ্যে কোম্পানিগুলোর কাগুজে শেয়ার ডিমেট করার জন্য কোম্পানিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  পরবর্তীতে বিকল্প বাজার চালু হলে সেখানে তালিকাভুক্তি সম্ভাবনা রয়েছে - বাংলা প্রসেস ইন্ডাস্ট্রিজ, ড্যান্ডি ডাইং, ডায়নামিক টেক্সটাইল, মডার্ন সিমেন্ট, মডার্ন ইন্ডাস্ট্রিজ মোনা ফুড প্রোডাক্টস, পেট্রো সিনথেটিক্স, ফার্মাকো ইন্টারন্যাশনাল, কাশেম সিল্ক মিলস, কাশেম টেক্সটাইল মিলস, রাসপিট ইনকোরেশন বিডি, রোজ হ্যাভেন বলপনে, সালেহ কার্পেট মিলস ও শ্রীপুর টেক্সটাইল মিলসের।


 

এসআর