ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

তৃণমূলের শিল্পীদের প্রদর্শনী জাতীয় জাদুঘরে

লোক ও কারুশিল্পের সমৃদ্ধ অতীত, টিকে থাকার সংগ্রাম

মোরসালিন মিজান 

প্রকাশিত: ২৩:১৯, ৩ জুন ২০২৩

লোক ও কারুশিল্পের সমৃদ্ধ অতীত, টিকে থাকার সংগ্রাম

জাতীয় জাদুঘর আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনীর একটি স্টলে ঐতিহ্যবাহী টেপা পুতুলের দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনা

বাংলার লোক ও কারুশিল্পের বহু নিদর্শন হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাচ্ছে। এ বাস্তবতা একদমই অস্বীকার করা যাবে না। আবার এ-ও সত্য যে, অনেক জাত-শিল্পী ও  দক্ষ কারিগর পূর্ব পুরুষের চর্চা বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। লোক ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রচেষ্টার অন্ত নেই তাদের। ঠিক এখন, এই মুহূর্তে জাতীয় জাদুঘরে তৃণমূলের প্রকৃত শিল্পীদের চর্চা এবং ঐতিহ্যপ্রেম সম্পর্কে সম্মুখ ধারণা পাওয়া যাবে। তাদের কাজ নিয়ে নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে চলছে বিশেষ প্রদর্শনী। শনিবার দশ দিনব্যাপী প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এ সময় জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান, ড. সোনিয়া নিশাত আমিন ও প্রদর্শনীর আয়োজক জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের কিপার আসমা ফেরদৌসিসহ অন্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনের পর গ্যালারি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। 
গ্যালারিতে মৃৎশিল্পের একটি চমৎকার উপস্থাপনা চোখে পড়ে। একেবারেই ট্রাডিশনাল পুতুল দিয়ে নিজেদের স্টল সাজিয়েছেন শিল্পী সুবোধ চন্দ্র পাল ও বিজলী রানী। স্বামী স্ত্রী দুজনই এসেছেন রাজশাহী থেকে। মাটির পুতুল আরও অনেকে বানান বটে। ঢাকার বিভিন্ন মেলায় সেগুলো উপস্থাপনও করেন। তবে এই দম্পতির কাজ শৈশবে গ্রামের মেলা থেকে কেনা মাটির পুতুলের কথা মনে করিয়ে দেয়। অবিকল সেই ফর্ম ধরে রেখেছেন তারা। ফ্রি স্ট্যান্ডিং নারী মূর্তি গৃহস্থালী কাজে নারীর অংশগ্রহণের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরে। একইসঙ্গে কুসুম কোমল মাতৃরূপ দেখে মুগ্ধ হতে হয়। 
স্টলে বসে কথা হচ্ছিল বিজলী রানীর সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, আমরা সারা বছরই বাসায় বসে কাজ করি। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত মেলায় অংশ নিই। শুধু তাই নয়, স্বামী সুবোধ চন্দ্র টেপা পুতুল ও টেরাকোটার কাজ নিয়ে সরকারি উদ্যোগে জাপান সফর করেছেন বলেও জানান তিনি। বলেন, সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা আমাদের জন্য খুবই গর্বের ছিল।
অবশ্য মৃৎশিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের উদাসীনতা বিজলী রানীকে কষ্ট দেয়। বলেন, সব সময় ভালো বিক্রি হয় না। কষ্ট করে চর্চাটি টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নিজের ছেলেকেও কাজ শিখিয়েছেন বলে জানান তিনি।  
প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে পটচিত্র। লোকচিত্রকলা দিয়ে দুটি স্টল সাজানো হয়েছে। একটিতে শিল্পকর্ম উপস্থাপন করছেন রতন কুমার পাল। এই তরুণ নিজ হাতে সরাচিত্র এঁকেছেন। অর্ধেক করে কাটা বাঁশের গায়েও পটের ফর্ম। আর মূল কাজগুলো করেছেন কাপড়ে। তার পটে গ্রামীণ প্রকৃতি,  দেবী মূর্তি, প্যাঁচা ফুল ইত্যাদির উপস্থাপনা বিশেষ চোখে পড়ে।  শহুরে আরেক শিল্পী নাজির, যিনি টাইগার নাজির নামে পরিচিত, তিনিও তার পট নিয়ে উপস্থিত হয়েছে এখানে।    
