ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২১ জুলাই ২০২৪, ৬ শ্রাবণ ১৪৩১

তিথির লাল সাইকেল

শেরিফ ফারুকী

প্রকাশিত: ২২:০২, ১৪ জুন ২০২৪

তিথির লাল সাইকেল

.

তিথির জন্মদিনে সবাই অনেক অনেক উপহার এনেছে। ঘরভর্তি উপহার। একটা সুন্দর বইও উপহার পেয়েছে সে, তিথির নীল তোয়ালে। আর বড় মামা একটা বিরাট বক্সে কি যেন নিয়ে এসেছেন। ওই বক্স খোলা হবে রাতে। কিন্তু রাতে জন্মদিন পালন হলো না তিথির, মায়ের পেটে প্রচন্ড ব্যথা উঠেছে। সবাই হাসপাতালে। ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ করছে বড় মামা। বাবা তো পাগলের মতো একবার এদিক আরেকবার ওইদিক ছুটছে। তিথি শুনেছে তার নাকি একটা ছোট্ট ভাই আসবে।

তিথি তাদের ক্লাসের ঝুমুরকে সাইকেল চালাতে দেখেছে। দুইপাশে মোট চারটা চাকা লাগানো ঝুমুরের সাইকেল। বড় হলে তিথি একটা সাইকেল কিনবে ভাবল। সাইকেলে তার ছোট্ট তুলতুলে ভাইটা কিভাবে উঠবে সে ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে গেল চোখে।

ঘুমের মধ্যে একটা আজব জিনিস দেখলো। একটা ছোট্ট ছেলে তিথির সাইকেলটা আস্তে আস্তে করে চালাতে চাচ্ছে। কিন্তু ছেলেটা ভীষণ ছোট, পা নামছে না প্যাডেল পর্যন্ত। তিথি সাহায্য করতে চেষ্টা করল। কিন্তু সে সাহায্য করতে পারছে না। তিথি হাঁটতে পারছে না। তাকে যেন কেউ ধরে রেখেছে।

বড় মামা তিথিকে ধরে রেখেছে। সে হাঁটছিল ঘুমের মধ্যে।

ঘুম থেকে উঠে তিথি দেখলো সবাই ভীষণ খুশি। বাবা একটা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে এসেছে। মায়ের পাশে চাদরে প্যাঁচানো একটা পোটলার মতো জিনিস। তিথির ইচ্ছা করল ছেলেটাকে টুক করে আদর করে ফেলতে। কিন্তু খালামনি বলল, এখন ওকে ধরা যাবে না একদম।

দুইদিন পর ওরা যখন বাড়ি ফিরল ছোট্ট ছেলেটা পিটপিট করে তাকানো শিখে গেছে তখন। তিথির তখুনি মনে হলো মামার বাক্সের কথা। জন্মদিনের বড় বাক্সটা এখনো খোলা হয়নি। তিথি এক দৌড়ে বাক্সটা আনতে গেল। কিন্তু ওটা বেশ ভারি। সে একবার ভাবল খুলেই দেখে ভেতরে কী আছে। কিন্তু বক্সটার চারপাশ স্কচটেপে ভালো করেই আটকানো।

মামা আসলেন বিকেলে। মামাকে তিথি বলল, বাক্সটা খোলার কথা। মামা বলল, চল, এক্ষুণি খুলে ফেলি ওটা। একদম ভুলেই গেলাম। তিথি ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে একটা কাঁচি নিয়ে আসল মায়ের সেলাইয়ের যন্ত্র রাখার বক্স থেকে।

সবাই এখন ড্রয়িংরুমে, খালামনি, ফুপি, বড়মামা, বাবা সবাই। শুধু মা আর ছোট্ট বাবুটা নেই। কটাস করে মামা স্কচটেপটা কাটতেই বেরিয়ে এলো লাল একটা সাইকেল। কিন্তু সাইকেল তো ভাঙ্গা!

