ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

ঐতিহ্যের নৌকা বাইচ

মনু নদীর দুই তীরে উৎসাহী জনতার বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস

সৈয়দ হুমায়েদ শাহীন

প্রকাশিত: ২২:২৫, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩

মনু নদীর দুই তীরে  উৎসাহী জনতার  বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস

নয় বছর পর মনু নদীতে আবার অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। দুই তীরে দর্শনার্থীদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস

আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে মৌলভীবাজারের মনু নদীর দুই তীরে জনস্রোতে পরিণত হয়। নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতীসহ নানা বয়সের মানুষের সমাগমে মনু নদীর দুই তীর কানায় কানায় ভরে ওঠে। মনু নদীর চাঁদনীঘাট ব্রিজের সামনে থেকে বাইচ শুরু হয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার অতিক্রম করে বড়হাটে গিয়ে শেষ হয়। নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীদের উৎসাহ দিতে নদীর দুই পাড়ের দর্শকরা ঢাক, ঢোল শংখের ধ্বনিতে হই হল্লা এবং চিৎকার দিয়ে প্রতিযোগীদের উৎসাহ দেয়। আবহমান গ্রাম-বাংলার এই নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় মাঝিমাল্লাদের প্রস্তুতির পাশাপাশি নদীর দুই তীরে দুপুর থেকেই জড়ো হতে থাকেন দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ বছর পর আবার মনু নদীতে অনুষ্ঠিত হলো নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। ২৭ সেপ্টেম্বর বুধবার বিকেলে মৌলভীবাজার পৌরসভার উদ্যোগে প্রতিযোগিতায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মোট ৮টি নৌকা অংশগ্রহণ করে। এতে মৌলভীবাজার জেলার ৫টি, সুনামগঞ্জ জেলা থেকে ২টি হবিগঞ্জ জেলা থেকে ১টি নৌকা অংশ নেয়। সর্বমোট ৮টি নৌকা বিভিন্ন ধাপে অংশ নিয়ে ফাইনাল রাউন্ডে টিকে যায় ৩টি নৌকা। লটারির মাধ্যমে নৌকার গ্রুপ অবস্থানের স্থান নির্ধারণ করা হয়। বেলা তিনটায় শুরু হয় নৌকা বাইচের প্রথম রাউন্ড।

মৌলভীবাজার বিভিন্ন স্থান থেকে নৌকা বাইচ দেখতে নদীর দুই তীরের দুইকিলোমিটার এলাকাজুড়ে জড়ো হন হাজার হাজার দর্শক। নৌকা বাইচে অংশ নেওয়া মাঝিদের বৈঠার গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অগণিত দর্শনার্থীদেরও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পানির ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের পাশাপাশি নৌকার গলুই সামনে বসা নানান পোশাকে সেজে গায়েনরা যখন বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে মত্ত, তখন দর্শনার্থীর মনে তৈরি হয় নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস।  

বিকেল পৌনে ৬টার দিকে শুরু হয় ফাইনাল রাউন্ডে অংশ নেওয়া ৩টি নৌকার প্রতিযোগিতা। এতে প্রথমস্থান অর্জন করে রাজনগর উপজেলার কাবুল মিয়ার শাহ মোস্তফার তরী। ৭০ ফুট দৈর্ঘ্যরে ওই নৌকাটি ইতোমধ্যে সিলেটের বিভিন্ন এলাকার নৌকা বাইচে অংশ নিয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে বলে জানা গেছে। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে বন্দুক নামের মৌলভীবাজারের নৌকা তৃতীয় স্থান অর্জন করে রাজনগরের শাহ পরানের তরী। বিজয়ী ৩টি নৌকা মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে অংশ নেওয়া। সন্ধ্যার মনু নদীর উত্তর তীরবর্তী বলিয়ারবাগ খেয়াঘাটে মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মো. ফজলুর রহমানের সভাপতিত্বে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ী নৌকার বাইচেলদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন মৌলভীবাজার- থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য নেছার আহমদ। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক . উর্মি বিনতে সালাম পুলিশ সুপার মো. মনজুর রহমান পিপিএম, মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুর রহমান প্রমুখ।

পৌর মেয়র মো. ফজলুর রহমান বলেন, করোনাসহ বিভিন্ন মহামারি নানান বৈশ্বিক কারণে গত কয়েকবছর মনু নদীতে আমরা নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারি নাই। বছর প্রবাসীদের আর্থিক সহযোগিতায় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। নদীর দুই পারের জনসমাবেশ এবং উৎসুক দর্শকদের আনন্দ দেখেছি। উৎসুক দর্শকদের আনন্দ উপস্থিতি দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি। দর্শকদের প্রেরণায় আগামীতে আমরা প্রবাসীদের সহযোগিতা নিয়ে প্রতিবছর নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করব। প্রতিবছর জুলাই মাসে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। 

নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আহ্বায়ক পৌর কমিশনার প্যানেল মেয়র জালাল আহমদ জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন মাপের মোট নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। এলাকার যুব সমাজকে মাদক, অবৈধ কাজকর্ম থেকে বিরত রাখতে এবং হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে মৌলভীবাজার পৌরসভার উদ্যোগে বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

বছর মনু নদীর শান্তিবাগ পাড়ে পৌরসভার নতুন বিনোদন স্পট ওয়াকওয়ে নির্মাণ করায় দর্শকদের নৌকা বাইচ দেখতে বাড়তি সুবিধা যুগিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের আগে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে মনু নদীতে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়।

 

×