সিনেমা ব্যানার আর্টিস্টদের কাজও প্রায় হারিয়ে গেছে। চলচ্চিত্রের সেই সুদিন নেই। শিল্পীরাও তাই বেকার। তবে ঐতিহ্য বিবেচনায় কেউ কেউ এখনো চর্চাটা ধরে রেখেছেন। তাদেরই প্রতিনিধি মো. শোয়েব, সৈয়দ আহমেদ ও রফিকুল ইসলাম। এই তিন শিল্পী তাদের নিজেদের কাজ নিয়ে প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। টুকরো টুকরো কাজ কেমন যেন নষ্টালজিক করে তুলে। সৈয়দ আহমেদ বলছিলেন, এক সময় দিন রাত সিনেমার পোস্টারের কাজ করতেন তারা। এখন তার কিছুই নেই। তবে বিদেশে সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং ভালো বিক্রি হয় বলে জানান তিনি। 
অন্যদিকে, রফিকুল ইসলাম টিকে থাকার স্বার্থে অন্য কাজে ফর্মটি ব্যবহার করছেন। 
প্রদর্শনীর একাধিক স্টল সাজানো হয়েছে সূচিশিল্পের নিদর্শন দিয়ে। সোনারগাঁয়ের শিল্পী হোসনে আরা নকশিকাঁথার একটি বড় সংগ্রহ নিয়ে এসেছেন। তার তৈরি কাঁথাগুলোর মধ্যে কিছু খুবই উন্নত মানের। এই অর্থে উন্নত মানের যে, এগুলোতে সূক্ষ্ম হাতের কাজ লক্ষ্য করা যায়। অধিকাংশ কাঁথায় লতা পাতা ফুল ইত্যাদির নক্সা। প্রায় ৬০ বছর বয়সী শিল্পী বলছিলেন, ছোট বেলায় ঘরেই কাজ শিখেছিলেন তিনি। মা নানি দাদিরা ঘরে বসে নকশিকাঁথার কাজ করতেন। দেখে দেখে নিজেও শিখেছিলেন। আর এখন কাজ করছে তার নিজের মেয়ে। মেয়ে আসমাকে স্টলেই পাওয়া গেল। মা এই স্টলে, ওই স্টলে গিয়ে গল্প জমাচ্ছিলেন। কিন্তু মেয়ের সমস্ত মনোযোগ কাঁথায়। সুই সুতো হাতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছিল সে। 
একই এলাকার আরেক শিল্পী বাসন্তী সূত্রধর। স্টলে বসেই নকশিপাখা তৈরি করছেন তিনি। নকশিপাখা বলতে, সূচিকর্ম করা পাখা। পাখার মাঝখানটায় আকর্ষণীয় সূচিকর্ম। বিশেষ করে উজ্জ্বল রঙের সুতোয় ফুটিয়ে তোলা লোক মোটিভ তার হাতপাখাকে ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করে। শিল্পী পাখা তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছেন সুতো বাঁশ ও কাপড়। বাঁশের গোলাকার চাকতিতে সুই সুতো দিয়ে বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশাও করতে দেখা যায়। সব মিলিয়ে দৃষ্টিনন্দন পাখা। হাতে নিয়ে ঘুরালে সুন্দর বাতাসও হয়। শিল্পী জানান, তিনিও শৈশবে পরিবারের নারী সদস্যদের কাছে এই কাজ শিখেছিলেন। ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি বর্তমানে এটি তার পেশা বলে জানান শিল্পী।  
আরেক সূচি শিল্পী ইলোরা পারভীন এসেছেন নড়াইল থেকে। সুই সুতোর সূক্ষ্ম বুননে বিখ্যাতদের পোরট্রেট করেন তিনি। সুই সুতোয় এমন রিয়েলিস্টিক কাজ দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না।  
তীব্র গরম পড়েছে যেহেতু, শীতল পাটিরও খোঁজ করছেন অনেকে। একেবারে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি নিয়ে প্রদর্শনীতে এসেছেন অরুণ চন্দ্র দাশ। তার শীতলপাটি এত নরম এবং নিখুঁত যে, বার বার হাত বুলাতে ইচ্ছে করে। অরুণ জানান, তাদের গ্রামে এক সময় শত শত মানুষ শীতল পাটির কাজ করতেন। এখন মাত্র কয়েক ঘরে কাজ হয়। টিকে থাকা খুব কষ্টের হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।  
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া পাটশিল্প, দারুশিল্প, কাসা ও পিতল শিল্পের নিদর্শনও দারুণ আকৃষ্ট করে। পাশাপাশি প্রদর্শনীর প্রায় সকল শিল্পী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাদের শিল্পভাষায় তুলে ধরেছেন। এখানে সবকটি মাধ্যমে মহান নেতাকে খুঁজে পাওয়া যায়। বিশেষ প্রদর্শনী টানা ১০দিন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সময় সুযোগ করে ঘুরে আসুন লোক শিল্পের এই রাজ্য থেকে।

×