ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ জুলাই ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১

পাখির নিরাপদ আশ্রয়

গাছের ডালে কৃত্রিম বাসা, কারিগর সুধীজন ও শিক্ষকরা

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ২৩:২৩, ১৪ জুন ২০২৪

গাছের ডালে কৃত্রিম  বাসা, কারিগর  সুধীজন ও শিক্ষকরা

যশোরের ঝিকরগাছার রঘুনাথনগর গ্রামে শিক্ষার্থী ও সুধীজনরা গাছে গাছে কৃত্রিম পাখির বাসা তৈরি করে দেন

আমগাছ, জামগাছ, কাঁঠালগাছ থেকে শুরু করে গ্রামের সব উঁচু গাছেই পাখিদের বাসা বাঁধার জন্য টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে ছোট ছোট বাসা। সূর্য মাথার ওপর। ঘড়ির কাঁটা একটার দাগ ছুঁয়েছে। একটি বড় আমগাছে চার-পাঁচজন খাঁচা (কঞ্চি-বাঁশের তৈরি) বাঁধছেন। গাছের নিচে শতাধিক শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেখানে একটি ব্যানারে লেখাএকটুখানি সহযোগিতা আগামীর সম্ভাবনা, বাংলাদেশের পাখি, বাংলাদেশের প্রাণ, পাখি বাঁচান, বাংলাদেশকে বাঁচান।চিত্রটি দেখা গেছে সম্প্রতি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার রঘুনাথনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদের তীরে বিদ্যালয় আঙিনায় ২০টি গাছে শতাধিক কৃত্রিম পাখির বাসা টাঙানো হয়।

ঝিকরগাছার কুলিয়া গ্রামের মোহাম্মদ সায়েদ আলী পাখির নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এই কাজটি করেন। ৫৩ বছরের মোহাম্মদ সায়েদ আলী পেশায় একজন কৃষক। তবে এলাকাবাসীর কাছে তিনি সাদা মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত। আর এই নামে পরিচিত হতে তাকে সময় দিতে হয়েছে ২৯ বছর। সায়েদ আলী কুলিয়া গ্রামের মাহমুদ আলী মোড়লের ছেলে।

সায়েদ আলী, ১৯৯৫ সালে নিজ গ্রামের দাখিল মাদ্রাসার ৩০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে শুরু করেন বিভিন্ন সামাজিক পরোপকার কাজ। এরপর থেকে তিনি কাজ করেই যাচ্ছেন। বজ্রপাত রোধে গ্রামের রাস্তার দুই পাশে তালের আঁটি (বীজ) রোপণ, ছাত্রছাত্রীদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ, পাখির অভয়াশ্রমের জন্য গাছে ঠিলা (মাটির ছোট কলস) টাঙানো পুকুর বানিয়ে সেখানে মাছ খাওয়ার ব্যবস্থা এবং পাখিদের খাবার দেয়ার মতো বেশকিছু কাজ তিনি নিয়মিত করেন।

রঘুনাথনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পাখির নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সায়েদ আলীর উদ্যোগে গাছে কৃত্রিম বাসা টাঙানো এলাকাবাসীর নজর কেড়েছে। বিদ্যালয়ে কাজটি শুরু করার আগে তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠানও করেন। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কোরবান আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন মীর ফারুক আহম্মদ। বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসএম হাসানুল বান্না, শিক্ষক মিজানুর রহমান, বাগবুল মাহবুবুর রহমান প্রমুখ। সময় বক্তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির প্রয়োজনীয়তা, পাখি সংরক্ষণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। রঘুনাথনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তৌফিক হোসেন বলে, অনুষ্ঠানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির গুরুত্ব জেনেছি। পাখিদের আশ্রয়ের জন্য আমিও গাছে বাসা টাঙাতে চাই। পাখির উপকারিতা কাজ সম্পর্কে আগে এত জানতাম না।

রঘুনাথনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসএম হাসানুল বান্না বলেন, সাদা মনের মানুষ খ্যাত সায়েদ আলী আমার বিদ্যালয় আঙিনায় গাছে কৃত্রিম পাখির বাসা টাঙিয়ে যে বিষয়টি দেখালেন, তাতে শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা নেবে এবং তারাও কাজটিতে যুক্ত হবে বলে মনে করি। মীর ফারুক আহম্মদ বলেন, সায়েদ আলী ব্যক্তিগত উদ্যোগে তার এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় সেবামূলক কাজ করে বেড়ান। পাশাপাশি কয়েক বছর তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ, পাখি বাঁচাতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। যা সাধারণ মানুষ শিক্ষার্থীদের মাঝে সাড়া ফেলেছে। সায়েদ আলীর জাতীয় কাজের কারণে এলাকার মানুষ তাকে সাদা মনের মানুষ বলে ডাকে। মোহাম্মদ সায়েদ আলী বলেন, মানুষ হিসেবে এসব কাজগু করা উচিত তাই করি। এতে আমার ছেলে সাকিল হোসেন খরচ দেন। ছেলে সাকিল একটি কোম্পানিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছে। এসব কাজ করে আমি মানসিক প্রশান্তি পাই বাকি জীবন এভাবে চলতে চাই। তিনি আরও বলেন, পাখিদের আমি খুব ভালোবাসি। আমাদের চারপাশের গাছপালা যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে, তাতে পাখিদের বসবাসের জায়গা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাখিদের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে গাছে গাছে বাসা বাঁধার উদ্যোগ নিয়েছি।

×