ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৯ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

ঠাসবুননের ফুলে এখন মিষ্টি ঘ্রাণ

কামিনী সতী কোমল কুসুম অতি...

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ২৩:২৯, ২৯ মে ২০২৩

কামিনী সতী কোমল কুসুম অতি...

কামিনী ফুটেছে বনে.... নির্বাক নির্জনে... বাড়ির আঙিনা ভরে উঠেছে কামিনীর মিষ্টি গন্ধে    Ñরিজওয়ান করিম

শহুরে বাসা বাড়ির বারান্দায় বা ছাদে ভালোই গাছ লাগানো হয় এখন। তবে বেশিরভাগ গাছ পাতাবাহার জাতীয়। বাগানের দিকে তাকালে সারাবছর মূলত পাতা দেখা যায়। সে তুলনায় ফুলের গাছ বা ফুল অনেক কম হয়। তার চেয়েও কম হয় ঘ্রাণ। গোলাপের কথাই ধরুন না, নাকের কাছে নিলে ঘ্রাণ বলতে কিছু কি পাওয়া যায়? তবে এই বাস্তবতার একেবারেই বিপরীত উদাহরণ কামিনী। শুভ্র সুন্দর ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে এসে লাগতেই মন ভালো হয়ে যায়। দারুণ ¯িœগ্ধ একটা অনুভূতি হয় ভেতরে। হচ্ছে কি আপনারও? ফুলটি কিন্তু ফুটেছে!    
বছরে একাধিকবার ফুটে এই ফুল। এখন বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টি হয়তো এ ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।  এখন ছোট ও ঘন সবুজ পাতার মাঝখান থেকে উঁকি দিচ্ছে কামিনী। একসঙ্গে এত ফুল ফুটছে যে, গাছটাকেই সাদা মনে হচ্ছে কখনো কখনো। মজার বিষয় হচ্ছে, গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ও ভীষণ অবাক হবেন আপনি। কারণ, কামিনীর সাদা পাপড়ি বিছানো আছে গাছের নিচে। হ্যাঁ, ফুলের পাপড়ি ক্রমে দুর্বল হয়ে হাল্কা বাতাসে ঝরে পড়ছে। পাশাপাশি অসংখ্য মৌমাছি কামিনীর ফুল থেকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত এখন। ওদের ওড়াউড়ির কারণেও ফুলের পাপড়ি ভেঙে নিচে পড়ছে। 
রবীন্দ্রনাথ অবশ্য কামিনীকে অতি কোমল কুসুম বলে উল্লেখ করেছে। লিখেছেন, ‘জান ত কামিনী সতী কোমল কুসুম অতি/দূর হ’তে দেখিবারে, ছুঁইবারে নহে সে-/দূর হ’তে মৃদু বায়, গন্ধ তার দিয়ে যায়/কাছে গেলে মানুষের শ্বাস নাহি সহে সে।’ পরের অংশে তিনি লিখেছেন, ‘কামিনীকুসুম ছিল বন আলো করিয়া-/মানুষপরশ-ভরে শিহরিয়া সকাতরে/ওই যে শতধা হয়ে পড়িল গো ঝরিয়া।’ 
কামিনীর বৈজ্ঞানিক নাম ম্যুরায়া প্যানিকুলাটা। আদি নিবাস বাংলা-ভারতের উষ্ণ অঞ্চল, মালয়, চীন ও অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশে বহু কাল ধরে আছে। গুল্ম জাতীয় গাছ। গাছ ওপরের দিকে তেমন বাড়ে না। লম্বায় তিন  থেকে পাঁচ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। দেখতে ঝোপের মতো অনেকটা। ঘন সবুজ পাতার ফাঁকে সাদা সুন্দর ফুল যেন হাসি হয়ে ফোটে। উদ্ভিদবিদ দ্বিজেন শর্মার বর্ণনা অনুযায়ী, কামিনী চিরসবুজ ক্ষুদ্র বৃক্ষ। এর অসংখ্য শাখা-প্রশাখা। ঠাসবুনন। এটি লেবু গোত্রীয়।  গোষ্ঠী বৈশিষ্ট্যে পাতাও ফুলের অংশবিশেষ। ফুলের পাঁচ থেকে সাতটি পত্রিকা। মাঝে হলুদ দেখতে একটি পরাগকেশর। ফুলগুলো সবুজ পাতার মাঝে মঞ্জরিবদ্ধ হয়ে ফুটে থাকে।
কামিনীর পাতার সৌন্দর্যও উল্লেখ করার মতো। ছোট ছোট পাতা। ঘন বিন্যস্ত। সবুজ এই পাতা বিয়ের গাড়ি, বাসরঘর সাজাতে ব্যবহার করে দোকানিরা। অন্য ফুলের তোড়া সাজাতেও কামিনীর পাতা ব্যবহার করা হয়। কামিনী থেকে কলম করে কেটে-ছেঁটে নানা আকৃতি তৈরি করা যায়। একই কারণে এ গাছে ভালো বনসাই হয়। কামিনীর এক ধরনের ফলও হয়। গোলাকার রক্তিম ফল পাখির বিশেষ করে বুলবুলির প্রিয় খাদ্য। ঔষধি গুণও আছে। গাছটি থেকে তৈরি ওষুধ শরীরের জ্বর সারাতে ব্যবহার করা হয়। ব্যথানাশক হিসেবেও কাজ করে। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে, কামিনী গাছে আছে রাসায়নিক উপদানও। তবে ফুলপ্রেমীদের আর কিছু চাই না, কামিনীর মিষ্টি ঘ্রাণটুকু চাই শুধু।

×