ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

দেশে প্রথমবারের মতো গবেষণা শুরু

মুক্তা সংগ্রহ-ঝিনুক চাষের সম্ভাবনা

প্রকাশিত: ০৫:০৩, ১৪ জুন ২০১৮

মুক্তা সংগ্রহ-ঝিনুক চাষের সম্ভাবনা

এইচ এম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ সামুদ্রিক উপকূলে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ঝিনুকের আবাসস্থল থেকে মুক্তা সংগ্রহ ও বাণিজ্যিকভাবে লোনা পানির ঝিনুক চাষের সম্ভাবনা নিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো গবেষণা শুরু হয়েছে। কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মোহনা থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত বিস্তৃত সাগর উপকূলে রয়েছে প্রাকৃতিক ঝিনুক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আগ্রহে কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য প্রযুক্তি কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা এই গবেষণা শুরু করেছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ৩ দিনের প্রশিক্ষণও বৃহস্পতিবার সমাপ্ত হয়েছে। তিনদিনের ওই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য প্রযুক্তি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার আলী বলেন, এদেশের উপকূলীয় এলাকায় মুক্তা বহনকারী ঝিনুকের আবাসস্থল কক্সবাজার, মহেশখালী, সোনাদিয়া, মাতারবাড়ি, কুতুবদিয়া, উখিয়া, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, শাহপরীর দ্বীপ প্রায় সমগ্র সমুদ্র-উপকূল। যুগ যুগ ধরে উপকূলীয় জনসাধারণ এসব এলাকা থেকে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করে আসছে। জোয়ারের সময় শামুক-ঝিনুকগুলো উপকূলে ভেসে আসে। এ সময় স্থানীয় লোকজন সেখান থেকে সংগ্রহ করে। ২০০৫-০৬ সালে চালানো সর্বশেষ জরীপে কক্সবাজারের বাঁকখালী নদী মোহনা, মহেশখালী, সোনাদিয়া ও ঘটিভাঙ্গায় প্রাকৃতিকভাবে মুক্তা উৎপাদনকারী পাঁচ প্রকারের ঝিনুকের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে করতাল নামক এক প্রকার ঝিনুকে মুক্তার সন্ধানও পান তারা। পানির ১ মিটার হতে ২ মিটার গভীরতায় বালুকাময় তলদেশে ও ১৮ হতে ২২ পিপিটি লবণাক্ততায় একটি ঝিনুক বা করতালে গড়ে ৫টি হতে সর্বোচ্চ ১২টি মুক্তা জরীপে পাওয়া গেছে। তবে পরিবেশ দূষণ, আবাসস্থলের পরিবর্তন, নির্বিচারে ঝিনুক আহরণ ইত্যাদি নানাবিধ কারণে বর্তমানে প্রাকৃতিক উৎস থেকে ঝিনুক ও মুক্তার প্রাপ্যতা অনেকাংশে কমে গেছে। আর এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আগ্রহে বাণিজ্যিকভাবে ঝিনুক চাষের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এর কয়েক বছর আগে কৃত্রিম উপায়ে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদনেও এই কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা সাফল্য পাওয়ায় মুক্তা নিয়ে নতুন গবেষণা প্রকল্প শুরু করা হয়েছে বলে জানান ড. জুলফিকার। তিনি জানান, দেশে ১৯৯৯ সালে স্বাদুপানিতে পরীক্ষামূলকভাবে মুক্তাচাষ শুরু হলেও লোনাপানিতে মুক্তা চাষের গবেষণা কার্যক্রম এটাই প্রথম। এদেশে স্বাদুপানির ঝিনুকের ৬টি প্রজাতি এবং সামুদ্রিক লোনাপানির ঝিনুকের ১৪২টি প্রজাতি রয়েছে। উপকূলীয় এলাকার এসব ঝিনুক বিভিন্ন কাজে ব্যবহ্নত হলেও মুক্তা তৈরিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার। বিশ্বের প্রায় স্বল্প উষ্ণপ্রধান ও উষ্ণপ্রধান সামুদ্রিক জলাশয় ঝিনুকের আবাসস্থল। এরা সমুদ্রের স্বল্প গভীর হতে ৮০ মিটার গভীর এলাকায় বিচরণ করে। প্রায় ৩০টি সামুদ্রিক ঝিনুক প্রজাতির মধ্যে ৩টি সামুদ্রিক প্রজাতির ঝিনুক বাণিজ্যিক মুক্তা উৎপাদনে ভূমিকা পালন করে। জানা যায়, ঝিনুকের খোলস থেকে চুন, অলঙ্কার, গৃহ সাজসজ্জাকরণ উপকরণ তৈরি, পোল্ট্রি ও ফিশ ফিড মিলে ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঝিনুকের মাংসল অংশ চিংড়ি, মাছ ও হাঁস-মুরগির খাবার হিসেবে ব্যবহ্নত হয়। বিশ্বের অনেক দেশে ঝিনুকের মাংসল অংশ প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার হিসেবে ব্যবহ্নত হয়। বাংলাদেশে সাধারণত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ঝিনুকের মাংস খেয়ে থাকে। ড. জুলফিকার আলী আরও জানান, সামুদ্রিক ঝিনুক (ওয়েস্টার) একটি দামী সী-ফুড হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং অনেক দেশে এর ওপর ভিত্তি করে খামারও গড়ে উঠেছে। ১৯৯০-এর দশকে প্রতিবেশী ভারতে সামুদ্রিক ঝিনুকের বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়েছে। অথচ আমরা এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছি। বাণিজ্যিকভাবে ঝিনুক চাষের আরও গুরুত্ব তুলে ধরে মুখ্য বিজ্ঞানী জুলফিকার বলেন, মানুষ ও জলজ পরিবেশে উভয়ের জন্য ঝিনুক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জলাশয় থেকে শৈবাল, জৈব পদার্থ এবং দ্রবীভূত ক্ষতিকারক উপাদান যেমন ভারী ধাতু দূরীকরণে ঝিনুকের ভূমিকা রয়েছে। তাই ঝিনুক প্রাকৃতিক পানি পরিষ্কারক হিসেবে কাজ করে। জলজ খাদ্য শৃঙ্খলের ক্ষেত্রেও ঝিনুক একটি গুরুত্বপুর্ণ উপাদান এবং এরা জলজ খাদ্য শিকলের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। তাই প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে ঝিনুক সংগ্রহের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি না করে ঘেরে চাষের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে ঝিনুক চাষ।
monarchmart
monarchmart