ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২৪ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১

প্রিয় ফুলের শেষ বেলা এখন

অযুত অস্বস্তি, স্বস্তি শুধু কৃষ্ণচূড়ার লালে

মোরসালিন মিজান 

প্রকাশিত: ২৩:২৬, ৫ জুন ২০২৩

অযুত অস্বস্তি, স্বস্তি শুধু কৃষ্ণচূড়ার লালে

শেষ বেলায় এসে আরও রঙিন আরও যেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে কৃষ্ণচূড়া

 সময়টা এখন অস্বস্তির। কত যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মানুষ! জীবনকে রীতিমতো দুই হাতে ঠেলে পার করতে হচ্ছে। অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি- কোথাও তেমন কোনো সুসংবাদ নেই। প্রকৃতিও মহাবিগড়ে আছে। একদিকে গ্রীষ্মের প্রখর রোদ। অন্যদিকে চলছে তাপপ্রবাহ। অথচ বিদ্যুৎ নেই। নেই বলতে, লোডশেডিং। বিপর্যস্ত জনজীবন। ঘরে বসে গা দর দর করে ঘামছে। বাইরের অবস্থা আরও খারাপ। রাস্তায় নামলে দুর্ভোগে নাকাল হতে হচ্ছে। আশপাশে তাকিয়ে চোখের আরাম হয়, এমন কোনো দৃশ্য দেখা যায় না। 
তবে অযুত অস্বস্তির মধ্যে স্বস্তি শুধু কৃষ্ণচূড়ার লালে। হ্যাঁ, প্রিয় ফুলের এখন শেষ বেলা। এপ্রিল থেকে একটু একটু করে ফুটতে শুরু করেছিল। ক্রমে রক্তিম হয়ে ওঠে চারপাশ। মাঝখানে আবার ঝড়, দমকা হাওয়ার কবলে পড়েছিল। অনেক গাছের ফুল প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল তখন। তবে এখন ফুরিয়ে যাওয়ার আগে যেন নতুন প্রাণ পেয়েছে। রাজধানীর প্রায় প্রতিটি গাছ ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে আবার। প্রখর রোদে লাল রঙটাও আগের তুলনায় গাঢ় হয়েছে বলে মনে হয়। তাকালে ভীষণ আরাম হয় চোখের। রঙিন হয়ে ওঠা চারপাশটাকে আপন মনে হয়। কৃষ্ণচূড়ার রং জীবনেও ফিরবে, প্রত্যাশা জন্মে মনে। 
গ্রীষ্মের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফুলটির নাম কৃষ্ণচূড়া। রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ সড়কের দুই ধারে, পার্কে-উদ্যানে, পুরনো ভবনের কার্নিশে এখন কৃষ্ণচূড়া দৃশ্যমান। লাল রঙে অদ্ভুত  সেজেছে প্রকৃৃতি। শহর ঢাকার ছবিটাই বদলে দিয়েছে। বদলে যাওয়া ছবি  যে  কোনো জায়গা থেকে দেখা যায়। তবে আলাদা করে বলতে হয় চন্দ্রিমা উদ্যানের পাশের রাস্তাটির কথা। এ রাস্তার দুই ধারে কৃষ্ণচূড়ার সারি। যত পথ তত কৃষ্ণচূড়া। দেখে শেষ করা যায় না। সড়কটি অতিক্রম করার সময় প্রকৃতিপ্রেমীরা অপলক তাকিয়ে থাকেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের দুই পাশের গাছগুলোও দেখতে হয় না। আপনি চলে যায় চোখ। কৃষ্ণচূড়া দেখে যেতে পারেন রমনা পার্কেও।

বিশাল উদ্যানে সবুজের সমারোহ। লাল ফুলটি তাই আলাদা করে চোখে পড়ে। এখানে প্রচুর গাছ। পার্কের যে গেট দিয়েই প্রবেশ করা যায়, স্বাগত জানায় কৃষ্ণচূড়া। ভেতরেও এর উপস্থিতি প্রবল। নিসর্গপ্রেমীরা তো বটেই, প্রাতর্ভ্রমণে আসা সাধারণ মানুষও কৃষ্ণচূড়ার দিকে তাকিয়ে পথ হাঁটছেন। এই পথ যদি না শেষ হয়...। শেষ না হলেই যেন খুশি সবাই! 
কৃষ্ণচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম ডেলোনিক্স রেজিয়া। এটি ফাবাসিয়ি পরিবারের অন্তর্গত। গুলমোহর নামেও ডাকা হয়। আদি নিবাস আফ্রিকার মাদাগাস্কার। ১৮২৪ সালে সেখান থেকে প্রথম মুরিটাস, পরে ইংল্যান্ড এবং শেষ অবদি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার ঘটে। এখন জন্মে আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, হংকং, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন, ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশে। ধারণা করা হয়, কৃষ্ণচূড়া ভারত উপমহাদেশে এসেছে তিন থেকে চারশ’ বছর আগে। বহুকাল ধরে আছে বাংলাদেশে। তবে ফুলের নাম কী করে কৃষ্ণচূড়া হলো সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায় না। ধারণা করা হয়, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অবতার কৃষ্ণের নামে ফুলটির নামকরণ করা হয়েছে। একটু খেয়াল করলেই  চোখে পড়বে, কৃষ্ণের মাথায় চুলের চূড়া বাঁধার ধরনের সঙ্গে ফুলটির বেশ মিল। সেখান থেকেই কৃষ্ণচূড়া।

আবার উদ্ভিদবিজ্ঞানী, নিসর্গপ্রেমী কিংবা কবি, সাহিত্যিকরাও নামকরণ করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয়। 
উদ্ভিদবিদ দ্বিজেন শর্মার বর্ণনা মতে, এই ফুল বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে ফুটে থাকে। বাংলাদেশে ফোটে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত। প্রথম মুকুল ধরার কিছুদিনের মধ্যেই পুরো গাছ ফুলে ফুলে ভরে যায়। ফুলের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর উজ্জ্বল রং। তরুরাজ্যে এত উজ্জ্বল রং সত্যি দুর্লভ। ফুলের পাপড়ির রং গাঢ় লাল, লাল, কমলা, হলুদ, হালকা হলুদ হয়ে থাকে। প্রস্ফুটিত ফুলের ব্যাস ২ ইঞ্চি থেকে ৩ ইঞ্চি। বৃত্তির বহিরাংশ সবুজ। ভেতরের অংশ রক্তিম। কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো বড় চারটি পাপড়িযুক্ত। পাপড়ি প্রায় ৮ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা হয়ে থাকে। কৃষ্ণচূড়া জটিল পত্রবিশিষ্ট। প্রতিটি পাতা ৩০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা। ২০ থেকে ৪০ উপপত্র বিশিষ্ট। 
শেষ করা যাক শামসুর রাহমানের পঙক্তিটি দিয়ে, কবি লিখেছেন : আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে...। লাল রঙের পাপড়িতে বাঙালীর চেতনার রং দেখেছিলেন কবি। আপনিও দেখুন। কৃষ্ণচূড়া দেখার এখন সময়। একপলক দেখার চেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বের হয়ে পড়তে পারেন। যে কোনো ছুটির দিনে বের হয়ে পড়ুন। যোগ দিন কৃষ্ণচূড়া উৎসবে। আবারও মনে করিয়ে দিই, সময় ফুরিয়ে এসেছে। জুন শেষে বিদায় নেবে কৃষ্ণচূড়াও।

×