ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১

সফল খামারির গল্প

মঞ্জুর মোর্শেদ সুমন

প্রকাশিত: ০০:১৬, ৪ জুন ২০২৩

সফল খামারির গল্প

বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে টালমাটাল অবস্থা। আমাদের দেশেও রয়েছে নানামূখী চ্যালেঞ্জ

বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে টালমাটাল অবস্থা। আমাদের দেশেও রয়েছে নানামূখী চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় সাধারন মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আর আমিষের অন্যতম উৎস  মাংস। প্রতিবেশী দেশ ভারত যখনই  দেশে গরু রপ্তানি বন্ধ করে তখনই সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ করা আরো কঠিন হয়ে যায়। বর্তমানে নানা শ্রেনীর উদ্যোক্তা রয়েছে দেশ জুড়ে। যারা পশুর খামারের মাধ্যমে হয়েছেন প্রতিষ্ঠিত। এসব উদ্যোক্তার মাধ্যমে দেশ মাংসের চাহিদা পূরণে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। এরকমই একজন উদ্যোক্তা লুৎফর রহমান স্বপন। আজকে তার সফল খামারের গল্প লিখব। এসএস ক্যাটেল ফার্ম।

শিল্প অধ্যুষিত নারায়ণগঞ্জ, বন্দর হলো শিল্পাঞ্চলের আরেক চারণ ভূমি। সেখানে আজ ভারী, ভারী সব শিল্পের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে ছোট, বড় অনেক গরু ও মহিষের খামার শিল্প। খামার কে শিল্প বলছি এই কারণে, এসব খামারের বিনিয়োগ, রূপ বা অবকাঠামো কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দেখলে এগুলোকে নিতান্তই গরুর খামার বলার সুযোগ থাকে না। তাই গরুর খামারগুলো এখন শিল্পের পর্যায়ই চলে যাচ্ছে। বন্দরে এমন খামার গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটা। তার মধ্যে সমগ্র বাংলাদেশে অতি স্বল্প সময়ে বিখ্যাত একটি খামার হলো দাশের-গাঁএর এস এস ক্যাটেল ফার্ম। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ছিলেন লুৎফর রহমান স্বপন, দেশে ফিরে তারই জন্মভূমি বন্দরের মাটিতে গড়ে তুলেন এক মহা কর্মযজ্ঞ। পতিত জমি কিনে শুরু করেন অবকাঠামো নির্মাণ।

অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো সেখানে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান হবে। সবাইকে অবাক করে ২০১৯ সালে মাত্র ৭৫টি গরু, মহিষ, ছাগল দিয়ে যাত্রা শুরু করেন এস এস ক্যাটেল ফার্ম। ২০২০ সালে হঠাৎ সমগ্র পৃথিবী নিস্তব্ধ কোভিড-১৯ এর ধাক্কায়। অর্থনীতি স্তব্ধ। তখনও সাহস নিয়ে তার মেধা, শ্রম আর ঐকান্তিক চেষ্টায় কোরবানির ঈদে ভালো একটি রিটার্ন খামার থেকে পান। তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি, গত ৪ বছরে তার পথচলা হয়েছে সমৃদ্ধ, সারাদেশে পেয়েছে তার খামারের পরিচিতি। ইতোমধ্যে তার খামারে মহিষ ও গরু ২০২৩ সালে ক্যাটেল এক্সপোতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পেয়েছে বিভিন্ন পুরস্কার।

তার খামারে এখন প্রায় ৬৫০টির মতো গরু ও মহিষ রয়েছে। স্বপন সাহেব জানান, তার খামারে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বেশি মহিষের কালেকশন, এর মধ্যে জাফরাবাদি, মুররাহ্, এলবিনো, নিলিরাবি জাতের মহিষ। রয়েছে দেশী ও বিদেশী জাতের বিভিন্ন রকম গরু। সরেজমিনে তার মহিষ ও গরুর কালেকশন যে কোনো গরু প্রেমীর নজর কাড়বে। সামনে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে খামারের ব্যস্ততা বেড়েছে অনেকগুণ। ক্রেতা চাহিদার কথা মাথায় রেখে নতুন ১৫০টি গরুর জন্য শেট নির্মাণ চলেছে। প্রায় ১২ বিঘা জমির ওপর তার খামারটি। খামারের পরিবেশ এবং অবকাঠামো যেন এক নতুন খামার শিল্পের বার্তা দিচ্ছে।

