ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী মিরপুর

স্বাধীন দেশে শেষ রণাঙ্গন, বীরত্ব ও বলিদানের অমর স্মৃতি

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ২৩:৩৭, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩

স্বাধীন দেশে শেষ রণাঙ্গন, বীরত্ব ও বলিদানের অমর স্মৃতি

১৯৭২ সালের জানুয়ারি। স্বাধীন দেশের শেষ রণাঙ্গনে মিরপুরের দিকে ছুটছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল

শুধু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, তাদের দোসর হিংস্র হায়েনাদের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছিল বাঙালিকে। এ দেশীয় রাজাকার আলবদর আলশামসদের ভূমিকার কথা তো সবারই জানা। একই সময় দেশের কয়েকটি এলাকায় মারাত্মক সক্রিয় ছিল বিহারিরা। উর্দুভাষী অবাঙালি গোষ্ঠী জাতিগতভাবেই ছিল চরম নির্মম নিষ্ঠুর।

আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর জল্লাদ বাহিনীতে পরিণত হয়। এই জল্লাদদের বড় এবং ভয়ংকর ঘাঁটিটি ছিল ঢাকার মিরপুরে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত থেকে ‘মুসলমানের দেশ’ পাকিস্তানে আসে তারা। মিরপুরে বসবাস শুরু করে। ক্রমে এটি তাদের শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হয়। 
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় বর্বর গণহত্যা শুরু করে। প্রায় একই সময় থেকে বাঙালি নিধনে নেমে যায় বিহারিরা। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস মিরপুর ও আশপাশের এলাকায় গুলি করে, গলা কেটে, ধর্ষণ নির্যাতন করে মানুষ হত্যা করে তারা। নিরীহ নির্দোষ বাঙালির রক্তে গোটা মিরপুরে মাটি ভিজে নরম হয়ে গিয়েছিল। 
নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বদলে যায় প্রেক্ষাপট। প্রাণপণ লড়াইয়ের বিজয় অর্জন করে বাঙালি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দম্ভ চুরমার হয়ে যায়। মাথা নুইয়ে পরাজয় স্বীকার করে কোনোরকমে প্রাণ বাঁচায় তারা। অস্ত্র সমর্পণ করে। কিন্তু মিরপুরের জল্লাদরা ততদিনে দল আরও ভারি করে নিয়েছে। সে সময়ের ইতিহাস বলছে, মোহাম্মদপুরসহ অন্যান্য এলাকা থেকেও বিহারিরা এসে মিরপুরে জড়ো হয়েছিল।

পাকিস্তানি সৈন্যদের দলছুট অংশ মিরপুরে আত্মগোপন করেছিল বলেও জানা যায়। এরা অস্ত্র জমা না দিয়ে আগের মতোই মিরপুরকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এভাবে ডিসেম্বর শেষ হয়। জানুয়ারিও শেষ পর্যায়ে। কিন্তু বিহারিদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। এ অবস্থায় নতুন করে নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে রাজধানী। তাদের কাছে থাকা অস্ত্র উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মইনুল হোসেন চৌধুরী। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন তিনি।

অভিযান শুরুর আগে থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থান করছিল তার ব্যাটালিয়ন। পরবর্তীতে ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক’ শিরোনামে একটি বই লিখেন তিনি। তাতে মিরপুরে অভিযানের বেশকিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যানুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি আতাউল গনি ওসমানী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে তার সঙ্গে দেখা করে অভিযান শুরুর নির্দেশন দেন।

মইনুলের ভাষ্য, ‘ওসমানী আমাকে বলেন, বিহারি, রাজাকার ও তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তারের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী মিরপুর ১২নং  সেকশনে যাবে। পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগীদের একটা লিস্টও তারা তৈরি করেছে। তিনি পুলিশকে সৈন্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেন।’ 
অর্থাৎ অস্ত্র উদ্ধারের মূল দায়িত্বে ছিল পুলিশের। তাদের সহায়তা করার জন্য যোগ দিয়েছিলেন সেনা দদস্যরা। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় ফ্রন্টলাইনে চলে আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

প্রাথমিকভাবে ২ ইস্ট বেঙ্গলের তিন প্লাটুন সৈন্য মিরপুরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। পরে তা বাড়িয়ে ৪ ইস্ট বেঙ্গল এবং ৯ ইস্ট বেঙ্গলকেও যুক্ত করা হয়। ২ ইস্ট বেঙ্গলের দায়িত্ব ছিল মিরপুর ১০, ১১ ও ১২ নম্বর সেক্টরে। ৪ ইস্ট বেঙ্গলকে দায়িত্ব দেয়া হয় মিরপুর ১ ও ২ নম্বর সেক্টরের। ৯ ইস্ট বেঙ্গল মিরপুর ৬, ৭ ও ৮ নম্বর সেক্টর মুক্ত করার দায়িত্ব পায়। 
সে সময়ের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, মিরপুর ১২, কালাপানি, মিরপুর সিরামিক্স ও বর্তমান মিরপুর সেনানিবাস ছিল পাক-বিহারিদের মূল ঘাঁটি। ২৭ জানুয়ারি অভিযান পরিচালনাকারীরা মিরপুরের একাধিক প্রবেশপথে অবস্থান গ্রহণ করে। আজকের টেকনিক্যাল মোড় ও রোকেয়া সরণিতে অবস্থান নিয়ে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেন তারা। আগে থেকে এই এলাকার দায়িত্বে থাকা ভারতীয় মিত্র বাহিনীর বিহার রেজিমেন্ট পেছনে সরে যায়।