মামা বললেন, ওটা বাক্সে এমনই থাকে। দোকানে নিয়ে সাইকেলটা বাঁধাই করতে হবে।

অবশেষে সাইকেলটা বাঁধাই হয়ে আসল। লাল টুকটুকে একটা সাইকেল। ঝুমুরের সাইকেলের চেয়ে সুন্দর। চাকার বাইরে আরও দুইটা চাকা লাগানো।

ছোট্ট ভাইটার নাম রাখা হবে আজ। বাড়িতে উৎসব উৎসব ব্যাপার। আর সারা বাড়ি একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে তিথি। তার একটু মন খারাপ। ছোট্ট ভাইটাকে নেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই সাইকেলে।

সে যখন মামাদের এলাকা সিলেটে ঘুরতে গেছে চা বাগানে দেখেছে। ছোট্ট বাবুদেরকে ব্যাগের মতো কিছু একটার ভেতর বসিয়ে রেখে সবাই চা পাতা তুলছে। তেমন ব্যবস্থা থাকলেও হতো। সে মামাকে বলবে কি-না ভাবছিল। মামা নিজ থেকেই বুঝতে পারল, কিরে মিতু বুড়ি, তোর মন খারাপ ক্যান? সাইকেলে মামাকে নিবি না? ! নিবি কিভাবে, তোর তো পেছনে নেওয়ার সিট নাই।

ছোট্ট বাবুটার নাম রাখা হয়েছে ছোটন। মামা সাইকেলে একটা সিট লাগিয়ে এনেছে। বলেছে, ছোটন যখন আরেকটু বড় হবে তখন ওকে চড়াতে পারবি, এখন না।

তিথির এখন একটাই চিন্তা- ওর ভাইটা কখন আরেকটু বড় হবে আর দুজন মিলে সাঁইসাঁই করে ঘুরতে পারবে।

তিথি একটা আজব স্বপ্ন দেখলো আজ। ছোটনকে নিয়ে সে সাইকেল চালাতে চালাতে অনেকদূর চলে গেছে। সামনে সমুদ্র। ছোটন বলে, চালাও জোরে চালাও আপু! তিথি জোরে জোরে চালাতে থাকে সাইকেল। বড় বড় ঢেউয়ের ফাঁক গলে তার সাইকেলটা উঠানামা করছে। একটা শুশুক এসে সাইকেলের পাশে চক্কর দিয়ে গেল। গভীর সমুদ্রে দূরে দূরে বিশাল সব সামুদ্রিক প্রাণী ঘোরাঘুরি করছে। তবুও সে ভয় পায় না। তার আছে একটা উড়ন্ত সাইকেল, সাঁইসাঁই করে উড়ে যেতে পারবে সে।

উড়তে উড়তে মেঘেদের কাছাকাছি চলে গেল সে। তারপর হাওয়ায় ভাসতে থাকল ছোটন আর তিথি। তাদের সাইকেলও ভাসছে। তিথির ঘুম ভাঙলে দেখল সারা ঘর পানিতে ভেজা। সারারাত বৃষ্টি হওয়ায় পানি ঢুকে একাকার হয়ে গেছে সব। সে পা-টিপে টিপে ছোটন নিজের সাইকেলটা দেখে আসে, ছোটন ঘুমাচ্ছে। বেশ কিছুদিন ঘরে বন্দি থাকতে হবে তিথিকে। বৃষ্টির মৌসুমে ঘর থেকে বের হতে পারে না ওরা। ওদের স্কুলও বন্ধ থাকে সময়।

তিথি ভাবতে থাকে। পানি নেমে গেলে আবার সাইকেল নিয়ে বের হবে সে, সঙ্গে ছোট্ট ছোটন। সাঁইসাঁই করে উড়তে থাকবে তিথি, হয়তো পাহাড়-সমুদ্র সবকিছু পেরিয়ে মেঘেদের দেশে চলে যাবে। এখন শুধু পানি নামার অপেক্ষা।

×