‘শৈল্পিক খামারে যেনো শিল্পের ছোঁয়া’। এসএস ক্যাটেল ফার্ম শুধু ফেটানিং করে না, তারা দুধের চাহিদা মেটাতে গড়ে তুলেছে দুগ্ধ খামার। প্রতিদিন কয়েকশ’ লিটার দুধ উৎপাদন হয় এই খামার থেকে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের এলাকায়ও বিক্রি করে এই দুধ। তার প্রতিটি গরু ও মহিষের পরিচর্যা হয় আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে। স্থানীয় কাঁচা ঘাস, সাইলেস, ভুট্টাসহ প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা করা হয় এসব পশু। এস এস ক্যাটেল ফার্মে মোট-৬৫ জন স্টাফ রয়েছে। স্বপন সাহেব নিজে প্রতিদিন সব কিছুর তদারকি করেন। সকাল হতে গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিটা জিনিসের পরিচর্যা তার নজরদারিতে রাখেন। দেশের প্রথম সারির অনেক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে তার অভাবনীয় সাফল্যগাঁধা। খামারে ৪শ’ কেজি হতে শুরু করে ১৩শ’ কেজি পর্যন্ত গরু ও মহিষ রয়েছে।

মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জন্যও রয়েছে দারুণ সব কালেকশন। ৭০ হাজার থেকে শুরু করে ১৩ লাখ টাকারও পশু তার কাছে রয়েছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে বেঁচা বিক্রি। আমরা যখন সেখানে যাই, তখন বিকেল। অনেক ক্রেতার ভিড় লক্ষ্য করা গেল। এছাড়া মোবাইলে অসংখ্য ফোন আসছিল অনলাইনে গরু ও মহিষের অর্ডারের জন্য। তাদের একটি ফেসবুক পেইজও রয়েছে এসএস ক্যাটেল ফার্ম নামে। লিংক- https:/ww/w.facebook.com/sscattlefarm71?সরনবীঃরফ=তনডকখি তারা লাইভ ওয়েটে বিক্রি করে থাকেন।

তবে বিশেষ সব কালেকশনে রয়েছে দামাদামি করে নেওয়ার সুযোগ। ফার্মের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল প্রতিটা পশুর প্রতি তারা যতœবান। খামারের ম্যানেজার মেহেদি প্রতিটা পশুর ভ্যাক্সিনেশন, সময় মতো কৃমির ওষুধ, প্রতিদিন চার্ট ধরে পশুগুলোর ওজন পর্যবেক্ষণে রাখেন। স্বত্বাধিকারী স্বপন সাহেব জানালেন, তাদের খামারে কোরাবানির জন্য পর্যাপ্ত গরু ও মহিষ রয়েছে।  নিজস্ব পরিবহন ব্যাবস্থাও রয়েছে গরু পৌঁছে দেওয়ার জন্য। 
তার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা আগামীতে ১ হাজার পশু পালনের, কাজও এগিয়ে নিচ্ছেন সে ভাবে। সারা বছরই তারা বেঁচা-কেনা করে থাকেন। অনেকেই তাদের পছন্দের পশুটি আগেই বুকিং দিয়ে রেখেছেন বলে জানা গেল।

কোরবানি ও মাংসের জোগান নিশ্চিতকরণে ইতোমধ্যে খামারগুলো অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখছে। তবে অতিরিক্ত ভ্যাট, খাবারের  অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ব্যাহত করছে এর উৎপাদন। শঙ্কা দেখা যাচ্ছে এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ইতোমধ্যে গরুর মাংসের কেজি ৮শ’ টাকায় পৌঁছেছে। যা সাধারণের ক্রয় ক্ষমতা অতিক্রম করেছে। তাই, খামার শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে, প্রয়োজন যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। এসএস ক্যাটেল ফার্ম একটি শিল্পের ন্যায় যার কারিগর শিল্পী হলেন লুৎফর রহমান স্বপন। তার মতো তরুণ ও সাহসী উদ্যোক্তাদের নিয়েই একদিন বিশ্ব দরবারে গরু ও মহিষের মাংস উৎপাদনে দেশ বহুদূর আগাবে এমনটাই প্রত্যাশা।

×