ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৯ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

তিন মাসে ঘাটতি বেড়েছে ১ হাজার ১১১ কোটি

প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ ৮ ব্যাংক

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

প্রকাশিত: ০০:৫০, ৩০ মে ২০২৩

প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ ৮ ব্যাংক

ব্যাংকিং খাতে এক দিকে বাড়ছে খেলাপি ঋণ, অন্য দিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতি বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি

ব্যাংকিং খাতে এক দিকে বাড়ছে খেলাপি ঋণ, অন্য দিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতি বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিক শেষে খেলাপিসহ ঋণমান অনুযায়ী প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে ৮ ব্যাংক। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ী তা পরিশোধ করছেন না। এ জন্য ব্যাংকগুলোর আয় দিয়ে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। এতে বেড়ে যাচ্ছে প্রভিশন ঘাটতি। প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি দুর্বল হয়ে আসে। এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু প্রভিশন ঘাটতি হলে ঝুঁকির মুখে পড়ে যান আমানতকারীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেলাপিসহ ঋণমান অনুযায়ী প্রভিশন সংরক্ষণে যে ৮ ব্যাংক ব্যর্থ হয়েছে তাদের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা। তিন মাস আগে এই ঘাটতি ছিল ১৯ হাজার ৪৮ কোটি। অর্থাৎ তিন মাসে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ১ হাজার ১১১ কোটি। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকে আমানতের নিরাপত্তা কম। খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল, প্রভিশন ঘাটতি সমস্যা সমাধানে একটি ব্যাংক কমিশন গঠন করা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে সরকারি তিন ব্যাংক, বেসরকারি চার এবং বিশেষায়িত এক ব্যাংকের সামষ্টিক প্রভিশন ঘাটতির অঙ্ক ২০ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কয়েকটি ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করায় পুরো ব্যাংক খাতের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে সরকারি বেসিক ব্যাংকের। মার্চ শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। এর পরই রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। বছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে অগ্রণী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৪ হাজার ১১ কোটি টাকা। তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে রূপালী ব্যাংক। ৩ হাজার ৮০ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংকটি। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে নানা সমস্যায় জর্জরিত ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির অঙ্ক ৭ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা ব্যাংকের ৪৯৭ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ৩৬০ কোটি টাকা ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১৬০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) প্রভিশন ঘাটতির অঙ্ক ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। ব্যাংক যদি প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার শঙ্কা থাকে। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যাংকের ওপর। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় আমানত। এসব সমস্যা সমাধানে একটি ব্যাংক কমিশন গঠন করা উচিত। এ ধরনের কমিশনের মাধ্যমে এর আগেও বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ মাস শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা; যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চ খেলাপির ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের ব্যাংক খাত। কারণ আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ সহনীয় বলে ধরা হয়। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বছরের প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। তিন মাস আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের হিসাবে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা।
প্রসঙ্গত, বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত নানা নীতিমালা কাজে আসছে না বলে মত ব্যাংকারদের। ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ) বাংলাদেশের অনুকূলে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদনকালে যেসব শর্ত দিয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন শর্ত দেওয়া হয়েছে ব্যাংকিং সেক্টর সংস্কার প্রশ্নে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এসব নীতি সংস্কার করতে যায়, তা হলে ব্যাংকিং সেক্টরে বিদ্যমান অনেক আইন, বিশেষ করে সম্প্রতি যেসব আইনি পরিবর্তন করা হয়েছে, তা  উল্টে যাবে।

×