ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০

প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতার ভিড়ে বিলুপ্তির পথে সিলেটের বেত শিল্প

বদরুল ইসলাম

প্রকাশিত: ১২:৩৮, ২৮ নভেম্বর ২০২৩; আপডেট: ১২:৪০, ২৮ নভেম্বর ২০২৩

প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতার ভিড়ে বিলুপ্তির পথে সিলেটের বেত শিল্প

বেত শিল্প

সিলেটে একটা সময় বেত শিল্পের চাহিদা ব্যাপক ছিলো। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে।একটা সময় সৌখিন মানুষেরা বেতের তৈরী আসবাবপত্র দিয়ে ঘর সাজিয়ে রাখতো। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে অফিস-আদালতেও শোভা পেত বেতের তৈরী আসবাব। টেকসই এবং আরামদায়ক বেতের প্রতিটি পণ্যের সুনাম দেশের সর্বত্র ছিলো। 

আরও পড়ুন : সড়ক দুর্ঘটনায় মেডিকেল শিক্ষার্থী নিহত

এমনকি এই শিল্প দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হতো।কিন্তু সেই শিল্প এখন তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।এখনো অনেক জায়গায় এই বেতের তৈরী আসবাবপত্র দেখা গেলেও বেত শিল্পের জন্য বিখ্যাত সিলেট নগরীর ‘ঘাসিটুলা’ এলাকা।জানা যায় বর্তমান প্লাস্টিক পণ্যের ভিড়ে এই শিল্পের চাহিদা কমে যাচ্ছে।বেচা কেনা খুব একটা হয়না বলে ব্যবসায়ীরাও আগ্রহ হারাচ্ছে।বেত শিল্পে আগ্রহী কারিগররাও প্রাপ্য মজুরি না পাওয়ায় পেশা বদল করতে যাচ্ছেন। এই শিল্পের কাঁচামাল একটা সময় সহজলভ্য হলেও বর্তমানে তা খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না।যে টুকু পাওয়া যায় তা আবার কিনতে হয় কড়া দামে।সরেজমিনে নগরীর ঘাসিটুলা এলাকা পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, সারা দিনে তারা একটি পণ্য ও বিক্রি করতে পারেনি।এমনকি অনেক দোকানদার বলেন এরকম দু'তিন দিন পার হয়ে গেলেও ক্রেতা পাওয়া যায় না।ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম জানান, একটা সময় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বেতের আসবাবপত্রের অর্ডার আসতো।কিন্তু এখন সারা দিনেও একটা পণ্য বিক্রি করতে পারেন না।বর্তমান বাজারে প্লাস্টিক এর তৈরী হরেক রকম ডিজাইন এর ফার্নিচার আসার কারণে মানুষ এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। এর জন্য তিনি প্লাস্টিকের তৈরী পণ্যের সহজলভ্যতাকে দায়ী করেন।আরিফুল ইসলাম বলেন, স্থানীয়ভাবে বেত উৎপাদন কমে গিয়েছে।বর্তমানে বেতের কেজি একহাজার টাকা।এমনকি আগে যেসব এলাকে থেকে বেত আসতো সেই সব এলাকায়ও বেত খুব একটা বেড়ে উঠছেনা। বন জঙ্গল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ফলে বনাঞ্চল কিংবা টিলা এলাকায় বেত প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠার সেই পরিবেশ এখন নেই। তার পরও যেসব এলাকা থেকে কিছু বেত সংগ্রহ করা হতো, সেই পথও বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।ফলে বেশি দামে বেত কিনতে হচ্ছে এবং কারিগরি মজুরিও অনেকটা বেড়েছে। ক্রেতারাও দাম বেশি দাবি করেন।

ব্যবসায়ী পাঁকি মিয়া জানান, ব্যাবসা এখন আর খুব একটা সুবিধাজনক হয় না। বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র বের হওয়ার কারণে বেত এর আসবাবপত্রের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে।আমরা এ ব্যবসা করে পরিবার নিয়ে খুম হিমশিম খেতে হচ্ছে।সারা দিনেও কোন বিক্রি নেই।মাসে দোকান ভাড়া দিতে হয় অনেক কষ্ট করে। চারদিন পাঁচদিন চলে যায় একটা পণ্য বিক্রি হয় না( বিছমিল্লাহ ও হয় না)।

ফয়জুল হক দুলু জানান, মেশিনের তৈরি প্লাস্টিক সামগ্রী এবং কাঠের তৈরি বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের ভিড়ে পিছিয়ে পড়েছে বেত শিল্প। টিলা বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় আগের মতো চাহিদা অনুযায়ী বেতও পাওয়া যায় না। দূর-দূরান্তে কিছু কিছু স্থানে ছোট আকৃতির বেত পাওয়া গেলেও যাতায়াত ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ শেষে কিছুই থাকে না। পথে পথে পুলিশ এবং বন কর্মকর্তাদের হয়রানি তো আছেই। অন্যদিকে মোটা আকৃতির বেত, যেগুলোকে ‘গল্লাবেত’ বলা হয়; সেগুলো এখন স্থানীয়ভাবে খুব উৎপাদন কম হয়। ফলে ব্যবসা ধরে রাখতে এবং ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সেই মোটা বেত মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়া থেকে সংগ্রহ করতে হয়।

এ বিষয়ে কারিগর সিরাজ এর সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি অনেকটা চাপা কষ্ট নিয়ে বলেন এসব কথা বলে আর কি হবে! আমাদের কষ্ট কে বুঝে!বেচা কেনা খুব একটা নেই।সারা দিনে দু'চার'শ টাকাও হয় না। আমরা না খেয়ে মারা গেলেও কার কি আসে যায়।তিনি জানান বেত শিল্পের দুরূহ অবস্থার কথা কয়েকবার বিভিন্ন মিডিয়ায় বলেছেন।কিন্তু কোন ফায়দা হয়নি।তাই এ বিষয়ে তিনি আর কথা বলতে চাননি।


ঘাসিটুলা এলাকা ছাড়াও বর্তমানে সিলেট এর নবাব রোডে, শাহজালাল মাজার গেট, জিন্দাবাজার এলাকায় বেতের আসবাবপত্রের কিছু দোকান দেখতে পাওয়া যায়। আসবাবপত্র গুলোর মধ্যে রয়েছে বেতের তৈরি ম্যাগাজিন র‌্যাক, টেলিফোন চেয়ার, সোফাসেট, বেড সেট, স্যুজ র‌্যাক, ট্রলি, টেবিল, চেয়ার, ফোল্ডিং চেয়ার, কর্নার সোফা, ইজি চেয়ার, ডায়নিং চেয়ার, বেবি কট ও নবাব সেটসহ রকমারি ফার্নিচার। 

অন্যদিকে কয়েকটি দোকানে বেতের তৈরি জিনিসপত্র থাকলেও নেই আগের  মতো কারিগরের উপস্থিতি। আবার প্লাস্টিক পণ্যের ভিড়ে বতর্মানে শৈল্পিক কারুকাজ ও দৃষ্টিনন্দন নিপুণ হাতে বেতের আসবাবপত্র ও ফার্নিচারের জনপ্রিয়তা বাড়লেও উৎপাদন বাড়ছে না। তবু কিছু ব্যবসায়ী ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ শিল্পের প্রসারে ভূমিকা রাখছেন।ব্যবসায়ীরা বলছেন
সরকার চাইলে এ শিল্পকে জাগিয়ে তোলা সম্ভব।

এবি 

×