ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ জুলাই ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১

লিবিয়ায় জিম্মি অর্ধশত যুবক 

লাখ লাখ টাকা দিয়েও মুক্তি মিলছে না  চলে নির্যাতন

নিজস্ব সংবাদদাতা, মাদারীপুর

প্রকাশিত: ২২:৩২, ২৩ জুন ২০২৪

লাখ লাখ টাকা দিয়েও মুক্তি মিলছে না  চলে নির্যাতন

লিবিয়ায় একটি বন্দিশালায় মাফিয়াদের হাতে জিম্মি ২৪ যুবক

অবৈধপথে ইতালি যাওয়ার সময় লিবিয়ায় মাফিয়াদের হাতে জিম্মি মাদারীপুরের ২/৩ গ্রামের অর্ধশত যুবক। মোবাইলে অডিও বার্তা পাঠিয়ে দালালরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। দেশীয় দালালদের মাধ্যমে মাফিয়াদের লাখ লাখ টাকা দিলেও তাদের মুক্তি মিলছে না। অর্ধশত বলা হলেও সঠিক সংখ্যা নেই কারও কাছে। প্রশাসন বলছে, দূতাবাসের মাধ্যমে যুবকদের ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দালালদের বাড়িতে গিয়েও পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর পলাতক রয়েছে অভিযুক্তরা। তবে একের পর এক এ ঘটনা ঘটলেও পুলিশ ও প্রশাসানের কাছে অভিযোগ করছে না ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। অনেকে সন্তানদের নিরাপত্তায় মুখ খুলছে না।
লিবিয়ায় মাফিয়াদের হাতে জিম্মি যুবকরা হলো-সদর উপজেলার মস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের মতলেব ফকিরের ছেলে শাকিব ফকির, বাদশা হাওলাদারের ছেলে হাসান হাওলাদার, সালাম হাওলাদারের ছেলে নূর আলম হাওলাদার, জব্বার হাওলাদারের ছেলে বেলাল হাওলাদার, মোক্তার মোল্লার ছেলে জসিম মোল্লা, এনামুল হাওলাদারের ছেলে নয়ন হাওলাদার, সামচু সরদারের ছেলে হৃদয় সরদার, সেকেন্দার সরদারের ছেলে সাইফুল সরদার, গোলাম ফারুক সরদারের ছেলে মোস্তাফিজ, আমির ফকিরের ছেলে শাহীন, দুলাল মোল্লার ছেলে আরমান মোল্লা। একই ইউনিয়নের বড় বাড্ডা গ্রামের মনির তালুকদারের ছেলে মুন্না তালুকদার। এ ছাড়া ওমর ফারুক, শুভ ইসলাম, সাব্বির হোসাইন, জুয়েল মৃধাসহ অর্ধশত যুবকের নাম রয়েছে এই তালিকায়। পাশাপাশি কেন্দুয়ার ঘটকচরসহ অন্যান্য গ্রামের বেশকিছু যুবককে লিবিয়ায় নিয়ে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে এদেশের দালালচক্র। তাদের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সদর উপজেলার মস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রাম। এই গ্রামের যুবক হাসান হাওলাদার। চলতি বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি অবৈধপথে ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। ঢাকা থেকে লিবিয়া পৌঁছে ধরা পড়েন মাফিয়াদের হাতে। পরে বাবা বাদশা হাওলাদার ও মা রহিমা বেগমের মোবাইলে পাঠানো হয় নির্যাতনের অডিও বার্তা।

মুক্তিপণ হিসেবে মাফিয়ারা দাবি করেন ৩০ লাখ টাকা। সন্তানকে বাঁচাতে ভিটেমাটি বন্ধক রাখার পাশাপাশি চড়া সুদে দফায় দফায় ২২ লাখ টাকা এনে তুলে দেয় স্থানীয় দালালদের হাতে। তবু হাসানের দেশে ফেরা এখনো অনিশ্চিত। বর্তমানে কেমন আছেন এই যুবক জানে না পরিবার। একইভাবে বালিয়া গ্রামের অর্ধশত যুবক ভাগ্য ফেরাতে ইতালি যাওয়ার পথে লিবিয়ায় জিম্মি মাফিয়াদের হাতে। এসব যুবকদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। তবু মুক্তি মিলছে না। স্বজনদের অভিযোগ, প্রলোভন দিয়ে বালিয়া গ্রামের রশিদ সরদারের ছেলে দেলোয়ার সরদার প্রত্যেকের পরিবারের কাছ থেকে কৌশলে আদায় করছে মুক্তিপণের টাকা। তার সহযোগী একই গ্রামের মজিদ ফকিরের ছেলে এমদাদ ফকির ও হাবিব ফকিরের ছেলে কামাল ফকির। হাসানের বাবা বাদশা হাওলাদার বলেন, ‘ধাপে ধাপে দালাল দেলোয়ার সরদার ও তার দুই সহযোগী এমদাদ ফকির ও কামাল ফকির এ পর্যন্ত ২২ লাখ টাকা নিয়েছে। প্রথমে সুদে টাকা এনে দিয়েছি, পরে বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা দিয়েছি। এখন আর টাকা দেওয়ার উপায়  নেই। আমার ছেলে এক সপ্তাহ ধরে কেমন আছে, তাও জানি না।’ হাসানের মা রহিমা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে মাফিয়ারা জিম্মি করে রেখেছে। তারা বিভিন্ন কৌশলে লাখ লাখ টাকা নিয়েছে। কিন্তু আমার ছেলেকে মুক্তি দিচ্ছে না। আমরা আমাদের সন্তানের মুক্তি চাই, আর দালালদের বিচার চাই। এজন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।’
লিবিয়ার বন্দি বেলাল হোসেন হাওলাদারের স্ত্রী স্নিগ্ধা আফরোজ বলেন, ‘ইউরোপ যাবার স্বপ্ন, স্বপ্নই রয়ে গেল। এই স্বপ্নটা বাস্তবে রূপারত হলো না। আর হবে কি না তা আমরাও জানি না। আমার স্বামী ৪ মাস আগে বাড়ি থেকে বের হয়েছে, পরে লিবিয়ায় দালালরা ও মাফিয়ারা জিম্মি করে ফেলেছে। তার মুক্তির জন্য এখন পর্যন্ত ২৫ লাখ টাকা দিয়েছি। ধাপে ধাপে এতো টাকা দিলাম, কিন্তু মাফিয়ারা মুক্তি দিচ্ছে না। এর শেষ কোথায় আমরা তাও জানি না!’
বালিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আজিজুল ফকির বলেন, ‘দেলোয়ার দালালের কারণেই এই যুবকরা মাফিয়াদের হাতে জিম্মি। এসব যুবককে নির্যাতন করে লাখ লাখ আদায় করছে চক্রটি। আমরা সবাই এই দালালের বিচার চাই। আর বন্দি যুবকদের ফেরত চাই।’ 
স্থানীয় বাসিন্দা নাসিমা বেগম বলেন, ‘এই দালাল দেলোয়ার সরদারের কারণে আমরা দেউলিয়া হয়ে গেছি। দেলোয়ার প্রথমে মিষ্টি কথা বলে যুবকদের লিবিয়া পাঠায়, পরে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেয়। আমরা এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাউদ্দিন বলেন, ‘লিবিয়ায় কয়েকজন যুবককে জিম্মি করে অর্থ আদায় করা হচ্ছে এমন তথ্য এখনো থানাতে নেই। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল মামুন বলেন, ‘দুতাবাসের মাধ্যমে লিবিয়ায় বন্দি যুবকদের ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর যুবকদের পরিবার মামলা করলে তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’
 

×