পরে অবাঙালি পা-াদের উদ্দেশ্যে বারবার মাইকিং করে অস্ত্র জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু পাকিস্তানি মিলিশিয়ারা তাতে সাড়া দেয় না। ২৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনী মিরপুর ১ নম্বরের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। তাদের একাংশ মাজারের পার্শ্ববর্তী স্কুল ঘরে অবস্থান নেয়। আরেকটি অংশ মিরপুর ২ নম্বরে ‘বায়তুল আমান’ নামের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অবস্থান নেয়। একইভাবে সন্ধ্যায় এক প্লাটুন সৈন্য মিরপুর সাড়ে ১১ তে পুলিশ চেকপোস্টের কাছে মোতায়েন করা হয়। নেতৃত্বে ছিলেন হাবিলদার ওয়াজিদ আলী মিয়া বারকী। 
৩০ জানুয়ারি মিরপুর ১২ নম্বর দিয়ে আগ্রসর হয় লেফটেন্যান্ট সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসানের নেতৃত্বাধীন একটি দল। কিন্তু ডি ব্লকে প্রবেশ করা মাত্রই আশপাশের সব বাড়ি থেকে হামলা শুরু করে বিহারিরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেলিমের বুক বিদীর্ণ হয়ে যায় গুলিতে। রক্তাক্ত অবস্থায়ও যুদ্ধ চালিয়ে যান তিনি। নিজে কাভার ফায়ার দিয়ে সঙ্গীদের নিরাপদ অবস্থানে সরে যাওয়ার পথ করে দেন। এ অবস্থায় মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েন বীর যোদ্ধা।  
বাংলা কলেজ এলাকায় হাবিলদার বারকীর প্লাটুনের ওপরও অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। দবে এই আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন তারা। পরে একটি খাল সাঁতরে নিরাপদ অবস্থানে চলে যান তারা। বিহারিরা মিরপুর ১২ নম্বরের অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির দিকে অগ্রসর হতে চাইলে সেখানেও লম্বা সময় যুদ্ধ হয়।  
মিরপুরের হতাহতের খবর পাওয়ার পর দ্রুতই শক্তি বাড়ানো হয়। মইনুল তার বাহিনী নিয়ে মিরপুর ১২ নম্বরে টেলিফোন এক্সচেঞ্জের কাছে অবস্থান নেন। সেখান থেকে সাড়ে ১১ নম্বরে অবস্থিত পুলিশ ফাঁড়িতে ফোন করে হাবিলদার বারকীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। হাবিলদার বারকী এখনই রিইনফোর্সমেন্ট চান। 
৪ ইস্ট বেঙ্গলের ২টি কোম্পানি মাজারে অবস্থান নেয়। আরেকটি কোম্পানি অবস্থান নেয় একটি পুকুর পাড়ে। এ সময় মাজারের পুকুর থেকে বহু বাঙালির লাশ উদ্ধার করেন সেনারা। এদিকে ৬ নম্বর সেকশনে যুদ্ধ চলাকালে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। এখানে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ে প্রাণ হারান হাবিলদার বাশার। 
যত দূর তথ্য, বিকেল থেকে চূড়ান্ত অভিযান শুরু হয়। বিহারিদের শক্ত অবস্থানগুলোতে এবার মর্টার এবং রিকয়েললেস গান দিয়ে আক্রমণ চালায় সেনাবাহিনী। আত্মসমর্পণ না করায় ২ নম্বর সেকশনের একটা বিহারি অবস্থানকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মিরপুর ১২ নম্বরে অনেকগুলো ৮১ মিমি মর্টার চার্জ করা হয়। 
যুদ্ধ এত কঠিন কেন হয়েছিল? এমন জিজ্ঞাসার জাবাব দিতে গিয়ে সমরবিদরা বলেছেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ছিল এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি লে. কর্নেল (অব) এইচ এম আব্দুল গাফফার বীর উত্তম বলেছেন, বাড়িগুলোর বিভিন্ন জানলা দিয়ে রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এমনভাবে কাভার করে এলএমজি এবং অন্যান্য অস্ত্র বসানো হয়েছিল, যা সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতা ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে স্বাধীন দেশেও এত মানুষের প্রাণ দিতে হয়েছিল। 
যুদ্ধ শেষে পরবর্তী ১০ দিন ধরে তল্লাশি অভিযান চলে মিরপুরে। শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে, এতে উদ্ধার হয় ১১ ট্রাক অস্ত্র! মোট অস্ত্রের ওজন ছিল প্রায় ৪৫-৫৫ টন। বিহারি ছাড়াও পাকিস্তান মিলিটারি পুলিশ, পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টসহ নানা ইউনিটের দলছুট সেনারা গ্রেপ্তার হয়।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিরপুরে ১৪৯ জন সেনা এবং পুলিশ শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ মৃতদেহ গুম করে ফেলেছিল বিহারিরা। মাত্র ৪-৫ জন বীর শহীদের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল, যারা স্বাধীনতার স্বাদ নিতে পারেনি! 

×