ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

অনিয়ন্ত্রিত মেলায় উগ্রতা অসহিষ্ণুতা

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ২৩:৪৬, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪; আপডেট: ০১:৫৪, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

অনিয়ন্ত্রিত মেলায় উগ্রতা অসহিষ্ণুতা

বইমেলায় মাঝে মাঝেই উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচিত কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ

বাণিজ্যমেলা এটি নয়। বইমেলা। বাঙালির ভাষা আন্দোলনের অমর স্মৃতি আয়োজনটির সঙ্গে খুব করে জড়িয়ে আছে। অথচ কী কান্ড ! একুশের সেই ভাবগাম্ভীর্য কোথাও তো চোখে পড়ছেই না, উপরন্তু এক ধরনের উদাসীনতা-অবহেলা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বায়ান্নর ইতিহাস মনে করিয়ে দিতে পারে বা জং ধরা উপলব্ধিতে একবার টোকা দিতে পারেÑ তেমন কোনো উপস্থাপনা মেলার কোথাও চোখে পড়ে না। একসময় ভাষা আন্দোলনের অবিনাশী চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উজ্জীবিত পড়ুয়া বিদগ্ধ শ্রেণিটিই ছিল মেলার প্রাণ। ঘুরে ফিরেই দেখা হয়ে যেত খ্যাতিমান লেখক কবি প্রকাশক সাংবাদিক শিক্ষাবিদ চিন্তাবিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নিমগ্ন থাকা মানুষজনের সঙ্গে। একটা সুবাতাস তাই সব সময় বইত। নতুন বইয়ের খোঁজখবর নেওয়া, পছন্দ অনুযায়ী কেনা, গল্প-আড্ডা জমানোÑ সবই হতো পরিশীলিত উপায়ে। আয়োজক বাংলা একাডেমিরও এসবের ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ ছিল। কিন্তু এখন মেলাটি কার তা বোঝার কোনো উপায় নেই। বাংলা একাডেমি চত্বর বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অপাঠক অপ্রকাশকদের আঁখড়াবাড়িতে পরিণত হয়েছে। এখানে এসে যার যা খুশি করতে পারছে। মেলার ভেতরে এবং চারপাশে যেন হাট বসেছে। বারোয়ারি চেহারা পেয়েছে মেলা।    
বইপ্রেমী মানুষের পাশাপাশি বই থেকে, চিন্তা থেকে, বিদ্যা-বুদ্ধির চর্চা থেকে বিচ্যুত অনেক মানুষ ঝাঁকেঝাঁকে মেলায় আসছে এখন। না, তাতে বাধা নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু প্রবণতা অস্বস্তি উদ্বেগ দুটোই বাড়িয়ে দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে অনেক উগ্র উচ্ছৃঙ্খল মানুষ মেলায় ঢুকে এর পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিনষ্ট করছে। হৈ হুল্লোড় করছে। অকারণে ছোটাছুটি করছে। যে পথ ধরে এরা যায়, পঙ্গপালের মতো যায়। লক্ষ্য করে দেখা গেছে, আসলে এরা স্কুল-কলেজের অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ছেলে-ছোকরা। সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে মৌলবাদের বিষ গিলে গিলে  বিভ্রান্ত এক প্রজন্ম। ফেসবুক ইউটিউব দেখে তার ভিত্তিতে মনগড়া সত্য বা মিথ্যা রচনা করছে তারা। সে অনুযায়ী ক্রিয়া করছে। প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়াশীলদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে বইমেলা। এখানে তারা বাধাহীনভাবে অসুন্দর অসহিষ্ণুতা উগ্রতা ছড়াচ্ছে। এমনকি মেলায় এসে যাকে পছন্দ না তাকে টার্গেট করে অপদস্থ করছে। বের করে দিচ্ছে। একাধিকবার বড় আকারে এমন ঘটনা ঘটায় উদ্বিগ্ন সুশীল সমাজ। তারা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আরও বড় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এমন নিয়ন্ত্রণহীন কী করে হয় একুশের বইমেলা! 
এ প্রসঙ্গে হতাশা ব্যক্ত করেছেন বিপুল জনপ্রিয় লেখক শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। স্বভাবসুলভ কোমল কণ্ঠেই কঠিন কথা বলেছেন তিনি। তার ভাষায়, বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষের স্বাধীনভাবে থাকার অধিকার আছে। যাকে আমি পছন্দ করি তার থাকার অধিকার আছে। যাকে পছন্দ করি না তারও সমানভাবে থাকার অধিকার আছে। কেউ যেন বিচারক না হয়ে যায়। কারও লেখা ভালো না হলে পাঠক পড়বে না। অন্যায় কিছু হলে আইনের আশ্রয় নেবে। কিন্তু মেলায় এসে গায়ের জোরে কিছু করা যাবে না বলে সতর্ক করে দেন তিনি।    
প্রকাশকরাও মেলার সাম্প্রতিক প্রবণতা দেখে ক্ষুব্ধ। নিজের প্যাভিলিয়নে বসে আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গনি বলছিলেন, মেলায় অপাঠক বেশি ভিড় করছে। নতুন নতুন বিশৃঙ্খলার মূলে তারা। আবার এ কথাও না বললে নয় যে, মেলায় অপাঠকদের মতো আছে অপ্রকাশকও। অপ্রকাশকই বেশি। জ্ঞাননির্ভর সৃজনশীল মননশীল বইয়ের প্রকাশক একশ’র বেশি হবে না। অথচ ফটোকপির দোকানদারও মেলার সময় স্টল নিতে চলে আসছে। এরা চটুল বই প্রকাশ করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে বিকশিত হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। ফেসবুকনির্ভর বই এবং পাঠক ঘিরেই বেশি উচ্ছৃঙ্খলা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কখনো কখনো বোঝার উপায় থাকে না মেলার নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে! 
একই প্রসঙ্গে অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্সের সিইও সৈয়দ জাকির হোসাইন আরও একটু গভীরে গিয়ে বলেন, আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের মগজে-মননে মানুষ রাখছি না। তার প্রভাব পড়ছে সমাজে। মেলায়ও পড়বে এটাই স্বাভাবিক। এই ধরনের ভিড় হট্টগোল টাকা পয়সা দিয়ে কেউ করাতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। মেলায় আসা প্রকাশনার মান প্রসঙ্গে বলেন, এবারের মেলা বইমেলার আভিজাত্য হারিয়েছে। তার অভিযোগ, অনেক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রকাশক সেজে মেলায় আছে। তার অভিযোগ, এই মৌসুমি প্রকাশকরা বেশি দামি কাগজ ইত্যাদি ব্যবহার করে বইয়ের দাম বাড়িয়ে ‘ফুটানি’ করছে। ‘ফুটানি’ করলে বইয়ের কন্টেন্ট দিয়ে করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।      
এবারের মেলায় যাওয়া আসা করে রীতিমতো ক্ষুব্ধ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং লেখক গোলাম কুদ্দুছ। তিনি বলছলেন, মেলাটা আসলে বেহাত হয়ে গেছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশাল বিশাল অফিস করা হয়েছে মেলায়। দেখে মনে হতে পারে ক্যান্টনমেন্ট। অথচ মেলায় যে সে ঢুকে মাস্তানি করতে পারছে। উগ্রতা প্রদর্শন করতে পারছে। পুলিশ বা র‌্যাব নির্বিকার। মেলাটাকে চারপাশ থেকে গিলে খাচ্ছে দোকানপাট। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর লাভ না থাকলে এসব হতে পারত না। বাংলা একাডেমিরও দায় আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 
মজার বিষয় হচ্ছে, প্রায় সব অভিযোগ সত্য বলে স্বীকার করে নিয়েছেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব কে এম মুজাহিদুল ইসলামও। তবে দায় নিতে রাজি হননি। তিনি বলেন,  মেলাটিকে আমারও হাট বাজারই মনে হয়। বিনোদনকেন্দ্র হয়ে গেছে। কিন্তু অমরা কত করব? মেলায় বিশৃঙ্খলা হচ্ছে, দেখার  তো কথা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর। আমি ওই সব উচ্ছৃঙ্খল ছেলেদের ভিডিয়ো করে পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। উচ্ছৃঙ্খলতার একটি ঘটনার জন্য মিজান পাবলিশার্সকেও দায়ী করেন তিনি।      
বইয়ের মান এবং অপ্রকাশক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একাডেমির আরও অনেক কাজ আছে। আলাদা সম্পাদনা পরিষদও নেই যে বইয়ের মান দেখবে। প্রকাশকরা কী করেন? ১১ মাসের জঞ্জাল নিয়ে অনেকে মেলায় ঢুকছেন। তারা নিজেরা কেন দেখেন না বিষয়টা? প্রশ্ন রাখেন তিনি। 
নির্বাচিত বই ॥ অমর একুশে বইমেলার ২৬তম দিনে মেলায় নতুন বই এসেছে ২৪৬টি। এখন পর্যন্ত আসা বইগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিবেচনায় ৫টি বইকে আমরা আলাদা করেছি। মাওলা ব্রাদার্স থেকে এসেছে সুমন সাজ্জাদের বই ‘তুলনামূলক সাহিত্য মৃত্যুর মিথ বনাম বাস্তবতা।’ বিষয় বৈচিত্র্যের কারণে সাধারণ পাঠকেরও বইটি ভালো লাগতে পারে। আগামী বের করেছে ‘মুক্তিযুদ্ধের ছোটগল্পে রীতি-নির্মিতি।’ আরজুমান্দ আরা বানুর বই। মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে লেখা ছোটগল্পের ওপর একটা বিশ্লেষণ এখানে পাবেন পাঠক। পাঠক সমাবেশ প্রকাশ করেছে ‘প্লেটো জীবন ও দর্শন।’ লেখক আমিনুল ইসলাম ভুইয়া। প্লেটোর ওপর অনেক বই থাকলেও পাঠক সমাবেশের কিছু বই সহজ করে লেখা। বিষয়ও সুনির্বাচিত। আগ্রহীরা সংগ্রহে রাখতে পারেন।  
মেলায় এসেছে দুই বাংলার বিখ্যাত ১৫ কবিতার জন্মকথা নিয়ে লেখা ব্যতিক্রমী বই ‘যেভাবে লেখা হলো বিখ্যাত কবিতা।’ বছরের পর বছর ধরে পাঠকের মুখে মুখে ফেলে এমন ১৫ কবির ১৫টি কবিতার প্রেক্ষাপট বইতে তুলে ধরা হয়েছে। বইটি সম্পাদনা করেছেন কবি মাহমুদ শাওন। প্রকাশ করেছে পুন্ড্রু প্রকাশনী। ঐহিত্য থেকে মেলায় এসেছে মহিউদ্দিন আহমদের বই ‘তেহাত্তরের নির্বাচন।’ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই নির্বাচনের খুঁটিনাটি নিয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থই বলা যায় এটিকে। অবশ্য এটি বিরোধীদের চোখ দিয়ে দেখা। সরকার বিরোধী হিসেবে পরিচিত গণকণ্ঠ পত্রিকা বইটির মূল উৎস। মূল্য  ৭০০ টাকা।

×